Showing posts with label Arunodoy. Show all posts
Showing posts with label Arunodoy. Show all posts

অরুণোদয়:জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , , ,

রুণোদয় শিলচর শহরের প্রাচীনতম পত্রিকা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুনীল দত্তরায়। গেল এক দশকের বেশি সময় জুড়ে এর সম্পাদনা করছেন চন্দন সেনগুপ্ত। এখানে আপনা   পড়তে পাবেন এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা। 
     
    এতে "নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং আসামের রাজনীতি' শিরোনামে রয়েছে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক অরূপ বৈশ্যের  একটি লেখা, "আধারঃ দেশবাসীকে কব্জায় রাখার একটি অমোঘ কৌশল' লিখেছেন সুমন সেনগুপ্ত, সুশান্ত করের অনুবাদে বেরোচ্ছে দিগন্ত শর্মার ধারাবাহিক  "১৯৮৩র অসম---নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু' । এবারে এর শেষ অধ্যায়। এ ছাড়াও রয়েছে নিয়মিত কিছু সংগ্রাম সংবাদ প্রতিবেদন।
            
                  হয়তো, আপনার এটি পড়তে ফ্লাসপ্লেয়ার দরকার পড়তেও পারে। নামিয়ে নিন এখান থেকে।  মোবাইলে পড়বার জন্যে স্ক্রাইবড এপ দরকার পড়তে পারে। ছবিতেও পড়তে পারেন। ক্লিক করে বড় করে নিন।  একেবারে নিচে রইল।   















অরুণোদয়ঃ জুন সেপ্টেম্বর , ২০১৫ সংখ্যা

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , ,

            অরুণোদয় শিলচর শহরের প্রাচীনতম পত্রিকা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুনীল দত্তরায়। গেল এক দশকের বেশি সময় জুড়ে এর সম্পাদনা করছেন চন্দন সেনগুপ্ত। এখন থেকে আমরা চেষ্টা করব এর প্রতিটি সংখ্যা স্বাভিমানে তুলে দিতে। শুরু শুরুতে সামান্য প্রযুক্তি গত অসুবিধের জন্যে কোথাও কোথাও পাঠ পড়তে অসুবিধে হবে, কিন্তু আমরা আশা করব অচিরেই সেটি দূর করতে। এখানে আপনারা পড়তে পাবেন এর ফেব্রুয়ারি-মে , ২০১৫ সংখ্যা।

হয়তো, আপনার এটি পড়তে ফ্লাসপ্লেয়ার দরকার পড়তেও পারে। নামিয়ে নিন এখান থেকে। যারা পিডিএফে পড়তে পারবেন না, তাদের জন্যে ছবিতেও রইল। দুবার ক্লিক করুন। ছবি বড় হয়ে যাবে, পড়তে পারবেন।












অরুণোদয়ঃ ফেব্রুয়ারি-মে , ২০১৫ সংখ্যা

Posted by স্বাভিমান Labels: , , ,

রুণোদয় শিলচর শহরের প্রাচীনতম পত্রিকা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুনীল দত্তরায়। গেল এক দশকের বেশি সময় জুড়ে এর সম্পাদনা করছেন চন্দন সেনগুপ্ত। এখন থেকে আমরা চেষ্টা করব এর প্রতিটি সংখ্যা স্বাভিমানে তুলে দিতে। শুরু শুরুতে সামান্য প্রযুক্তি গত অসুবিধের জন্যে কোথাও কোথাও পাঠ পড়তে অসুবিধে হবে, কিন্তু আমরা আশা করব অচিরেই সেটি দূর করতে। এখানে আপনারা পড়তে পাবেন এর ফেব্রুয়ারি-মে , ২০১৫ সংখ্যা।

হয়তো, আপনার এটি পড়তে ফ্লাসপ্লেয়ার দরকার পড়তেও পারে। নামিয়ে নিন এখান থেকে। যারা পিডিএফে পড়তে পারবেন না, তাদের জন্যে ছবিতেও রইল। দুবার ক্লিক করুন। ছবি বড় হয়ে যাবে, পড়তে পারবেন।













নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি ও আমাদের কর্তব্য

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , ,




(এই নিবন্ধটি অরুণোদয়, মে, ২০১৪ সংখ্যার জন্য লিখেছেন অরূপা মহাজন। )



হিন্দুত্ববাদ ও নয়া-উদারবাদ

            জয় ও পরাজয় পরস্পর সম্পৃক্ত। এই পরিভাষায় এবারের নির্বাচনী ফলাফলকে যে কোন সাধারণ পর্যবেক্ষক বিজেপির জয় ও কংগ্রেসের পরাজয় হিসেবে চিত্রায়িত করবেন। কিন্তু সাধারণ এই বয়ানের অন্তরালে যে সামাজিক বা উৎপাদন সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, এই সম্পর্কের সাথে জৈবিক সম্পর্কে আবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিন্যাস এবং সামগ্রীকভাবে রাষ্ট্রীয় ও ব্যাক্তি মালিকদের মধ্যে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের কথা থাকে তাকে গভীরে বিচার করে দেখতে হয় যাতে আগামীতে কী ঘটতে চলেছে তার একটা অনুমান লাগানো যায়।

এনডিটিভি’র এক প্যানেল আলোচনায় বরখা দত্ত প্রশ্ন করেছিলেন যে এবারের নির্বাচন কী ‘প্যারাডিগম সিফট’ সূচিত করছে? উত্তরদাতারা গতবাঁধা উত্তরের মধ্যেই নিজেদের আঁটকে রাখেন। কিন্তু একটু ভাল করে বিচার করলেই দেখা যাবে যে দ্বন্দ্বের মীমাংসার প্রয়াস বাজপেয়ী আমল থেকে শুরু হয়েছিল, মোদীর নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই দ্বন্দ্বের মীমাংসার বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। কী ছিল সেই দ্বন্দ্ব? সেটা ছিল হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের সাথে নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি প্রণয়নের দ্বন্দ্ব। এবার এই সুযোগ কীভাবে উপস্থিত হলো, কেন এবার তার বাস্তবায়ন সম্ভব হলো এবং ভারতীয় জনতার জন্য এটা কী বার্তা বহন করে আনল এসব সবিস্তারে অধ্যয়ন করা, নিজেদের ভূমিকার পর্যালোচনা করা এবং এর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা বামপন্থী ও গণতান্ত্রিকদের কাছে জরুরি কর্তব্য হিসেবে হাজির হয়েছে। এব্যাপারে খানিকটা আলোকপাত করার প্রচেষ্টা নেওয়ার আগে পরাজিতদের অভ্যন্তরে মীমাংসা করতে ব্যার্থ হওয়া সংঘাতের বিষয়টি দেখা যাক।

ইউপিএ’র অভ্যন্তরিণ সংঘাত

            কংগ্রেসের অভ্যন্তরিণ এই সংঘাতটি ইউপিএ ওয়ানের আমলে এতো প্রকট হয়ে দেখা দেয়নি, কারণ নয়া-উদারবাদী অর্থনীতিকে সবাই তখন মেনে নিয়েছিলেম এবং প্রথম দফার সংস্কার কর্মসূচীর সুফলের প্রাথমিক স্পর্শ পেয়ে নতুন মধ্যশ্রেণি এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই তাদের ইপ্সিত আকাঙ্খা পূরণের স্বপ্ন দেখছিলেন। তাই ইউপিএ ওয়ানের প্রশংসা শুধু কর্পোরেট দুনিয়া নয়, খুদ বিজেপিও প্রশংসা করতে কার্পণ্য করেনি। কংগ্রেস-বিজেপি সহযোগিতার পরিবেশে বামপন্থীদেরও ইউপিএ থেকে বেরিয়ে আসতে হলো। কিন্তু ইউপিএ ওয়ানের শেষের দিকে নয়া-উদারবাদী নীতির কুফলগুলি জনসমক্ষে আসতে শুরু করল। সামাজিক অসাম্য বাড়তে থাকল লাফিয়ে লাফিয়ে, বিকাশের হার বৃদ্ধির সাথে সাথে মুষ্ঠিমেয় কিছু লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে থাকল, দারিদ্র্য-বেকারত্ব-শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষার অভাব-কৃষির ও খাদ্য উৎপাদনের বিপর্যয়ের স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকল। বিদেশি ফিনান্স পুঁজির ফাটকা বিনিয়োগ ও জল-জমি-জঙ্গল লুট করে সেজ-এলাকার সুবিধা ভোগ করে বহুজাতিক পুঁজির অতি-মুনাফাই যে আসলে এই বিকাশের আসল রহস্য তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকল গণ-প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। এই প্রতিবাদ-বিদ্রোহের চাপেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে একটি অংশ রাষ্ট্রের কল্যাণকামী ভূমিকা গ্রহণের ব্যাপারে সরব হয়ে উঠল। দারিদ্র্য দূরীকরণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরিণ বাজারের চাহিদা বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলো। কিন্তু ইউপিএ ওয়ানের শেষের দিকে ও ইউপিএ দুইয়ে গৃহীত এই পদক্ষেপগুলি কর্পোরেট দুনিয়াকে অসন্তুষ্ট করে তুলল। বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকটকালে শ্রমের জন্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে অধিক ব্যয় তাদের মুনাফার হারকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। কর্পোরেট দুনিয়ার অসন্তোষকে দূর করার জন্য সরকার নয়া-উদারবাদী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখল, দেশের সম্পদ তাদের লুটের জন্য খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি হলো যথেচ্ছভাবে। কিন্তু রাষ্ট্রের কল্যাণকামী ভূমিকাকে নস্যাৎ করে দিয়ে দ্বীতিয় প্রজন্মের সংস্কারের জন্য কর্পোরেট দুনিয়ার আকাঙ্খার বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা বিনিয়োগে উৎসাহ বোধ করল না। রপ্তানী বাণিজ্য, শেয়ার-বাজার, মুদ্রা-বাজারের অবনমন ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি বাণিজ্য নীতিকে অবাধ করে দিয়ে ও ইন্টারেস্ট রেট রিজিমের মাধ্যমে মানি-সাপ্লাইকে নিয়ন্ত্রণ করে রোখা যায় না, কিন্তু কংগ্রেস সরকার বিকল্প কোন পথ মাড়ালই না। অন্যদিকে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে দরিদ্র গ্রামীণ মানুষ ও অসংগঠিত শ্রমিকের মন জয়ের কংগ্রেসি প্রচেষ্টাও সফলতার মুখ দেখল না। কারণ কল্যাণকামী ব্যবস্থাগুলি কায়েম করতে যে সরকারি কোষাগার প্রয়োজন তার ব্যবস্থা করার জন্য বিকল্প কোন শিল্প-নীতির পথ তাঁরা অবলম্বন করল না এবং যেটুকু অর্থ সেক্ষেত্রে বরাদ্দ হলো তাও লুটেপুটে খেয়ে নিল দুর্নীতিবাজ কংগ্রেসি দলতন্ত্র ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনযন্ত্র।

