বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ
নবপ্রজন্মের বাজে খরচ এবং আমার বাজে কথা ঃ মিলাইয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ
অরূপ বৈশ্য
রুজি-রোজগার নাই, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তা নাই – নবপ্রজন্ম লড়িতে চায়। কীভাবে? উদ্দেশ্য-লক্ষ্য নাই, মতাদর্শ ও প্রেরণার উৎস নাই – নবপ্রজন্ম প্রাণ খুঁজিতে চায়। কীভাবে? উত্তরের জন্য দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যাহা খুঁজিয়া ফিরিতেছ, তাহা কী খুঁজিতে পারিবে রবীন্দ্রনাথে? কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড?
রবীন্দ্রনাথ তাঁহার গল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধের কিছু উদ্ধৃতির মাধ্যমে নবপ্রজন্মকে কী বলিতে চাহিয়াছেন – এইভাবে মূল্যায়নের পদ্ধতিতে রবীন্দ্রনাথ ও নবপ্রজন্ম উভয়ের প্রতি অন্যায় করা হইয়া থাকে। কিন্তু আমি নিরূপায়। সংক্ষিপ্ত এই আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগতকে নবপ্রজন্মের সাথে আমাকে জুড়িতে হইবে। সামগ্রীক বক্তব্যকে পাঠক যখন সংশ্লেষিত রূপে তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে আবিষ্কার করিতে সক্ষম, তখনই রবীন্দ্রনাথ ও নবপ্রজন্মের প্রতি করা এই অন্যায়ের পদ্ধতিও তাৎপর্যপূর্ণভাবে অর্থবহ হইয়া উঠিতে সক্ষম।
“রবীন্দ্রনাথ লিখিলেন,
আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।”
বস্তুজগতে যাহা পান্না ও চুনি, বস্তুজগতকে দেখার মানবমনের ভাব দিয়া পান্না ও চুনি সবুজ ও লাল হইয়া উঠিয়াছে। বিষয় ও বিষয়ীর সংশ্লেষই হইতেছে বাস্তবতা, বস্তুজগতের আলাদা করিয়া কোন অস্তিত্ব নাই। সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ অদ্বৈতবাদী – জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক ও অভিন্ন। আধুনিক কোয়ান্টাম বিজ্ঞান বলিয়াছে, ব্যক্তির পর্যবেক্ষণের আগে পর্যন্ত, বেড়াল একইসাথে জীবিত ও মৃত। দেখার পর, হয় বেড়াল জীবিত অথবা মৃত এবং সেটাই বাস্তব। এইরকম কী হইতে পারে যে একইসাথে একজন দেখিলেন বিড়াল জীবিত, আরেকজন অন্যত্র দেখিলেন বিড়াল মৃত – বহুবিশ্বের বাস্তব? আইনস্টাইন দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর বিজ্ঞানী নেইল বোরের সাথে বিতর্ক করিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়িয়া গেলেন – কোয়ান্টাম বাস্তব সঠিক, কিন্তু বিজ্ঞান এখনও সম্পূর্ণ রহস্য জানে না যাহা দিয়া প্রমাণিত হইবে, বস্তুজগত মানুষের চেতনা নিরপেক্ষভাবে বিরাজ করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মনোজগত ও দার্শনিক বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মনোজগত একই সূত্রে মালা গাঁথিল না। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের জগত মিলিল কী?
রবীন্দ্রনাথের চেতনা ও কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের চেতনার মধ্যে পার্থক্য থাকিলেও, সামাজিক চেতনায় বাস্তব উদ্ভাসিত। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নবপ্রজন্মের এক ক্ষুদ্র অংশ বিপুল অর্থে বৈভবের জীবনের ভবিষ্যত দেখিতেছে, বিপরীতে বৃহত্তর অংশ দেখিতেছে রুজি-রোজগারহীন হতাশার ছবি। সেজন্যই বাস্তব অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। প্রকৃতিবিজ্ঞান যখন বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গবেষণার মাধ্যমে বা মেজারমেন্টের মাধ্যমে নতুন চেতনার উন্মেষ, সমাজবিজ্ঞান বলে বাস্তব পরিবর্তনের অনুশীলনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গঠনের চেতনার উন্মেষ। রবীন্দ্রনাথ কী বলিলেন?
রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন,
“বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ।”
ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তাকে অতিক্রম করিয়া সমগ্র মানুষের তথা সমাজের কল্যাণের মাধ্যমেই মুক্তি লাভ করার কথা যে বিশ্বকবি বলিয়াছেন, তিনি জৈবিক প্রয়োজনকে চেতনার প্রয়োজন হইতে আলাদা করিয়াছেন, অদ্বৈতবাদ হইতে খানিক দূরত্বে গিয়ে মানবতাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছেন। আবার বিপরীতে বলিলেন,
“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে
দেখতে আমি পাই নি।”
সমগ্রকে ব্যক্তির অন্তরে স্থান দিয়াছেন। সত্যের সন্ধানে রবীন্দ্রনাথ বহুমুখী ভ্রমণ করিয়াছেন। কিন্তু নবপ্রজন্ম অস্থির। সে সত্যের বহুমুখী অনুসন্ধানে বিভ্রান্ত, সে পথহীন উদভ্রান্ত।
রবীন্দ্রনাথ “বাজে কথা” শির্ষক এক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন, “অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে যথার্থ চেনা যায়। কারণ, মানুষ ব্যয় করে বাঁধা নিয়ন-অনুসারে, অপব্যয় করে নিজের খেয়ালে। যেমন বাজে খরছ, তেমনি বাজে কথা। বাজে কথাতেই মানুষ আপনাকে ধরা দেয়। উপদেশের কথা যে রাস্তা দিয়া চলে মনুর আমল হইতে তাহা বাঁধা, কাজের কথা যে পথে আপনার গোযান টানিয়া আনে সে পথ কেজো সম্প্রদায়ের পায়ে পায়ে তৃণপুষ্পশূন্য চিহ্নিত হইয়া গেছে। বাজে কথা নিজের মতো করিয়াই বলিতে হয়।”
উদভ্রান্ত নবপ্রজন্ম বাজে খরচ করিয়া চলিয়াছে, আমিও বাজে কথা বলিতে চাহিয়াছি – রবীন্দ্রনাথ সেখানে আমাদের মিলাইয়া দিয়াছেন। আমাদের শাসন, শাসক ও তাদের অনুগামীরা কেজো সম্প্রদায়, তাঁরা মনুর বাঁধন মানিয়া চলে, তাদের চলার পথ তৃণপুষ্পশূণ্য। আমার বাজে কথা সেই বাঁধন অস্বীকারের, নতুনের আবাহনে বিদ্রোহের।