কংগ্রেসি দোলাচল ও বামপন্থীদের ভূমিকা
             অনগ্রসর একটি দেশে মানসিক শ্রমের সাথে যুক্ত শ্রমিকরা সাধারণতঃ দৈহিক শ্রমের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের সাথে ঐক্য স্থাপনের জন্য নিজে থেকেই মতাদর্শগতভাবে আগ্রহী হয়ে উঠে না। বামপন্থী মতাদর্শের যেটুকু প্রভাব পূর্বে ছিল তার অস্তিত্ব এখন আর নেই। তাই মানসিক শ্রমের সাথে যুক্ত পুরোনো পাবলিক সেক্টরের অবশিষ্টাংস, তথ্য-প্রযুক্তি ও ব্যক্তিগত খণ্ডের সাথে যুক্ত নতুন এই শ্রেণি এবং যারা মানসিক শ্রমের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে সেই শিক্ষিত শ্রেণির বৃহৎ অংশ (একাংশকে আম-আদমি পার্টি কিছু জায়গা করে দিতে পেরেছিল) সমস্যার চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী এক সমাধানের এক কল্পিত আলেয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। অথচ তারা সামাজিক কল্যাণের এক গঠনমূলক পথের দিকে আকৃষ্ট হতে পারত যদি অভ্যন্তরিণ বাজারকে সচল করা, দেশীয় উদ্যোগ ও পাবলিক সেক্টরকে সচল করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, ভূমি সংস্কার-কৃষির আধুনিকীকরণ ও শিল্পায়নের পরিকল্পনা ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের আয়ের উপর করের বোঝা চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার নির্মাণ ইত্যাদি পদক্ষেপের দিকে সরকার হাঁটত। এক্ষেত্রে নয়া-উদারবাদী নীতিকে পুরোপুরি বিরোধিতা করতে হত। নয়া-উদারবাদ ও কল্যাণকামী এক রাষ্ট্রীয় নীতি – এই দুয়ের মাঝামাঝি এক পথ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কংগ্রেসি সরকার না সন্তুষ্ট করতে পারল কর্পোরেট দুনিয়াকে, না দরিদ্র গ্রামীণ মানুষের মন জয় করতে পারল। আজকের বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকটকালে ও কেইন্সীয় অর্থনীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার সময়ে এধরণের ভারসাম্য বজায় রাখার পন্থা সফলতার মুখ দেখতে পারে না। আর শিক্ষিত বেতনভোগী শ্রেণি ও শিক্ষিত মধ্যশ্রেণি যখন অন্যপথে হাঁটে, তখন অসংগঠিত গরিব কায়িক শ্রমজীবী ও কৃষকদেরকেও তাদের সাথে টেনে নিয়ে যায়। সংসদীয় বামপন্থীরাও ভারতবর্ষের বিভিন্ন পেশার মানুষদের ও সামাজিক আন্দোলনগুলিকে একত্রিত করে ব্যাপক মঞ্চ তৈরি করার প্রয়াস নেননি, যেখানে তাদের আকাঙ্খা ও ক্ষোভের এক বাম-মতাদর্শগত সমাধানের পথের সন্ধান তারা করতে পারে। এক্ষেত্রে আম-আদমি পার্টির ভূমিকা বরঞ্চ প্রশংসনীয়। এই মতাদর্শগত শূন্যতার পরিস্থিতিতে বিত্ত পুঁজি, বণিক পুঁজি ও তাদের সহযোগী     শিল্প-মালিক ও কৃষি এলিটদের জোট উপরুল্লিখিত দুটি শ্রেণি ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয় এবং এরফলেই ভারতীয় রাজনীতিতে ঘটে এক চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী উত্থান। তাদের অর্থে ও এই শিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিকদের সহায়তায় গড়ে তোলা হয় প্রচারের এমন এক অভূতপূর্ব মায়াজাল যাকে ভেদ করে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি কারুর। এখানেই এই উত্থানের কাহিনীর শেষ নয়। এর পেছনে আরও কিছু বৈশষ্ট্য রয়েছে।

প্রতিবন্ধকতার মোহ ও দক্ষিণপন্থী সাংগঠনিক বিস্তার

             চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী উত্থানের প্রশ্নে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তি ও ব্যাক্তিরা একধরনের আত্মসন্তুষ্টিতে আক্রান্ত ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল যে ভারতীয় বৈচিত্র, মণ্ডল রাজনীতি, দলিত উত্থান এগুলির জন্য ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মাথা তুলে দাঁড়াবে না। বাস্তবে এই প্রতিবন্ধকতাগুলি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বহুদিন ধরে প্রতিহত করেও আসছিল। কিন্তু আর্থিক-সামাজিক চূড়ান্ত সংকটের সময় ও মানুষের আকাঙ্খা বৃদ্ধির ঊষালগ্নে বিকল্প কোন গণতান্ত্রিক পথের সন্ধান ছাড়া সমাধানের উগ্র-ভাবনার বিষম উন্নয়নের কল্পিত রূপের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা যায়। তাই ফিনান্স পুঁজি, বণিক পুঁজি ও কৃষি-এলিটরা বিহার উত্তরপ্রদেশের অতি-দলিত ও অতি-অবিসিদেরও তাদের পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিহারে যদিও লালু যাদবের নেতৃত্বে যাদব-মুসলিম ঐক্য গড়ে উঠেছিল, উত্তর প্রদেশে মুজাফফর নগর দাঙ্গায় ইউপি সরকারের নেক্কারজনক ভূমিকার ফলে যাদব ভোটও এসপি’র ছত্রছায়া ত্যাগ করে বিজেপির কোলে আশ্রয় নেয়। উপরন্তু সাম্প্রদায়িক এক বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো যে ইতিমধ্যে ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্তে গড়ে উঠেছে এব্যাপারটাকেও সবাই খাটো করে দেখেছেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষি বিপর্যয়, উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগরের দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে সংঘ পরিবারের মতাদর্শগত প্রচার সামাজিক ঐক্যের বিন্যাসে যে নতুন এক সমীকরণ গড়ে তুলেছে এদিকে কারুর দৃষ্টি পড়েছে বলে মনে হয় না। তবে যেসব রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলি সক্রিয় রয়েছে সেইসব রাজ্যে সংঘ পরিবার খুব বেশি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আঞ্চলিক বুর্জোয়ারা কতদূর নয়া-উদারবাদের সাথে সমঝোতা বা বিরোধিতা করতে প্রস্তুত সে বিষয়টি যাচাই করে দেখা উচিত। আনন্দবাজারের মত গোষ্ঠীদের এই প্রক্রিয়ায় একটা ভারসাম্য রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বাম-গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও তামিল জাতিয়তাবাদী চেতনা ও দলিত আন্দোলনের ঐতিহ্য এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করেছে কিনা সেটাও বিচার্য। মমতার মুসলিম ভোট পাওয়ার বাধ্যবাধকতা ও জয়লিলতার এধরনের বাধ্যবাধকতা না থাকাই তাদের অবস্থানের একমাত্র কারণ কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয়।

জার্মানীর ইতিহাসের সাযুজ্য
            মোটামুটিভাবে প্রায় একই কালসীমায় ইতিহাসের কোন ঘটনার যখন পুনরাবৃত্তি ঘটে, তখন সাযুজ্য ও তূলনামূলক বিচারের পদ্ধতি সীমিত ক্ষেত্রে হলেও কিছু পথের সন্ধান দেয়। ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে জার্মানীর পুঁজিবাদের বিকাশ শুরু হয়েছিল কিছুটা বিলম্বে। পুঁজিবাদের বিকাশ এবং তার অপূর্ণতা ও দুর্বলতা, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দুর্বলতা, পুঁজির ও সামাজিক শ্রেণির এবং ওয়েমার সংসদীয় ব্যবস্থার সংকট ইত্যাদি হিটলারের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক উগ্র-জাতিয়তাবাদের দিকে জনগণকে আকৃষ্ট করতে ও ফ্যাসিস্ট উত্থানে গণ-সমর্থন লাভে নাজি পার্টিকে সফলতা প্রদান করেছিল। ওয়েমার গণতন্ত্রের জার্মানে ১৯৩০ অব্দি মোটামুটিভাবে ভারী-শিল্প মালিকদের ও সংগঠিত শ্রমিকদের এক কোয়ালিশন বজায় ছিল। এই কোয়ালিশন তৈরি হয়েছিল পুঁজিবাদী গঠন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির সময়ে এস্টেট মালিক বা কৃষি এলিটদের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্বকে প্রাধাণ্য দিয়ে। ক্ষমতার অংশীদারী হয়ে সংগঠিত শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকের মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, চাকরির স্থায়ীত্ব ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ১৯১৪ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে যুদ্ধ ও বিপ্লবের প্রেক্ষিতেই পুঁজির সংকটের পর্যায় শুরু হয়। ফলে শ্রমের জন্য ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শিল্প-পুঁজিপতিদের মুনাফা কমে যাওয়াকে তারা মেনে নিতে পারেনি এবং তারা এস্টেট-মালিক তথা কৃষি-এলিট ও ব্যাঙ্কারদের সাথে আঁতাত করে শ্রমের বিরোধিতায় নেমে পড়ে। এই আঁতাত গড়ে উঠে রপ্তানী শিল্পের উপর গুরুত্ত্ব আরোপ করে কৃষি এলিট ও ফিনান্স পুঁজির জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়ে। এই জোট উগ্র সাংস্কৃতিক জাতিয়তবাদী আবেদনের মাধ্যমে মধ্যশ্রেণি, পেটি-বুর্জোয়া, বেতনভোগী সবাইকে নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়। ১৯৩৫ সালের পপুলার ফ্রন্টের ধারণার আগে পর্যন্ত বামপন্থীরা শ্রমিক শ্রেণির বাইরে কর্মচারী, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, পেনশনার, প্রফেশনাল, গ্রাহক, নাগরিক, করদাতা, কৃষক ইত্যাদি সমাজের প্রতিটি অংশের উদ্দেশ্যে বাম-মতাদর্শের ছত্রছায়ায় সুনির্দিষ্ট কর্মসূচীর ভিত্তিতে কোন ব্যাপক জোট গড়ে তোলার আবেদন জানায়নি ও প্রচেষ্টা নেয়নি। উৎপাদনী সম্পর্ক বা সামাজিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদীকরণের সময়ে বামপন্থীরা পেটি-বুর্জোয়া এবং শাসক শ্রেণির সাথে সমদূরত্ব বজায় রাখার নীতি এই ফ্যাসীবাদীকরণে সহায়তা করেছে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে ন্যাশনাল সোসালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি (এনএসডিএপি), যাদের মূল সমর্থন ভিত্তি ছিল পেটি-বুর্জোয়াদের মধ্যে, সমাজের সব অংশ এমনকি মজুরি-শ্রমিকদেরকেও তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে নেয় এবং তারা একাজটি করে সমাজবাদ-সাম্যবাদ বিরোধী এক উগ্র-জাতিয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জাগরণের আহ্বানে। তাদের এই উত্থান ঘটে ওয়েমার সংসদীয় গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে তাকে ভেঙে দেওয়ার মনোবাসনা নিয়ে। পরস্পর বিপরীত আকাঙ্খার বিভিন্ন শ্রেণির সমর্থন আদায় করেও হিটলার ও নাজি নেতৃত্ব এলিট শ্রেণিকে আস্বস্ত করতে সমর্থ হন যে ব্যবস্থার সংকটকালে তারাই এলিট স্বার্থকে সুরক্ষিত করতে সক্ষম এবং নাজি পার্টির ক্ষমতায় আরোহণের ক্ষেত্রে এলিট-ফাণ্ডেড ব্যাপক মিডিয়া প্রচার তাদেরকে সহায়তা করেছিল। হিটলারি ফ্যাসিস্ট উত্থানের সাথে ১৯৩০-৩২ সালের ব্রুনিং ও পাপেনের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে পৃথক করে না দেখার মাশুল গুণতে হয়েছে জার্মান কম্যুনিষ্টদের। হিটলারের জমানায় ওয়েমার-জার্মানীর ফ্যাসিবাদীকরণের বাকী ইতিহাস সম্পর্কে সবাই অবগত। গোটা জার্মানী জাতি এখনও হিটলারি রাজত্বের কথা স্মরণ করে লজ্জায় অবনত।

রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদীকরণের সম্ভাবনা ও তার প্রতিকার
              ভারতবর্ষে যখন সাংস্কৃতিক উগ্র-জাতিয়তাবাদ কর্পোরেট দুনিয়ার খোলাখুলি মদতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব ফিনান্স পুঁজি শিল্প-পুঁজির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলেছে। বর্তমান ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থা্র ডামাডোল, ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা ও পুঁজিবাদের সংকটে ত্রস্ত এলিট-শ্রেণি রাষ্ট্র পরিচালনায় ত্রাতা হিসেবে তাদের উপরই বাজি রেখেছে। সুতরাং এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংঘ পরিবারের উগ্র-জাতিয়তাবাদকে মোদী সরকার কী করে সামলায় এটা নিশ্চয়ই দেখার বিষয়। কারণ সংঘ পরিবারের অভ্যন্তরে স্তিমিত হয়ে যাওয়া জাতীয় অর্থনীতির প্রবক্তারা অনুকুল পরিস্থিতিতে মুখ খোলার চেষ্টা করতেও পারেন। সংসদকে কম গুরুত্ত্ব দিয়ে এক্সিকিউটিভ সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ চালাতে গেলে ভাজপার অভ্যন্তরে অনেককেই অসন্তুষ্ট করবে, সেই অসন্তুষ্টিকে কীভাবে প্রশমিত করা হয় সেটাও দেখার। “লেস গভার্ণমেন্ট, মোর গভার্ণন্যান্স” শ্লোগানের অন্তরালে দরিদ্র্য ও সংবেদনশীল জনসমষ্ঠীকে ভর্তুকি প্রদানের মত রাষ্ট্রের কল্যাণকামী ভূমিকা ক্রমান্বয়ে তুলে দেওয়ার এলিট-শ্রেণির ইচ্ছা রূপায়ণে রাজ্যসভার বাধা অতিক্রম করতে কীধরনের সংসদীয় রীতি-বিরুদ্ধ প্রথা ব্যবহার করা হয় প্রাথমিক পর্যায়ে এটাও লক্ষ্যণীয়। উপরন্তু ভারতীয় সভ্যতা, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের আকাঙ্খাকে মোদীর নেতৃত্বে সংঘ-পরিবারের প্রকল্প কীভাবে মোকাবিলা করে সেটাও দেখার বিষয়। এই সবগুলি নিশ্চিতভাবে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদীকরণের জন্য অনতিক্রম্য প্রতিবন্ধকতা নয়, বিশেষ করে সেই পরিস্থিতিতে যখন নয়া-উদারবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। এই প্রয়োজনের বাস্তবতা তৈরি হতে পারে যদি প্রতিটি সংসদীয় দল নিজেদের আর্থ-সামাজিক নীতির পুনর্মূল্যায়ন করে এবং গণমুখী সাংগঠনিক পুনর্গঠন করে। কংগ্রেসকেও এই পুনর্গঠনের কাজ করতে হবে, কারণ তাদের বর্তমান শক্তি থেকে উঠে আসার জন্য মোদীর দেখানো পথ খুব একটা সহায় করবে না, কিন্তু কংগ্রেসের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে নয়া-উদারবাদী পথের মোহ থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এই অভূতপূর্ব হারের পরও দেখা যাচ্ছে না। গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সংসদীয় ও অন্যান্য বাম দল, আম আদমি পার্টি, প্রকৃত বামপন্থীরা, কিছু পরিমাণে আঞ্চলিক ও জনগোষ্ঠীগত শক্তিগুলি। কিন্তু এই ভূমিকার আসল সূত্র লুকিয়ে আছে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনগুলির শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মধ্যে এবং তাই প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজকর্মী ও বামপন্থীদের একাজে গুরুত্ত্ব সহকারে হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং তার উপর ভিত্তি করেই বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। পরিস্থিতির এধরনের ক্রমবিকাশ ঘটলে জার্মানীর মতন আমাদের রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদীকরণ দেখতে নাও হতে পারে কিংবা ফ্যাসীবাদ ক্ষণস্থায়ী ও সীমিত হতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে লজ্জাবনত হতে না হতে পারে। আমাদের একথা মনে রাখতে হবে যে উৎপাদন বা আর্থিক সম্পর্ক রাজনীতিকে নির্ধারণ করে, আবার রাজনীতি উৎপাদন সম্পর্ককে প্রভাবিত করে যার মধ্যে মতাদর্শগত প্রশ্নটি গুরুত্ত্বপূর্ণ। একে কোন একমাত্রিকভাবে নির্ধারিত বিষয় হিসেবে হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

আসামের নির্বাচনী ফলাফলের বৈশিষ্ট্য

               অরুণোদয় পত্রিকা যেহেতু আসাম রাজ্য থেকে প্রকাশিত হয়, তাই আসাম সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেওয়া উচিত। আসাম নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে নিম্ন আসাম ও বরাক উপত্যকার নির্বাচনী ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণ। নিম্ন আসাম বিশেষ করে কোকরাঝাড় নির্বাচন চক্রে নির্দল অ-বড়ো প্রার্থীর সাড়ে তিন লাখেরও অধিক ভোটে বিজয় এটাই প্রমাণ করে যে অকুতোভয়ে অ-বড়ো সব সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিয়েছেন এবং তাতে বড়ো উগ্রজাতিয়তাবাদী-সন্ত্রাসবাদীদের পিছু হটতে বাধ্য করবে এবং বড়োদের মধ্য থেকে ক্ষীণ হলেও গণতান্ত্রিক আওয়াজ উঠে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এই পরিস্থিতিতে সব জনগোষ্ঠীর এক ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক মঞ্চ গড়ে উঠার পথ প্রশস্ত হবে। বরাক উপত্যকার দুটি নির্বাচন চক্রের ফলাফল এটাই দেখায় যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে যখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা দিচ্ছে, তখন বরাকের দুটি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল গণতান্ত্রিক পর্যবেক্ষকদেরকে আশান্বিত করেছে। করিমগঞ্জের এইউডিএফ প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোটে জয় এটাই দেখায় যে সেখানে মুসলিম ও নমঃশূদ্র ভোট এককাট্টা হয়েছে এবং বিজয়ী প্রার্থীর অন্যান্য সম্প্রাদায়েরও ভোট প্রাপ্তি ঘটেছে। শিলচর নির্বাচন চক্রে এইউডিএফ প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোট প্রাপ্তি সত্ত্বেও পয়ত্রিশ হাজারেরও অধিক ভোটে কংগ্রেস প্রার্থীর জয় থেকে বোঝা যায় যে মুসলিম ও চা-শ্রমিক ভোট ছাড়াও বিজয়ী প্রার্থীর অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোট প্রাপ্তি ঘটেছে। শিলচরে এইউডিএফ-এর প্রাক্তণ কংগ্রেসী মুসলিম প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট এইউডিএফ-এর সমর্থকদের ভোট না কংগ্রেসী স্যাবোতাজজনিত ভোট এব্যাপারে পর্যবেক্ষকরা সন্দিহান। এব্যাপারে অনেকেরই মত এই যে এইউডিএফের প্রাপ্ত ভোট আসলে কংগ্রেসী ভোট, এইউডিএফের ভোট নয় এবং এইউডিএফের ভোট কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষে গেছে। উভয় নির্বাচনী চক্রে বিজেপি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও বরাক উপত্যকার নির্বাচনে সে অর্থে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটেনি। নিম্ন আসাম ও বরাক উপত্যকার নির্বাচনী ফলাফল গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুত্থানের জন্য আশাব্যঞ্জক।  

নরেন্দ্র মোদীর প্রধান মন্ত্রী রূপে রাজ-অভিষেকের পর ‘নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি ও আমাদের কর্তব্য’ এই মূল নিবন্ধে সংযোজন ঃ
২৬ মে ঘটা করে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রী পরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হলো। এবারের এই অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ ছিল মালদ্বীপ সহ সার্ক দেশসমূহের উপস্থিতি। পাকিস্তানের উজিরে আজম নওয়াজ শরিফের উপস্থিতি ও দুই রাষ্ট্র-প্রধানের মধ্যে নিভৃতে বার্তালাপ সবচাইতে বেশি আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠল। এই সরকারের আসল এজেণ্ডা যে উন্নয়ন এবং সার্ক দেশসমূহের অভ্যন্তরিণ বানিজ্যের উপর গুরুত্ত্ব আরোপ করার জন্যই এই প্রয়াস তাতে আর অনেক বিশেষজ্ঞদেরই কোন সন্দেহ রইল না। বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধণ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির ক্ষেত্রে যে জটিল বিষয়গুলি রয়েছে তার মীমাংসার পথে যেন হাঁটে বর্তমান সরকার এটাই ছিল এলিট শ্রেণির আকাঙ্খা। কিন্তু পাকিস্তান, বাংলাদেশের সাথে এভাবে সম্পর্ক স্থাপন করার রণকৌশলে ভাজপার কোর-কনস্টিট্যুয়েন্সি তো সন্তুষ্ট হতে পারে না। তাই এই মহা-সমারোহের পর চব্বিশ ঘন্টা যেতে না যেতেই প্রধাণমন্ত্রী দপ্তরের রাজ্য-মন্ত্রী উস্কে দিলেন ৩৭০ ধারা নিয়ে বিতর্ক এবং তাঁর সমর্থনে এগিয়ে এলো আরএসএস-এর সদর দপ্তর। প্রধানমন্ত্রী ফেডারেল কাঠামোকে শক্তিশালী করার কথা বলে জয়ললিতাদের বার্তা পাঠালেন বটে, কিন্তু সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে তাঁর রাজ্য মন্ত্রীর চটজলদি মন্তব্যের ব্যাপারে কিছু বললেন না। অন্যদিকে এই সরকারের শুরুয়াতটাও হয়েছে অর্ডিন্যান্সের মত একটি হাতিয়ার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে যা গণতান্ত্রিকদের আতঙ্কিত করার পক্ষে যথেষ্ট। কালো টাকার সন্ধান ও উদ্ধার নব-গঠিত কমিশনের তদন্তের দায়রা থেকে কতটুকু বেরোতে পারবে তা এখনো সন্দেহের আবর্তে, কারণ এক্ষেত্রে আমেরিকানদের স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে এবং পূর্বতন সরকারও কালো টাকার সন্ধানে অনেক কুনাট্য করেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই ভারসাম্যের খেলা কিছুদিন চলতে থাকবে, অন্ততঃ বিভিন্ন রাজ্যের আশু নির্বাচনগুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো বটেই। আমাদের সংস্কারমুখী অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণাই করে দিয়েছেন যে রপ্তানী বৃদ্ধি করে জটিল আর্থিক পরিস্থিতিকে সামলানো ও বিকাশের হার বৃদ্ধি করাই তাঁর প্রাথমিকতা। রপ্তানী নির্ভর বিকাশ যে বিশ্ব বিত্ত পুঁজি ও বণিক পুঁজির কাছে সবচাইতে বেশি কাম্য এখন আর তা খোলসা করে কাউকে বোঝাতে হয় না। বর্তমান বিশ্বে বিত্ত পুঁজির নিয়ন্ত্রক আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট। সুতরাং সার্ক দেশসমূহের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমেরিকান প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এখানে কিছু সমস্যা রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে ও দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধে স্বল্প সময়ের জন্য নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে অংশগ্রহণ করার জন্য পুঁজিবাদী দেশসমূহের মধ্যে আমেরিকা তার আর্থিক অবস্থাকে সুরক্ষিত করতে পেরেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইউরোপীয় দেশসমূহকে ক্ষতিপূরণের দায় জার্মানীর উপর চাপিয়ে দিয়ে যে ভার্সাই চুক্তি হলো, তাতে জার্মানী আমেরিকার কাছ থেকে ধার নিতে বাধ্য হলো এবং জার্মান পুঁজিবাদ রপ্তানীভিত্তিক উৎপাদনের উপর গুরুত্ত্ব আরপ করতে গিয়ে চাহিদা মেটাতে বাস্তবে প্রভূত আমদানী বৃদ্ধি ঘটালো এবং ধারের জন্য উত্তরোত্তর আমেরিকান ব্যাঙ্কারদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। ভিন্ন প্রেক্ষিতে অনুরূপ ব্যালেন্স অব ক্রাইসিসের মধ্যে ১৯৯০ সালে বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে মনমোহন সিংহকে কাঠামোগত পুনর্গঠনের নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি চালু করতে হয়েছিল। আমেরিকান বিত্ত পুঁজির উপর নির্ভরশীল জার্মানী তথা ইউরোপীয় দেশসমূহ এই ঋণ-কাঠামোকে ধরে রাখার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারল না। তীব্র বেকারত্ব ও জনগণের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া যে চাহিদার সংকট তৈরি করল তাতে উৎপাদনী বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে এবং আমেরিকার ধার দেওয়ার ক্ষমতাকেও সংকুচিত করে ফেলল। এই সংকটের চূড়ান্ত পড়িনতি ১৯২৯ সালের শেয়ার বাজার পতন ও মহামন্দার শুরুয়াত। বিত্ত-পুঁজি নির্ভর বিকাশের এই ইউরোপীয় প্রজেক্টের বাইরে রইল একমাত্র সোভিয়েত রাশিয়া যারা বিপ্লবোত্তর পরিকল্পনা-অর্থনীতির পথে হাঁটছিল। পুঁজিবাদের এই সংকট ও ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লবের পর গোটা ইউরোপে আন্দোলনমুখর শ্রমিক শ্রেণি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির বিকাশের বাস্তবতায় গড়ে উঠল পুঁজি-শ্রমের সমঝোতার নিউ-ডিল। ইউরোপের পুঁজিবাদের পুনরায় জেগে উঠা নির্ভর করছিল জার্মান অর্থনীতির সুস্থিরতা ও বিকাশের উপর। জার্মানীর বাস্তবতার অতি-মূল্যায়ন করে কম্যুনিস্ট নেতৃত্ব ধরেই নিয়েছিল যে জার্মানীতে বিপ্লব হয়ে যাবে ও শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা দখল করে নেবে এবং তাদের এই অত্যুৎসাহের ফলেই কম্যুনিস্ট পার্টি সমাজ-গণতন্ত্রীদের সাথেও ঐক্য স্থাপন করার কথা ভাবল না। এই সুযোগেই ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম হলো ও হিটলারের বিশ্ব-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। জার্মানীতেই এই প্রক্রিয়া গড়ে উঠার পেছনে সম্ভবত আরেকটি কারণ ছিল। ফরাসী বিপ্লব যেভাবে ফরাসীদের মনোজগতে লিবারেল-ডেমোক্রেসীর মূল্যবোধ গড়ে তুলেছিল, জার্মানীতে সেরকম কোন ঐতিহ্য ছিল না। যাইহউক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে স্বল্প সময়ের জন্য আমেরিকার অংশগ্রহণ অন্যান্য দেশের তূলনায় আমেরিকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত করে রাখল এবং বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ধার প্রদানের জন্য আমেরিকা বিত্ত পুঁজির প্রধান কেন্দ্র হয়ে রইল। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য কোন একক শক্তি আর রইল না। কিন্তু মুনাফা ও সঞ্চয়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পুজিবাদের দীর্ঘম্যাদী সংকট আবারও তৈরি হয়েছে সত্তরের দশকে। সুতরাং আরেকটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করার পথে হাঁটছে বিশ্ব-পুঁজিবাদ। এই পর্যায়ে মতাদর্শগত স্তরে সোভিয়েত রাশিয়ার মত কোন কম্যুনিস্ট বিকল্পের ভয় তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে না। তবে ভোগ্যপণ্যের ও মিলিটারী উৎপাদনী মেশিনকে চালু রাখার জন্য আমেরিকান বিশ্ব-আধিপত্যের আর্থিক ও সামরিক কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। আর্থিক দিক দিয়ে চিন এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ, ভাঙনের পরও রাশিয়ার সামরিক ক্ষমতা অটুট। চিন সমুদ্র উপকূলে শক্তি প্রদর্শনের জন্য রাশিয়া ও চিন যৌথ মহড়ায় অবতীর্ণ হয়েছে, ইউক্রেনের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে যে রাশিয়া তাদের রণকৌশলগত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ কোনভাবেই ছেড়ে দেবে না। ২০০৮ সালের শেয়ার বাজার পতনের পর আমেরিকার আর্থিক ক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে। মোদী সরকার ও অন্যান্য সার্ক দেশগুলি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির এই দ্বিবিধ শক্তির রণকৌশলগত খেলায় কী বিদেশ নীতি অবলম্বন করে এটাও দেখার বিষয়। তবে বিশ্ব-পুঁজিবাদের এই সংকটময়কালে সীমিত যুদ্ধ, ফ্যাসীবাদী উত্থান ও তার বিপরীতে মেহনতি মানুষের আন্দোলনমুখী উত্থান যে এক বাস্তব পরিস্থিতি হিসেবে দেখা দিয়েছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। শক্তির ভারসাম্য যুদ্ধ-ফ্যাসীবাদ-ধ্বংস না গণতন্ত্র-সাম্যবাদ-সৃষ্টির পক্ষে বিকশিত হবে তার প্রতি তীক্ষ্ণ নজর ও রণনীতিগত পন্থা অবলম্বন করতে হবে এবং একাজটি করতে হবে মানবতা ও মানব সভ্যতার স্বার্থেই। ইতিমধ্যেই পরিবেশ বিপর্যয় ও যুদ্ধ সামগ্রীর সম্ভার মানব সভ্যতাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঐক্য, সৌভাতৃত্ব ও সাম্যের শ্লোগান আবারও বিশ্ব-মানবের আঙ্গিনায় মুখরিত হোক – এটাই কাম্য।         
   

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

(ইউনিকোডে যারা পড়তে পারবেন না, তাদের জন্যে ছবিতে রইল নিচে)               








নয়া-উদারবাদী বিশ্বায়ন ও এনরেগা আন্দোলন

Posted by স্বাভিমান Labels: , ,



                                 অরূপা মহাজন
                              (অরুণোদয়ের জন্য)
উনিশ শতকের উদারবাদ

       ‘নয়া-উদারবাদী বিশ্বায়ন’ – ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বিচার না করলে এই শব্দবন্ধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। উনিশ শতিকার উত্থানোন্মুখ শ্রমিক শ্রেণি ও বিশ্ব-যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় পুঁজির সম্প্রসারণের পরিস্থিতিতে শ্রমিকশ্রেণি ও পুঁজির মধ্যে এক সমঝোতা গড়ে ওঠে। পুঁজির স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হলেও শ্রমিকশ্রেণির সামাজিক সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলের অধিকারের পক্ষে রাষ্ট্র ভূমিকা নিয়েছে। বাজারে পুঁজিমালিক বা শিল্পমালিকদের উৎপন্ন সামগ্রীর চাহিদা তৈরির ক্ষেত্রে এই শ্রমিক শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার বিশেষ ভূমিকা থেকেছে। পুঁজি ও শ্রমিকের এই সহাবস্থানের পরিস্থিতিতে বিশ্বায়িত পুঁজির পক্ষে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের ভূমিকাকে উদারবাদ হিসেবে পরিগণিত করা হয়েছে। এই উদারবাদ একদিকে শ্রমিক শ্রেণির কিছু সুবিধা আদায়ের পর্যায়কে যেমনি চিহ্নিত করে, ঠিক তেমনি শ্রমিক শ্রেণির পরাজয়কেও সূচিত করে। কারণ সর্বহারা শিল্প শ্রমিকদের আবির্ভাবের সাথে সাথে এটা আশা করা হয়েছিল যে শ্রমিক শ্রেণি মানব সমাজের সাধারণ স্বার্থকে বহন করবে এবং শ্রেণিশাসন ও শোষণের অবসান ঘটবে। সে বিচারে উনিশ শতকের উদারবাদ পুঁজির স্বার্থেই একধরনের শ্রেণিসমঝোতা।
শ্রেণি-সমঝোতার কাঠামোর পতন ও নয়া-উদারবাদ

                     কিন্তু সত্তরের দশকের মুদ্রাস্ফীতির সংকটের চাপে এবং রাষ্ট্রকে নিজেদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার মত ক্ষমতাধর বৃহৎ ওলিগোপলিদের (মনোপলি বা একচেটিয়া পুঁজিপতিদের গ্রুপ) আবির্ভাবের ফলে এই শ্রেণি সমঝোতায় ফাটল দেখা দেয়। শিল্পশ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতার বাড়বাড়ন্ত যেমনি উদারবাদী নীতিকে নির্ধারণ করেছে, ঠিক তেমনি উদারবাদের পতনের মাধ্যমে যে নতুন পরতিস্থিতির উদয় হয়েছে সেটাও নির্ধারিত হয়েছে এক নতুন শ্রেণির শক্তি সঞ্চয়নের মধ্য দিয়ে, সেই নতুন শ্রেণিটি হচ্ছে বিত্তীয় শ্রেণি। লেনিন বর্ণিত পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপে শিল্পপতিরা বিত্ত বা ফিনান্স পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণ করত ও নিজেদের স্বার্থে লগ্নি করত। বর্তমান পর্যায়ে ব্যাপক ও সুগঠিত ঋণ-কাঠামো এবং বিত্ত-বাজারে লগ্নি করার বিস্তৃত সব নব্য-প্রকরণের মাধ্যমে বিত্তপুঁজির নিজস্ব বিত্ত-বাজারে বিত্তীয়-ওলিগোপলিস্টদের আবির্ভাব ঘটেছে এবং এই ওলিগোপলিস্টরা রাষ্ট্রীয় নীতিকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবান্বিত করে এই বাজারকে সচল রাখার পক্ষে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছে এবং শ্রমিক তথা আম-জনতার যেটুকু অধিকার উদারবাদের পর্যায়ে স্বীকৃত ছিল সেই অধিকার তথা সামাজিক-সুরক্ষার কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। পুঁজিবাদের বর্তমান এই পর্যায়কেই নয়া-উদারবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উদারবাদী বা নয়া-উদারবাদী বিশ্বায়ন আসলে পুঁজির বিশ্বায়ন, শ্রমের বিশ্বায়ন নয়। বর্তমানে পুঁজির এই বিশ্বায়নের গতি অনেক অনেক গুণ তীব্র, কারণ জনস্বার্থে জাতিরাষ্ট্রের যেটুকু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পূর্বে ছিল তা এই পর্যায়ে অনেকখানি ক্ষীয়মান।
বাজারের চাহিদা ও নয়া-উদারবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া

              কিন্তু একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন পাঠকের মনে উদয় হওয়া স্বাভাবিক। উনিশ শতকের উদারবাদের পরিস্থিতিতে শিল্পমালিকদের উৎপাদনের মেশিনকে সচল রাখার জন্য উৎপন্ন সামগ্রীর উপভোক্তা হিসেবে শ্রমিক শ্রেণি যে চাহিদা তৈরি করেছিল, শ্রমিকশ্রেণি তথা আম-জনতার অবনমনের নয়া-উদারবাদী পর্যায়ে পুঁজিমালিকদের জন্য বাজারের প্রয়োজনীয় চাহিদা কারা এবং কীভাবে তৈরি করছে? বিত্ত-বাজারে শেয়ার, বণ্ড, সিকিউরিটির মত পণ্যের কেনাবেচাকে সচল রাখতে আমেরিকার মত পুঁজির কেন্দ্রের বাজারে ঢালাও ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, এমনকী জনগণের যে অংশ ঋণ ফেরত দিতে সক্ষম নয় তাদেরকেও ঋণের আওতায় নিয়ে আসা হয়। যে এসেটের জন্য ঋণ দেওয়া হয় সেই এসেটের দামের ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটায় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ ফেরত দেওয়ার আস্থা জন্মে এবং ঋণদাতাদেরও আস্থা জন্মে বন্ধক হিসেবে এই এসেটের দাম বৃদ্ধির ফলে। ঋণ প্রদানে ঝুঁকি এড়ানোর জন্য ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলি এই বন্ধকী সম্পত্তির উপর ভিত্তি করে সিকিউরিটি সার্টিফিকেট তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ঋণপ্রদানের অর্থ আদায় করে এবং এই সিকিউরিটি সার্টিফিকেটগুলো বিত্ত বাজারে ব্যাপক কেনাবেচার মাধ্যমে মূল সম্পত্তির কৃত্রিম মূল্যের এমন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি ঘটে যে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা মুস্কিল হয়ে পড়ে এবং এভাবে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে এক একটা ফানুস বা বুদবুদ তৈরি হয়। যে কোন কারণে বাজারে অনাস্থা তৈরি হলে এই বুদবুদগুলি ফেটে গিয়ে বাজারে পুঁজির বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিষাক্ত এসেট হিসেবে পরিগণিত এই সিকিউরিটি সার্টিফিকেটগুলো আর কেউ কিনতে রাজী হয় না, ঋণগ্রহীতারা ঋণ ফেরত দিতে অপারগ হয়ে ওঠে এবং মূল মর্টগেজ সম্পত্তির মূল্য একেবারে তলানিতে চলে যাওয়ায় এগুলো বাজেয়াপ্ত করে ঋণদাতাদের কোন ফায়দা হয় না। তখন “ফার্মগুলি এতো বিশাল যে এদেরকে মরতে দেওয়া যায় না”- এই যুক্তির আড়ালে সরকার জনগণের অর্থে এই বিষাক্ত এসেটগুলো ক্রয় করে কোম্পানীগুলোকে বাঁচিয়ে দেয় এবং আরেকটি নতু্ন সম্পত্তিতে এধরনের ঋণের মাধ্যমে ‘সম্পত্তি বুদবুদ’ তৈরির প্রক্রিয়া সূচনা করে। এভাবেই ‘ডটকম বাবল” “হাউজিং বাবল” ইত্যাদি গড়ে উঠেছে এবং সঙ্গত কারণে ফেটেও গেছে। পুঁজির কেন্দ্রে এভাবে যখন বিত্তবাজারের চাহিদা তৈরির প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, তখন ভারতবর্ষের মত প্রান্তিক দেশগুলিতে কাঠামোগত পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিত্ত-বাজারের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্রমাগত শিথিল করা হচ্ছে এবং শিল্পায়নের এমন এক নীতি অনুসরণ করতে সরকারগুলিকে বাধ্য করা হচ্ছে যেখানে শৌখিন সামগ্রীর চাহিদা তৈরির জন্য জনগণের এক ক্ষুদ্র অংশের আয় বৃদ্ধি ঘটছে।
ভারতবর্ষে উদার-আর্থিক নীতির প্রভাব

           ১৯৮০ সালে ভারত সরকার বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে এক বিশাল পরিমাণের ঋণ নেয় এবং এই ঋণের সর্ত হিসেবে কাঠামোগত পুর্ণগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বৃহৎ কোম্পানীর স্বার্থে এবং নির্দেশে সরকারী নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালু করে এবং আম-জনতার সামাজিক ও আয়ের সুরক্ষার সমস্ত সরকারী নীতি ও ভর্তুকী প্রদানের সব সরকারী বন্দোবস্ত একে একে বাতিল করতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং এই নয়া-উদারবাদী আর্থিক নীতিতে সরকারী অফিসিয়্যাল সিলমোহর লাগিয়ে দেন। আধুনিক বিলাস সামগ্রী তৈরির জন্য শিল্পপতিদের জমি প্রদান সুনিশ্চিত করতে উপনিবেশিক ভূমি অধিগ্রহণ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষক উচ্ছেদ, পুঁজিপতিদের সস্তায় প্রাকৃতিক সম্পদ যোগানের জন্য সংখ্যালঘু-অবিসি-দলিত-জনজাতীয়-আদিবাসী উচ্ছেদ, উন্নয়নের নামে ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে পরিবেশ দূষণ ও জনগণকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দেওয়া, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সামগ্রীর আমদানী উপর নির্ভর করে রপ্তানী নীতি নির্ধারণ করার ফলে রপ্তানী আয় থেকে আমদানীর ব্যয়ের বৃদ্ধি ঘটানো, বিত্তপুঁজির ফাটকা বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষিত করতে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে দেওয়া, বিত্ত ও শিল্পবাজারে চাহিদা তৈরির জন্য জনগণের এক ক্ষুদ্র অংশের আয় বৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া। এই পদক্ষেপগুলিই হচ্ছে উদারবাদী অর্থনীতির এমন এক বিকাশের মডেল যেখানে বিকাশের হার বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করা হয় অসাম্য ও আমজনতার দুর্দশা বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং এই মডেলের প্রবক্তাদের আপ্তবাক্য “বিকাশের লাভ চুঁইয়ে চুঁইয়ে নীচের দিকে যাবে ও আমজনতা লাভবান হবে” – কে অসাড় প্রমাণিত করে।
অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ

               সিঙ্গুরে গাড়ি কারখানার নির্মাণের প্রস্তাবে টাটা’র ১০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে সরকারের ৮৫০ কোটি টাকা ভর্তুকীর প্রস্তাব ছিল। সিঙ্গুরের কৃষকদের প্রতিরোধ এবং গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আরও লোভনীয় প্রস্তাবের ফলে টাটা গুজরাতে সেই কারখানা নির্মাণ করে। এভাবে ‘সেজ’ কিংবা ‘সেজ’-বহির্ভুত ক্ষেত্রে বৃহৎ শিল্পপতিদের বিশাল অংকের ভর্তুকী দিয়ে চলেছে সরকার, অথচ অন্যদিকে আমজনতার ব্যবহার্য নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর ভর্তুকী তুলে দেওয়ার সরকারী পদক্ষেপকে সরকার, দল ও নেতৃত্বের সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অবশ্য জনগণ তাদেরকে যেদিন কড়া জবাব দেবে সেদিন তার সম্মুখীন হওয়ার জন্য তাদের বুকের পাটার সত্যিকার পরীক্ষা হবে। এই প্রক্রিয়ার ফলে শতকোটীপতিদের সংখ্যা ২০০৪ সালে ৯ থেকে ৪০-এ বৃদ্ধি ঘটে যা জাপান, ফ্রান্স, ইতালি, চিনের তূলনায় অনেক বেশি এবং আমেরিকার ঠিক নীচে। উপরের এক ক্ষুদ্র অংশের বর্ধিত বেতন ও অন্যান্য সুযোগের মাধ্যমে আয়বৃদ্ধি ঘটানো হচ্ছে এবং অন্যদিকে প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনের দৈনিক ক্রয়ক্ষমতা ২০ টাকারও কম। ফলে এই আমজনতা বাজারে বিশেষ কোন চাহিদা বৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে না। যেহেতু যোগান ও উৎপাদন চাহিদার উপর ভিত্তি করে স্থির হয়, তাই উচ্চআয়ের ক্রেতাদের ব্যয় করার ক্ষমতা এবং ‘ইনকাম ইলাস্টিসিটি অব ডিমাণ্ডের’ নিয়ম মেনে আয় বৃদ্ধির চাইতেও বেশি চাহিদা বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে তাদের প্রয়োজনীয় বিলাসী সামগ্রীর যোগান ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিক্রির জন্য মল, সুপার-মার্কেট ইত্যাদি করা হচ্ছে এবং আমজনতার প্রয়োজনীয় নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উৎপাদনে কোন রকমফের হচ্ছে না। উচ্চআয়ের লোকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম যখন কমছে, তখন নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটছে। এধরণের চূড়ান্ত অসাম্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কোম্পানীর দখলদারির জন্য ভিটেমাটিছাড়া হওয়ার খাড়া ঝুলছে নিপীড়িত বঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলোর উপর। এটা এরকম এক পরিস্থিতি যা দরিদ্র-পিছিয়েপড়াদের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশিক স্থিতি গোটা দেশের উপনিবেশিক স্থিতিকে আরও শক্তিশালী করছে। জনগণ এরকম পরিস্থিতির বিরুদ্ধে এখানে ওখানে স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ করছে, যদিও কোন বিকল্প সংগঠিত শক্তির দেখা এখনও মেলেনি। এই বিদ্রোহ মোকাবিলায় এবং নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার তাড়নায় নয়া-উদারবাদী বিশ্বায়নে বিশ্বাসী সরকার ও বিভিন্ন দল অনেক কদম এগিয়ে গিয়েও মাঝে মাঝে এককদম পিছিয়ে গিয়ে গণস্বার্থে পদক্ষেপ নেয়। এনরেগা জারি করা সেরকমই একটি পদক্ষেপ।
এনরেগার আন্দোলন ও নয়া-উদারবাদের বিকল্প

                  এনরেগার মাধ্যমে যদি গ্রামীণ জনগণ ও শহরের বস্তি ও ঝুপরিবাসীদের সবাইর রোজগারের বন্দোবস্ত করতে এবং তাতে যে গণ-চাহিদা তৈরি হবে তার উপযোগী শিল্পোৎপাদনের নীতি গ্রহণ করতে সরকারকে যদি বাধ্য করা যায়, তাহলে নয়া-উদারবাদী ফ্রেমওয়ার্ক থেকে পিছু হটার জন্য লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়। এক হিসাবে দেখা গেছে যে এনরেগার বিধান অনুযায়ী সবাইকে কাজের গ্যারান্টী প্রদান করতে হলে এনরেগার জন্য মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ৬-৭% বাজেট বরাদ্দ করতে হয়, বর্তমানে যা মাত্র জিডিপি’র ১%। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ও আইএমএফ-এর নির্দেশানুসারে জারি করা ফিনান্স রেগুলেশন ও বাজেট ম্যানেজম্যান্ট আইন, ২০০৩ বলবৎ থাকা অবস্থায় এই বৃদ্ধি সম্ভব নয়, কারণ এই আইন অনুসারে আর্থিক ঘাটতি কমানোর জন্য নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর ভর্তূকী ও আমজনতার জন্য ব্যয় কর্তন করতে হয়। উপরন্তু এই সংস্থাদ্বয় ইতিমধ্যেই এনরেগার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সুতরাং এনরেগার পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত এই আইন বাতিলের এবং তার মাধ্যমে বিশ্বপুঁজির নিয়ন্ত্রিত সংস্থাদ্বয়ের নির্দেশ বাতিলের দাবিকে সামিল করে নিতে হবে। এভাবে আমজনতার আয়বৃদ্ধির বিভিন্ন সংগ্রামে উচ্চআয়ের ক্রেতাদের উপযোগী উৎপাদন-নীতির বদলে আমজনতার চাহিদার উপযোগী উৎপাদন নীতি গ্রহণ করার দাবিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এই নীতি স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারীকরণের বিপরীতে সরকারী উদ্যোগকে প্রসারিত করেই করতে হবে। এই দাবিগুলির তখনই বাস্তবায়ন সম্ভব যখন নীতি-নির্ধারণে আমজনতার মতামত ও অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে গণ-ক্ষমতায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ঢেলে সাজানো হবে। ৭৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কায়েম হলেও সংবিধানের ২৪৩ধারার বিধান অনুযায়ী পঞ্চায়েতের আর্থিক স্বশাসন প্রদান না করে পঞ্চায়েতকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য শাসনের গ্রামীণ দালাল তৈরির কারখানা বানিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামসংসদ বা গ্রামসভা ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং কেন্দ্র-রাজ্যকে ফেডারেল কাঠামোয় পুনর্গঠন করে জনগণের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য রাষ্ট্রকে যথেষ্ট নমনীয় করা যায়। এনরেগার রূপায়ণের সংগ্রামের মধ্য থেকে নয়া-উদারবাদ বিরোধী এক বিকল্প কর্মসূচীর ভিত্তিতে এক নতুন আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। এনরেগার বিধানের পূর্ণাঙ্গ ও বর্ধিত রূপায়ণের দাবিতে আন্দোলন এভাবেই নয়া-উদারবাদ বিরোধী এক ব্যাপক কর্মসূচীর অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে এবং এভাবে এই ব্যাপক কর্মসূচীর অঙ্গ হয়ে উঠার উপর এনরেগা আন্দোলনের সফলতাও নির্ভরশীল।                                     

শান্তির বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , , ,

     

    অরূপা মহাজন (অরুণোদয়ের জন্য)
     শান্তির আদর্শ

            “শান্তির দ্বীপ” কথাটি বহুচর্চিত। এই রাজনৈতিক উপমাটি চালু করেছিলেন ভারতীয় শাসকশ্রেণির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এরমধ্যে বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক গরিমা খুঁজে পান অনেকেই। শান্তির এই পরিমণ্ডলকে বরাকের গৌরব হিসেবে দেখাতে পিছিয়ে থাকেন না বামপন্থী বলে পরিচিত একাংশ বুদ্ধিজীবীরাও। এই শান্তি আসলে কীসের ইঙ্গিত বহন করে তা আমরা তলিয়ে দেখতে চাই না। আমরা কায়মনোবাক্যে কামনা করি এই শান্তি সম্প্রীতি যেন অটুট থাকে আবহমান কাল ধরে। শাসক শ্রেণির প্রতিভূর ছুঁড়ে দেওয়া এই উপমাটি কী এমনই নিরীহ যে নিরীহ ছা-পোষা সাধারণ বরাকবাসীকে একেই আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে হবে?
মতাদর্শগত কাঠামো

           আমাদের উপনিবেশিক অতীত আমাদের সভ্য হয়ে ওঠার বাসনাকে চাগিয়ে দিয়ে সভ্য করে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত উপনিবেশিক প্রভুদের গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলে। এই অধিপত্যবাদী কাঠামোই পুরুষত্বের বিপরীতে গুণহীন ক্লীবত্বের মতাদর্শ গড়ে তুলে নারীত্বকে পুরুষত্বের অধীনে সামিল করে নেয়। অর্থাৎ এমন একটি মতাদর্শগত কাঠামো যেখানে আধিপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকেই কোন গুণকে বিচার করার বাতাবরণ সৃষ্টি হয় – বিপরীতটি হয় হারিয়ে যায় নতুবা বিপদজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। শাসক শ্রেনির জারি করা “শান্তির দ্বীপ” উপমাটি এরকমই এক আধিপত্যবাদী মতাদর্শ থেকে উদ্ভূত যেখানে শোষিতের অশান্ত হয়ে ওঠার ধারণাকে নাকচ করে তাদেরকেও সহাবস্থানের এই অমোঘ শান্তির কাঠামোয় সামিল করে নেয়। বৌদ্ধিক চর্চার দৌড় এই কাঠামোর গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় শোষিতের দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তির প্রশ্নটিকে দেখতে চায় না বা দেখার সাহস করে না। সাহস করে না এই কারণে যে এই মতাদর্শগত কাঠামোটি এই বোদ্ধাদেরও সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেয়।
শান্তির মাহাত্ম্য

         তাহলে এই “শান্তির দ্বীপ” কথাটির মাহাত্মটা কী?  এর সোজাসাপটা মাহাত্ম এই যে বরাক উপত্যকায় শাসক শ্রেণির দল এবং দিল্লি-দিসপুরের হুকুম তামিল করা রাজনৈতিক নেতৃত্বরা কখনওই কিন্তু তেমন কোন বাধার সম্মুখীন হয়নি, তাদের অপ্রতিরোধ্য স্রোতে সামান্য প্রতিস্রোতের হাওয়া লেগেছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ‘জরুরি অবস্থা বিরোধী’ আন্দোলনের পরবর্তী ১৯৭৭-এর নির্বাচনে। কেন এই অপ্রতিরোধ্য গতি তা বিচার করার জন্য বরাকের বুদ্ধিজীবীদের যুক্তির কাঠামো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা দেখে নিতে হবে। সাম্প্রতিক ভারতে যে দু’টি বিষয়ের উপর সবচাইতে বেশি চর্চা হয়েছে ও হচ্ছে তা হলো – জাতপাত ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এই দু’টি বিষয়ের উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করলেই আমরা “শান্তির দ্বীপ” প্রসঙ্গের উপর অনেকখানি আলোকপাত করতে পারব।
 যুক্তির কাঠামো

             বরাক উপত্যকার বুদ্ধিজীবীরা বিশেষ করে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কিছুদিন আগে পর্যন্তও পশ্চিমবাংলাকে দেখিয়ে বড়াই করে বলতেন ‘বাঙালির মধ্যে জাতপাত নেই’। কীভাবে তাঁরা বুঝলেন যে সেখানে জাতপাতের বিভাজন নেই – কারণ বিহারে ভূমিহার-রাজপুত-ঠাকুর-দলিত-যাদব-কুর্মী ইত্যাদির মধ্যে সহিংস সংঘাত লেগেই থাকে, কিন্তু পশ্চিমবাংলায় অপার শান্তি। সেখানে যেমন রণবীর সেনা রয়েছে – তেমনি রয়েছে দলিত সেনা – পশ্চিমবাংলায় তো তেমন নেই। তাঁরা সম্পত্তি-সম্পর্ক বিচার করার দিকে না গিয়ে বহিরঙ্গের শান্তি-অশান্তির রূপ দিয়ে জাতপাতের বিচার করলেন। বিহারে উচ্চবর্ণের জমির মালিক সরাসরি জমির সাথে যুক্ত থেকে সস্তায় শ্রম শোষণকে সুনিশ্চিত করতে শারীরিক নিগ্রহ চালাত। দলিতরা তার প্রতিরোধ করলে কিংবা যে কোন শ্রেণি সংগ্রাম সেখানে শুরু থেকেই হিংসাত্মক রূপ নেয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই সম্পত্তি সম্পর্কের খানিকটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে – কিন্তু তা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। পশ্চিমবাংলায় বর্ণহিন্দু আধিপত্য যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্যেই বিরাজ করছিল তা এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। সাচার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পর “পশ্চিমবাংলায় সাম্প্রদায়িকতা নেই” এই দাবিও যে ঠুনকো তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া গরীব মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার হিংসাত্মক রূপ পরিগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ বর্ণহিন্দু আধিপত্য যেখানে শান্তির বাতাবরণেই সবচাইতে সুরক্ষিত থাকে সেখানে অশান্তি ডেকে আনা আধিপত্যের পায়ে কুড়োল মারার সামিল। বরাক উপত্যকার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের চিত্রটি বাদ দিলে শান্তির এই একই যুক্তি ক্রিয়াশীল থাকে।
রাজনীতি ও মতাদর্শ সম্পর্ক

             উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক পরস্পর সম্পৃক্ত। সম্পত্তির সরাসরি মালিকানা তা      কৃষি-অকৃষি যে কোন উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিংবা সরকারী দপ্তর ও প্রশাসনের মাধ্যমে সম্পত্তির অমলাতান্ত্রিক মালিকানার হিসেবে সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু আধিপত্য প্রশ্নাতীত। নীতি নির্ধারণে বর্ণহিন্দুদের সংখ্যাধিক্য তাদের আধিপত্যকে বজায় রেখেছে এবং নিম্নবর্ণীয়দের কায়িক শ্রমশক্তি শোষণের উপযোগী পিরামিডাকৃতি শ্রম বিভাজনের কাঠামোর চূড়ায় তাদের অবস্থান রয়েছে। অনুরূপভাবে মতাদর্শ – মূল্যবোধ গড়ে তোলার সকল প্রতিষ্ঠানও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোকায়ত প্রাক-ব্রাহ্মণ্যবাদী বস্তুবাদী মতাদর্শ ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বর্ণবাদী মতাদর্শের অধীনস্ত হয়ে পড়েছে। মতাদর্শের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে ‘পারস্যে’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “...যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়োজাহাজ – অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর। বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক উড়ো জাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে। সেখান থেকে যাদের উপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য এই যে, ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’। কঠ উপনিষদ থেকে গীতায় উদ্ধৃতি – ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ – হত্যা করলেও তাকে সত্যি হত্যা করা যায় না। কাকে? পরমাত্মাকে। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, “ যে-দার্শনিক তত্ত্বের উড়োজাহাজ অর্জুনের কৃপাকাতর অনেক ধ্যানধারণার এমনই ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে গেলো যেখানে বাস্তব পৃথিবীর সত্তা অস্পষ্ট, তার অস্তিত্বের দাবি বিলয়ের মহাশূন্যে বিলীন – ধ্যানধারণার সেই উর্ধ্বলোকই দার্শনিকদের ভাষায় ভাববাদ ...”। সেখান থেকে মারেই বা কে, মরেই বা কে! কঠোর শ্রমই বা কে করে – তার শ্রমশক্তিকে শোষণই বা কে করে। এই দর্শনের বিশ্বাসেই এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অজ্ঞানের ঘোর, পাওনা-গণ্ডা নিয়ে সোরগোল পাকানো – এসবই নেহাত বেকুবের লক্ষণ। এই বিশ্বাসই দ্বিজ-শূদ্রে বিভক্ত এই সমাজ আদর্শের ভিত। কোশাম্বী ভারতীয় বর্ণকে বর্ণণা করেছেন অনগ্রসর পণ্য উৎপাদনী ব্যবস্থায় একধরণের শ্রেণি হিসাবে, সামাজিক সচেতনতা নির্মাণে এমন এক ধর্মীয় পদ্ধতি হিসাবে যেখানে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত থেকে বঞ্চিত হয়”। এই ন্যূনতম বলপ্রয়োগের পরিস্থিতির নামই শান্তি। এই শান্তির কাঠামোর বাইরে যারা রইল – তারাই অ-হিন্দু। মতাদর্শগত স্তরে এই অ-হিন্দুদের উপর বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে, কারণ বর্ণবাদী মতাদর্শ দিয়ে তাদের আচ্ছন্ন করে রাখা যায় না, তারা তাদের পাওনা-গণ্ডার দাবি করেই ফেলে এবং তাতেই তাদের উপর নেমে আসে আক্রমণের খড়গ। এই আক্রমণকে বৈধতা দিতেই নানাধরনের অপপ্রচার চালানো হয়। হিন্দুত্ববাদীরা যেমন নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদকে খণ্ডন করে এক সমসত্তাবিশিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি কায়েম করতে চায়, ঠিক তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে মুসলমানদেরও এধরনের এক সমসত্তা হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু বাস্তবে অন্যান্য দেশের মত ভারতীয় ইসলামও নাগরিক ও সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদ রয়েছে, যদিও ধর্ম হিসেবে ইসলাম সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও শ্রম-বিভাজনকে বৈধতা দেওয়ার বিপরীতে সাম্যের কথা বলে। এই সমসত্তার ধারণা ও আধিপত্যের কাঠামো যতক্ষণ অটুট থাকে ততক্ষণ শান্তির উপমাটি খুব যুৎসইভাবে রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই কাঠামোতে ইতিমধ্যে বেশ জোরালো আঘাত পড়েছে। সাচার ও রঙ্গনাথ কমিশনের সুপারিশের পর মুসলিমরাও সংরক্ষণের দাবির সপক্ষে সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে। হিন্দুত্ববাদীরা তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠছে। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ হিন্দুত্ববাদীদের সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে আরও একধাপ অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে শান্তির বারি বর্ষণ করার প্রতি যে বেশি আকর্ষণ বোধ করছেন তা প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসকামী ও দুর্ভাগ্যজনক।
অর্থনীতিবাদের গাড্ডা

              তবে এই আচরণ যে প্রতিক্রিয়ার সাথে আপসের ও আধিপত্যবাদের পক্ষে যায় তা তাদের উপলব্ধিতেই আসে না, বরঞ্চ তাঁরা ভাবেন যে শান্তির জন্য এই কামনা সমাজের কল্যাণেই। তাঁরা মনে করেন যে অর্থনৈতিক অধিকার ও উন্নয়নের দাবিতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা সম্ভব। আজকের উদার আর্থিক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক অসাম্য যখন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষের মনের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, তখন এই ধরনের ধারণা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরও জাঁকিয়ে বসছে। জনগোষ্ঠীগত সমতার প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে গরীব-মেহনতি মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই যে দানা বাঁধতে পারে না – এই সত্যকে তাঁরা দেখতে পান না। অর্থনৈতিক প্রশ্নকে অনৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করার জন্যই এই বিভ্রান্তি ঘটে – মার্কস যাকে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবাদ হিসেবে। রাজনীতিকে অর্থনীতি থেকে আলাদা করা বা অর্থনীতিকে ইতিহাসের আলোকে বিচার না করাই আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিংবা তার নব্য রূপ উদারবাদী অর্থনীতির গ্রহণযোগ্যতার মুল চাবিকাঠি। বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ অর্থনীতিবাদের এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। ফলে তাঁরাও জনগোষ্ঠীগত অধিকারের প্রশ্নকে আড়ালে রেখে তথাকথিত শান্তি বজায় রাখার পক্ষে ওকালতি করেন, কারণ তাঁরা মনে করেন যে শান্তির পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠে এবং তা দিয়ে হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করা যেতে পারে। তাদের এই ধারণা যে ভ্রান্ত বরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই প্রমাণ করল।

সাম্প্রতিককালে বরাক উপত্যকার উন্নয়নের প্রশ্নে, অর্থনৈতিক-নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠছে। হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদ তাতে শঙ্কিত হয়ে উঠাই স্বাভাবিক ছিল। তাদের এই শঙ্কা দূর করার এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল হাই-প্রোফাইল ভিন-ধর্মী বিয়ের ঘটনা। প্রগতিশীল শক্তি তাদের এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে খাট করে দেখল এবং এর সক্রিয় প্রতিরোধের বদলে নিষ্ক্রিয় শান্তির পক্ষে ওকালতি করল। তাদের এই অবস্থান এই বোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সম্প্রদায়গত ও শ্রেণিগত যে ঐক্য গরে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের সক্রিয় বিরোধিতা এই ঐক্যকে বিনষ্ট করতে পারে। তাদের এই ভূমিকা যে সুবিধাবাদের নামান্তর ও বাস্তববোধ বর্জিত তা আবারও প্রমাণ হলো। আর্থিক সংকটের ফলে নড়বড়ে আধিপত্যবাদী কাঠামোয় কোণঠাসা হতে থাকা হিন্দুত্ববাদী শক্তি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠল। আমরা যদি অতিসত্বর এই অর্থনীতিবাদী মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে পরাজয়ের গ্লানি আমাদেরকে আরও বহুদিন বহন করে বেড়াতে হবে।
সংকট, বিশৃঙ্খলা ও পরিবর্তন

বিশ্ব-পুঁজিবাদী সংকট ও ভারতীয় উদারবাদী অর্থনীতির কুফলের পরিণতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে এবং তা হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের কাঠামোকেও দুর্বল করে তুলছে। কিন্তু এই অর্থনীতিতে লাভবান একাংশ উচ্চশ্রেণি-বর্ণের লোকের সমর্থনে ও ক্রমবর্ধমান বেকার যুবকদের বিপথে পরিচালিত করে এক আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ যে গণ-সমাজের উপর জাঁকিয়ে বসতে পারে না তা হলফ করে বলা যায় না। আধিপত্যকামী শক্তির শান্তির শ্রুতলিপিকে মান্যতা দিয়ে এই আগ্রাসনকে মোকাবিলা করা যায় না, বিশেষ করে আজকের পরিস্থিতিতে যখন মধ্যপন্থার জায়গা ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সুতরাং আমাদেরকে এর মোকাবিলা করতে হবে এক সম্পূর্ণ র‍্যাডিক্যাল অবস্থান থেকে।

            ‘রুমি কাণ্ডে’ যে এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আবার তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন এই শ্লীল-অশ্লীল, ঔচিত্য-অনৌচিত্য, হিংসা-ভালবাসা, অন্তর্ঘাত-সম্মুখ সমর ইত্যাদি মহাকাব্যিক গুণে ভরপুর এই কুনাট্য। শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা যে আগামী দিনে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটবে তা হলফ করে বলা যায়। অর্থনৈতিক সংকট থেকে এই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কীভাবে উদ্ভব ঘটে তা সাধারণ পাঠকের জন্য একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক। রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব হয় মতাদর্শগতভাবে মোহাচ্ছন্ন ও শাসকীয় অর্থনৈতিক নীতিতে পরিচালিত শাসিতের প্রচ্ছন্ন সম্মতির বলে অথবা শাসিতরা যদি অসম্মতি প্রকাশ করে তাহলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্মতি আদায় করে। প্রথম অবস্থা বজায় রাখার জন্য আর্থ-সামাজিক অসাম্যকে একটি সহ্যের সীমার মধ্যে ধরে রাখা প্রয়োজন, প্রয়োজন শ্রমশক্তি লুণ্ঠনের এক নমনীয় কাঠামো। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট অসাম্যের তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সামাজিক ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে। আর্থিক সংকটে জর্জরিত মানুষ বিদ্রোহ করতে চাইলে – শাসক শ্রেণি দিশেহারা হয়ে পড়ে। এই দিশেহারা অবস্থাতেই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই যে কোন অবস্থার দ্বিমুখী গতি সম্ভব। তাই এক্ষেত্রেও এই বিশৃঙ্খলার         নব্য-উপনিবেশিক পরিণতি হিন্দুত্ববাদী–আক্রমণাত্মক-শৃঙ্খলার দিকে যাওয়ার প্রবণতা যেমনি থাকবে – ঠিক তেমনি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গড়ার প্রবণতাও থাকবে। এই দ্বিতীয় পথকে উন্মোচিত করার জন্যই হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে ও সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার দাবিতে তীব্র ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের লড়াই গড়ে তুলতে হবে। ‘সাম্প্রদায়িকতা শান্তি বিনষ্ট করে – তাই বর্জনীয়’ – এধরনের প্রচারের মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা যাবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও বাস্তবকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে শান্তির বারি ছিটিয়ে দেওয়ার একধরনের ক্লীব অবস্থান নিয়েছেন।
র‍্যাডিক্যাল অবস্থান

            রাজনৈতিক ক্ষেত্রে র‍্যাডিক্যাল অবস্থান সুনিশ্চিত হবে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সমান-অধিকার, সমান-মর্যাদার নীতির ভিত্তিতে জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণের দাবিতে জোরদার অন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সংখ্যালঘু তোষণের হিন্দুত্ববাদী প্রচারকে জোরালোভাবে খণ্ডন করে সংখ্যালঘুদের সংরক্ষণের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষিক-সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস পাঠের বিপরীতে দলিত-নিপীড়িতের সংগ্রামের ইতিহাসকে উর্ধে তুলে ধরতে হবে। নমঃশূদ্রদের আন্দোলন – কৈবর্ত বিদ্রোহ – সিধু-কানুহ, বিরসা মুণ্ডার বিদ্রোহ – নাথ পন্থের ইতিহাস – তেভাগা – নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস এবং সর্বোপরি বরাক-বাংলাদেশের ভাষা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসকে সামনে এনে পরিচিতির সংগ্রামকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অর্থনৈতিক অধিকার – গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শোষিতের ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে যুগপৎভাবে পরিচালিত না করে অসাম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার দিকে এককদমও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বরাকের বুদ্ধিজীবীরা যত তাড়াতাড়ি এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করতে পারেন ততই মঙ্গল। শোষণ – বঞ্চনা – অনুন্নয়নের কাঠামো বজায় রেখে তথাকথিত ‘শান্তির দ্বীপের’ চেয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভবিষ্যতের প্রকৃত শান্তির আশায় অশান্ত বরাক হাজারো গুণ কাম্য।

এনরেগা আন্দোলন ও ‘টিম আন্নার’ গ্রামসসভা আন্দোলনে সাফল্য আসলে ভারতীয় সমাজের ‘বিপ্লবী অগ্রগতিতে’ পরিণত হবে

Posted by স্বাভিমান Labels: , ,





(অরুণোদয়ের জন্য)
অরূপা মহাজন

            ভারত সরকারের অনুসৃত নিও লিবারেলঅর্থনীতির ফলে ভারতীয় সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভৌগোলিক-জনগোষ্ঠীগত ও শ্রেণিগত অসাম্য, দরিদ্রতা ও রোজগারহীনতা তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিও লিবারেল গ্রোথ মডেলের ট্রিকল ডাউন এফেক্টেরঅসারতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে । সমাজের মুষ্ঠিমেয় ধনকুবেরদের ধনভাণ্ডার ক্রমাগত স্ফীত হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের গরিষ্ঠাংশ দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে গ্রোথরেট বৃদ্ধির সুফল স্বাভাবিকভাবে বাজারের নিয়মে চুইয়ে চুইয়ে পৌঁছে যাওয়ার দাবির অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণ করে দিয়ে এক ক্ষুদ্র সচ্ছ্ল অংশের মধ্যেই আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। বাজারচালিত উন্নয়নের পথ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরম্পরাগত রুজি-রোজগারের মাধ্যমকে কেড়ে নিচ্ছে, সেজের মত ব্যবস্থাগুলির ফলে কৃষকদেরকে হারাতে হচ্ছে তাদের চাষের জমি, বিকৃত উন্নয়নের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি গ্রাম-সমাজকে করছে বাস্তুভিটেহারা, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে রুজি-রোজগারের সন্ধানে শহরমুখী প্রব্রজনের ফলে শহরে বিস্তৃত ঘেটোগুলিগড়ে উঠছে, উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে পরিবেশ দূষণের চরম বিপদ ডেকে আনছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ অহিংস থেকে সহিংস বা তার উল্টো কিংবা এই দুটোর মিশ্রণের বিভিন্ন রূপ, মাত্রা ও ব্যাপ্তির বিদ্রোহ যে গড়ে তুলবে তাই স্বাভাবিক। সচেতন কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহগুলিই আমাদের নীতি-নির্ধারকদের তাদের অনুসৃত জনবিরোধী পথে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়, বাধ্য করে থমকে দাঁড়াতে কিংবা সাময়িকভাবে পিছু হঠতে।
           সুতরাং রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আসীন আমাদের নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করার দুই পরস্পর বিপরীতমুখী ও বৈরী সম্পর্কে আবদ্ধ শক্তি প্রতিনিয়ত ক্রিয়াশীল রয়েছে। আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, গ্লোবাল ওলিগোপলিজ বা বৃহৎ পুঁজির মালিক ও কর্পোরেট দুনিয়ার প্রভাবে সরকার নিও লিবারেলপলিসি অনুসরণ করে। আবার এই পলিসির কুপ্রভাবের বিরুদ্ধে গণ-বিদ্রোহ যে পরিমাণে নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে সেই পরিমাণে পিছু হঠতে বাধ্য করে। যেহেতু বিদ্রোহ বা গণ-মতামতকে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করতে হয়, তাই দুর্বল সামাজিক শ্রেণির মানুষের জন্য দুটি উপায় খোলা থাকে। হয় আন্দোলনকে এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া যাতে আন্দোলনের প্রভাবাধীন অঞ্চলে রাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় রাখা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে, নাহয় এই আন্দোলনের পক্ষে প্রভাবশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণিরএক গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে মতামত তৈরি করা যাতে প্রশাসনযন্ত্রের অন্দরমহলে বিষয়বস্তুর পক্ষে লবি গড়ে ওঠে। দুটি নির্বাচনের অন্তর্বর্তী সময়ে সরকারের নীতিগ্রহণ ও তার প্রয়োগে জনগণের মতামত প্রতিফলিত করার অন্য কোন পথ খোলা থাকে না । তথাপিও নির্বাচনে পরিত্যাজ্য হওয়ার ভয়েও নীতি-নির্ধারকরা নিও-লিবারেল অর্থনীতির পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করতে অনেক সময়েই বাধ্য হয়। সুতরাং নিও-লিবারেল অর্থনীতির গ্রোথ-নির্ভর উন্নয়ন মডেলের ক্ষেত্রে সবচাইতে উপযুক্ত পরিবেশ হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে খর্ব করা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারী নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে দিয়ে বেসরকারীকরণ করা। উল্টোদিকে সামাজিক উন্নয়নের মডেলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা, প্রাইভেট বা পাবলিক-প্রাইভেট মডেলের পরিবর্তে স্টেট (পাবলিক)-সোসাল মডেল তৈরি করা। নিও-লিবারেলাইজেশন বা গ্লোবেলাইজেশনের বিরুদ্ধে সামাজিক উন্নয়নের জন্য সংগ্রামের একটি মুখ্য দিক হচ্ছে গণতন্ত্রকে প্রসারিত করার সংগ্রাম। গণতন্ত্রকে প্রসারিত করার সংগ্রাম আরও একটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদের বিকল্প হিসেবে এতাবৎ গড়ে ওঠা সমাজবাদী প্রকল্পগুলির বিপর্যয়ের একটি অন্যতম মুখ্য দিক হচ্ছে এই যে, পুঁজির প্রসারণের পর্যায়ে বুর্জোয়া গণতন্ত্র যে অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করতে পেরেছে, সমাজবাদী প্রকল্পে এই গণতন্ত্রকে তো অতিক্রম করতে পারেইনি, বরঞ্চ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকেও অনেকক্ষেত্রে খর্ব করেছে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে তো কলোনিয়াল লিগেসি বুর্জোয়া গণতন্ত্রকেও খর্ব করে রেখেছে । সুতরাং গ্লোবেলাইজেশন বা পুঁজিবাদের বিকল্প নির্মাণ তো ভারতবর্ষের মত দেশে শুরু হবে নয়া-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বিকল্প নির্মাণের যাত্রা শ্রমিক শ্রেণির পার্টি ও ব্যবস্থায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রসারিত করার সংগ্রামকে এড়িয়ে গিয়ে করা যাবে না । শ্রমিক শ্রেণির পার্টি যদি শ্রেণির সাথে জৈব-সম্পর্কহীন ভ্যানগার্ডহয়, তাহলে পার্টির উপর শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ থাকে না, পার্টি হয়ে ওঠে সর্বময় এবং এই যুক্তির অনুশীলনে ধীরে ধীরে পার্টি-কর্তা বা কর্তাগোষ্ঠী হয়ে ওঠেন পার্টির নিয়ন্ত্রক। পার্টি যে রাষ্ট্র পরিচালন করে সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো যদি থাকে জনগণের নিয়ন্ত্রণ থেকে অনেক দূরে তাহলে পার্টি-রাষ্ট্রের এক জগদ্দল পাথর জনগণের ঘাড়ে চেপে বসে। এধরণের গণতন্ত্রহীন কাঠামো যেখানে জনগণ শুধু শাসিত হওয়ার ভাগিদার, শাসনের অন্দরমহল তাদের কাছে রহস্যময় জগত, সেরকম এক কাঠামো বিশ্ব-পুঁজিবাদী আগ্রাসন স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করতে পারে না, পুঁজিবাদের বিকল্প গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। গণতান্ত্রিক পরিবেশ শ্রমিক শ্রেণিকে সক্রিয় হতে, পুঁজিবাদী শোষণের নিয়মকে চিনতে এবং বিকল্প অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহী হতে সাহায্য করে। তাই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শোষণ-শাসন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আন্না টিমেরগ্রামসংসদ বা গ্রামসভাকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে গণ-ক্ষমতায়নের জন্য তৃণমূল গণতান্ত্রিক-প্রতিষ্ঠানের বৈধতা প্রদানের আন্দোলনের আহ্বান এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আইনী বৈধতা থেকেও যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই যে দাবি আদায়ের গণ-সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে জনগণ তাকে ব্যবহার করার পন্থা-পদ্ধতিও শিখতে আরম্ভ করবে।


           এই গ্রামসভার সাথে আরেকটি বিষয়কে যদি যুক্ত করা যায় তাহলে নিও লিবারেলিজমেরবিরুদ্ধে সংগ্রামের এক বৃহৎ ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবলভাবে দেখা দেবে। বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকটের দুটি প্রধান লক্ষণ হচ্ছে () ব্যাপক মাত্রায় বেকারের সংখ্যা ও সামাজিক অসাম্য বৃদ্ধি অর্থাৎ বাজারে উৎপাদিত শিল্প-পণ্যের চাহিদা পড়ে যাওয়া ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেওয়া () প্রান্তিক দেশগুলির শ্রম-সম্পদ লুণ্ঠনের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে একের পর এক গণবিক্ষোভ দেখা দেওয়া। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক ও আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে রাষ্ট্র সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি করে শ্রম-নিয়োগের দায়িত্ব নেয়। এরকম এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতেই পশ্চিমের দেশে শ্রমের অধিকার বৈধতা পেয়েছিলো । ভারতবর্ষে এই অধিকারের দাবিতে আন্দোলনের ফলে এবং বর্তমান আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে এনরেগা আইনের মাধ্যমে শ্রমের অধিকার সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে । রাষ্ট্রের এই ভূমিকায় পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির ক্ষেত্রে উল্টোদিক থেকে এক প্রতিকূল পরিস্থিতিরও জন্ম দেয়। অধিক মাত্রায় শ্রমিক নিয়োগের ফলে শ্রমিক শ্রেণির দরকষাকষির ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটে এবং শ্রমিক শ্রেণি মজুরি বৃদ্ধি, ইউনিয়ন অধিকার ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নেমে পড়তে আরম্ভ করে। অর্থাৎ দুই বিপরীতমুখী গতির সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে । একদিকে বাজারের চাহিদার জন্য শ্রম নিয়োগ এবং অন্যদিকে দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বাজারের নিয়ম ও অতি-মুনাফার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির চ্যালেঞ্জ।
            ২০০৫ সালে যে এনরেগা আইন জারি হয় যা বর্তমানে গোটা ভারতবর্ষে চালু রয়েছে, সেই আইনের অনেক দুর্বলতা থাকা সত্বেও এর সুফল ফলতে শুরু করেছে। এই আইনের অনেকগুলি দুর্বলতার মধ্যে একটি হচ্ছে ৬ নং অনুচ্ছেদের ২৭ নং ধারা যেখানে বলা হয়েছে যে দুর্নীতির অভিযোগে কোন এলাকার স্কিম কেন্দ্র বাতিল করে দিতে পারে । এই আইন স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্তভাবে প্রয়োগ করতে চূড়ান্ত গণ-সচেতনতা ও গণ-সক্রিয়তার প্রয়োজন পড়ে। কারণ স্থানীয় প্রশাসনযন্ত্র এই আইন প্রয়োগে উৎসাহী থাকে না এবং এর সঠিক রূপায়ণ এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত খুঁজতে থাকে । আইনের এই ধারাকে রূপায়ণকারী সংস্থাগুলি জনগণকে ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে । অভিযোগ করলে যদি প্রকল্পই বাতিল হয়ে যায় তাহলে শ্রমিকরা অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় মনে করবে । প্রতিজন ব্যক্তির জন্য নয়, পারিবারিকভাবে ১০০ দিনের কাজের বিধান আরেকটি এরকম দুর্বলতার দিক। আইনের এরকম অনেক দুর্বলতা এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা ও বাধা থাকা সত্বেও,বিভিন্ন রাজ্যের তথ্য বলছে যে যেসব এলাকায় ইতিমধ্যে এনরেগার কাজের যথেষ্ট পরিমাণে অগ্রগতি ঘটেছে তার প্রভাবে পার্শ্ববর্তী এলাকার অন্যান্য ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে শিল্পবহুল অঞ্চলে শ্রমিকদের প্রব্রজন অসংগঠিত ও কায়িক শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বহু এলাকায় এধরনের প্রব্রজন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে । কম মজুরির কাজের ক্ষেত্র ছেড়ে এনরেগার কাজে চলে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে, কম মজুরির কাজের ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধি করার চাপ তৈরি হয়। আসামের চা-মালিকরাও যে এই আইনের প্রয়োগে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল তার অন্তর্নিহিত কারণও এর মধ্যেই রয়েছে। এনএসএসও- এর ২০০৯-১০ সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৩-৯৪ তূলনায় শ্রম-শক্তির অংশ গ্রহণের হার (বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে) ও কর্মী নিয়োগের পরিমাণ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কমেছে এবং তারজন্য জবলেস্ গ্রোথ অন্যতম একটি কারণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু স্থানিক বিচারে এনরেগার প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় একথা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় যে এই আইন রূপায়ণের আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পারলে সামগ্রিক গুণগত পরিবর্তন পাওয়া যাবে। এই আইনের তিনটি মুখ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে () কাজ চাইলে কাজ দিতে সরকার বাধ্য অন্যথায় বেকার ভাতা দিতে হবে। () কাজের মাধ্যমে সামাজিক এসেট তৈরি করতে হবে যাতে গ্রামোন্নয়ন হয়। () প্রকল্প নির্ধার, তদারকি ও হিসাব-পরীক্ষার ক্ষেত্রে গ্রামসভাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান। সুতরাং এই আইনকে সুষ্ঠুভাবে রূপায়ণ করার, এনরেগার কাজে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, শহরাঞ্চলেও একে প্রসারিত করা ও বেকার ভাতা দিতে রাজ্য সরকারগুলিকে বাধ্য করার জন্য যদি এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তাহলে আর্থিক-সামাজিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং শ্রমিক আন্দোলন বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।


        শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা দখল ও রাষ্ট্রের প্রকৃত বৈপব্লিক রূপান্তরের পূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেকগুলি বৈপব্লিক অগ্রগতির মধ্য দিয়ে যায়। এনরেগা আন্দোলন ও টিম আন্নারগ্রামসংসদের আন্দোলনে সাফল্য আসলে, আমার মতে ভারতীয় সমাজে এধরনের এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি ঘটবে। 
                              ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~`
লেখাটা চাইলে আপনি এখানেও পড়তে পারেন, আপনার শুধু ফ্লাসপ্লেয়ার নামিয়ে নেবার দরকার পড়তে পারে। 

এনরেগা আন্দোলন ও ‘টিম আন্নার’ গ্রামসসভা আন্দোলনে সাফল্য আসলে ভারতীয় সমাজের ‘বিপ্লবী অগ্রগতিতে’ প...

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন