Showing posts with label বাংলা নাটক. Show all posts
Showing posts with label বাংলা নাটক. Show all posts

নাটক ও দর্শক-শ্রোতার আন্তঃক্রিয়া

Posted by স্বাভিমান Labels: , , ,

নাটকের শিল্পগুণ

      
     ত ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারী কোরাসের উদ্যোগে বরাক-উপত্যকাব্যাপী নাট্য-পরিক্রমা হয়ে গেল এবং এই পরিক্রমার মূল্যায়ন করার জন্য কোরাস ১৬ ফেব্রুয়ারী মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সংস্থার হলে এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার আয়োজন করে। সেই আলোচনায় অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন হয়। শহরের নাট্যচর্চার সাথে ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষের সংযোগ স্থাপনের প্রশ্নটি এই আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উঠে আসে। চিত্রভানু ভৌমিকের উত্থাপিত প্রশ্নের মধ্যেও এই কেন্দ্রীয় বিষয়টিই নিহিত ছিল। তিনি প্রশ্ন তুলেন যে শ্রমজীবী মানুষের সাথে সংযোগ গড়ে তোলার প্রশ্নকে প্রাধাণ্য দিতে গিয়ে নাটকের শিল্পগুণ কী বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না? এই গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রশ্নের সাথে একটা পরিপূরক প্রশ্ন যদি উত্থাপন করা যায় তাহলে এই আশঙ্কার সমাধানের জন্য একটা নতুন নাট্যরূপ নির্ধারণের পথের সন্ধানের দিকে আমরা এক কদম এগিয়ে যেতে পারি। শ্রমজীবী মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন ছাড়া শিল্পগুণ সম্পন্ন নতুন নাটক গড়ে তোলা কী সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের মধ্যেই এই নিবন্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং এই সন্ধান করা হয়েছে কোরাসের নাট্য পরিক্রমার মূল্যায়নের মধ্যে।

আধুনিক ও তাৎক্ষনিক নাটক

  
  
        কোরাসের উদ্যোগে এবারের নাট্য-পরিক্রমা অনুষ্ঠিত হয় প্রায় দু’দশক পর। দু’দশক আগে যখন পরিক্রমা হয়েছিল তৃতীয় ধারার নাট্য-আন্দোলনের প্রাণশক্তি এতোটা ক্ষয়ে যায়নি। বরাক উপত্যকার বিভিন্ন শহরে বেশকয়েকটি তৃতীয় ধারার নাট্যগোষ্ঠী তখন সক্রিয় ছিল। মূলত ঐ নাট্যগোষ্ঠীগুলোর উপর নির্ভর করেই বরাক-উপত্যকা পরিক্রমা সংগঠিত করা হয়। এই নাট্যপরিক্রমার উদ্দেশ্যই ছিল বৃহত্তর দর্শক তথা শ্রমজীবী মানুষের সামনে নাটক উপস্থাপন করা। মূলত নাট্যব্যাক্তিত্ত্ব বাদল সরকারের লেখা আধুনিক নাটক গ্রামসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া হত এই পরিক্রমায়। এই আধুনিক নাটকগুলির সাথে কিছু তাৎক্ষণিক নাটকও তৈরি হয়ে যেত যার রসদ সংগ্রহ হত     দর্শক-শ্রোতাদের সাথে আলাপচারিতায়। কিন্তু তাত্ত্বিক সূত্রায়ণ এই ছিল যে তাৎক্ষণিক নাটকগুলো করা হচ্ছে প্রয়োজনের তাগিদে, আর শিল্পগুণ সম্পন্ন আধুনিক নাটক দেখে দর্শক আসলে অনেক কিছু শিখছে এবং এখানেই আমাদের শৈল্পিক পারদর্শিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সংযোগস্থল। এই ভাবনা ও নাটকের বিষয় ও উপস্থাপনার মধ্যে কী কোন গলদ রয়েছে? এব্যাপারটা খানিকটা বিশদভাবে বিচার করে দেখা যাক।

          আমরা যখন ধরে নেই যে আমাদের আধুনিক নাটক দেখে ওরা কিছু শিখছে, তখন একপক্ষ দাতা এবং অন্যপক্ষ গ্রহীতা, সেখানে দেওয়া–নেওয়া বা আদান-প্রাদানের কোন সুযোগ নেই, ওদের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি উৎফুল্ল হচ্ছি কারণ এটা আমাদের কৃতিত্ব। ওদের কাছ থেকে রসদ নিয়ে যখন তাৎক্ষণিক নাটক করছি, তখনও কিন্তু নির্মাণটা আমাদের – উপস্থাপনাও আমাদের। তাহলে এক্ষেত্রে আমরা যাকে সংযোগ বলে ধরে নিচ্ছি, তা কী সত্যিকারের সংযোগ? এটা যদি সত্যিকারের সংযোগ না হয়, তাহলে কী ধরে নিতে হবে যে কোন ধরণের সর্বজনীন আধুনিক নাটক সম্ভব নয়? এবার এই দুটি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা যাক।

জনসংযোগ ও সর্বজনীন নাটক

           আমরা নাট্যশিল্পের মাধ্যমে কিছু একটা বললাম, ওরা শুনল। এই শোনার প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কে যে রসায়ন সৃষ্টি হল তাতে পরবর্তীতে কিছু একটা করল। কিন্তু তাতে নতুন কিছু তৈরি হল না, পুতুলটিতে যতটুকু দম দেওয়া হল সে অনুযায়ী পুতুলটি নাচল – তারপর আবার স্থানু অবস্থায় ফিরে এল। গুরু-শিক্ষককের সম্পর্কে যা হয় – সেটা তার থেকে খানিকটা বেশি – এখানে তোতাপাখিটা নিজের কথাও কিছু বলে। যারা শুনল তাদের খানিকটা লাভ ছাড়া ক্ষতি হলো না, কিন্তু যারা শোনাল তাদের কিন্তু মস্ত ক্ষতি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। কেউ হয়ত সংযোগ স্থাপনের আত্মগরিমায় ভুগল, কেউ এই সংযোগস্থাপনের কর্মটিই আসলে এক মায়া এভাবে ভাবতে আরম্ভ করল। তাই যদি হয় – তাহলে তো বলতে হয় সর্বজনীন নাটক বলে কিছু হওয়ার নয়। এই বিষয়টি একটু জটিল। সামগ্রীকভাবে একটি স্থান-কালের সীমার অধীনে অনেকগুলি স্থান-কাল রয়েছে। সামগ্রীক       স্থান-কালের বিষয়বস্তু নিয়ে নাটক যা স্বাভাবিকভাবেই সর্বজনীন হওয়া উচিত, তাকে যখন নির্দিষ্ট আলাদা আলাদা স্থান-কালের মধ্যে উপস্থাপন করা হয় তখন তাকে সেই স্থান-কালের নির্দিষ্টতার সাথে যুক্ত হতে হয় এবং এই যুক্ত হওয়া তখনই সম্ভব হয়ে উঠে যখন বিষয় ও আঙ্গিক উভয়ই এই নির্দিষ্টতার সাথে খাপ খাওয়ার জন্য পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ শ্রেণিবিভক্ত সমাজে উৎপাদন সম্পর্কের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নাটকের সর্বজনীনতার কোন চূড়ান্ত রূপ নেই, এটা এক ভাঙা-গড়ার নিরন্তর প্রক্রিয়া। এজন্যই কোরাসের শহরের শিল্পীদের অভিনিত বাদল সরকারের নাটক ‘বাসি খবর’ যখন বড়সিঙা চা-বাগানের ‘লেড়কা দফার’ ছেলে-মেয়েরা অভিনয় করে তখন বিষয়-আঙ্গিকের দিক দিয়ে সেটা নতুন মাত্রা পায়। এই নতুন মাত্রা দেওয়ার জন্য আমাদের সেই সমাজকে জানার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যে প্রক্রিয়ায় ওরাও কথা বলে। সেখান থেকে শুরু হয় সংযোগ স্থাপনের এক তাত্ত্বিক নির্মাণ, যেখানে উভয় পক্ষ কথা বলছে। কী হতে পারে সেই তত্ত্ব যেখানে শিল্পগুণ হারানোর কোন ভয় থাকবে না, অথচ দর্শকের সাথে সংযোগ স্থাপনের সমস্যাও মিটবে।     
 

নাটকের আলাপচারিতা

          এই যে কোরাসের উদ্যোগে গোল-টেবিল বৈঠক হল, সেই ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতায় কিছু লোক নিজেদের মধ্যে যুক্তির মাধ্যমে মত বিনিময় করল, আবার নাটকের আঙিনায় আসা কিছু নতুন ছেলে-মেয়েরা শুধুই শুনল। অর্থাৎ মতের আদান-প্রদান ও আবার শুধুই শিক্ষা প্রদান – সংযোগ স্থাপনের দুটি রূপই যুগপৎভাবে সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল। কিন্তু এতে প্রধান ধারাটি ছিল যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে মতের আদান-প্রদান যার নিষ্পত্তিতে একটা নতুন মতের সৃষ্টি হতে পারে যা আগে বিদ্যমান ছিল না। নাটক সেরকমই এক আলাপচারিতা যেখানে ভাবের বিনিময় হয় এক নির্দিষ্ট শিল্পরূপে অংশগ্রহণকারীদের সাথে বাকী দর্শক-শ্রোতাদের। নাটকের আলাপচারিতায় অংশগ্রহণকারী দুটি ক্যাটাগরি ভিন্ন ভিন্ন। একদল নাটক করছে ও আরেকদল দেখছে ও শুনছে। এই দুই ক্যাটাগরির মধ্যে কায়িক দূরত্ব একই সমতলের উপস্থাপিত নাটকের তূলনায় মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে বেশি। যেহেতু কায়িক ও মানসিক দূরত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাই সমতলে উপস্থাপিত নাটকে উভয় ক্যাটাগরির মধ্যে সংযোগ-স্থাপনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু তাতে মৌলিক প্রশ্নটির নিষ্পত্তি হয় না। অর্থাৎ নাটক কী একপক্ষেরই শেখা ও শেখানোর প্রধান শিল্পমাধ্যম হয়ে থাকবে, না তা হয়ে উঠবে উভয় পক্ষের মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা? যদিও বাস্তবে এই দুটি দিক সর্বক্ষেত্রেই বিরাজমান, কিন্তু প্রশ্ন হলো কোনটি হবে প্রধান দিক? উভয় ক্ষেত্রেই নাটকের বিষয় ও রূপকে এক রাখা কী সম্ভব? শ্রমজীবী মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের উপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে নাটকের শিল্পগুণের সাথে কী সমঝোতা করতে হবে? এখানেই এসে যায় উৎপাদন সম্পর্ক বা আর্থিক-সামাজিক সম্পর্কগুলি ও তার পরিবর্তনের ধারাকে বোঝা, জানা ও অনুধাবনের বিষয়টি। এই রাজনৈতিক প্রয়াসকে দূরে সরিয়ে রেখে এই শিল্পমাধ্যম বিকশিত হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এটা কেন জরুরি ও কীভাবে তার অগ্রগতি সম্ভব সংক্ষেপে এর বিচার করা যাক এবং কোরাসের এবারের পরিক্রমা থেকে তার একটা উত্তর সন্ধান করা যাক।

শ্রমজীবীদের সাথে সংযোগ ও নতুন নাটক

             যখন কোন বিখ্যাত লোকের লেখা নাটক অভিনীত হয়, তখন সেই নাটকের জন্ম-ইতিহাস চর্চা করার কোন সুযোগ থাকে না, সুযোগ থাকে না লেখক যে পরিবর্তনশীল উৎপাদন-সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত ভাবের প্রকাশ এই নাটকে করেছেন তাকে বিচার করার। বর্তমান উৎপাদন-সম্পর্কের বাস্তব পরিস্তিতিতে নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান আমাদের যে মনোজগত তৈরি করেছে তা দিয়েই আমরা এর প্রাসঙ্গিকতা বিচার করি এবং যখন নাটকটি উপস্থাপিত হয় তখন কিন্তু লিখিত নাটকটি আর অবিকল থাকে না, আমাদের বাস্তবতা তাকে কোন না কোনভাবে প্রভাবিত করে। নাটকটি করার মধ্য দিয়ে আমাদের বাস্তব অবস্থানের সাথে সেই লিখিত পুরোনো নাটকের বিষয়ের এক যোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং যখন নাটকটি মঞ্চস্থ হয় তখন এই যোগসূত্রটিই ক্রিয়াশীল থাকে আমাদের    সম-অবস্থানের দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে নাটকের বোধকে ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু আমাদের অবস্থান বর্তমান বাস্তবের এক অতি-সীমাবদ্ধ অংশমাত্র এবং তাই বৃহত্তর দর্শক-শ্রোতাদের সাথে সংযোগস্থাপনে এই শিল্প-পরিবেশন অপারগ। সুতরাং সংযোগ স্থাপনের প্রশ্নটি বর্তমান পরিবর্তনশীল সামাজিক সম্পর্ককে জানা ও বোঝার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সমস্যা হলো সেই পরিবর্তনশীল সম্পর্ক ও তার থেকে উদ্ভূত ভাবকে আমরা ততটুকুই জানতে পারি যতটা সে নিজেকে উন্মোচিত করে। সেই উন্মোচন ততটাই ঘটে যতটা শ্রমজীবী মানুষ তার বর্তমান অমানবিক    আর্থ-সামাজিক সম্পর্ককে ভাঙতে সচেষ্ট হয়। এই ভাঙার প্রচেষ্টায় শ্রমজীবী মানুষ তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরাকেও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। ফলে কায়িক যোগসূত্র ঘটালে অর্থাৎ শহরের নাটক তাদের কাছে নিয়ে গেলে বিষয় ও আঙ্গিকের নতুন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, কারণ এখানে উভয়পক্ষই কথা বলতে শুরু করছে। সেই সংগ্রামের সাথে যুক্ত হওয়াটা নাটকের জন্যই প্রয়োজনীয়, নাটক ও দর্শক-শ্রোতাদের সংযোগস্থাপন ও নতুন সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয়। বাস্তব যতক্ষণ সেভাবে উন্মোচিত না হয়, ততক্ষণ এই সংযোগ স্থাপনের প্রশ্নটি নিজে শেখা ও শেখানোর উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধ উদ্যোগও কম গুরুত্ত্বপূর্ণ নয় – কিন্তু একেই একমাত্র লক্ষ্য করে নিলেই বিপদ।

নাটকের রাজনীতি

    

পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয়তা নাটকের এক বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত এবং তাই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই বিষয়-আঙিকের এই নমনীয় কাঠামোর ভাঙাগড়ার যাত্রা অব্যাহত রাখা সম্ভব এবং সেটাই নাটকের রাজনীতি। নাটকের শিল্পগুণ সৃষ্টির পরিকল্পনা যেহেতু কোন শূন্যগর্ভ থেকে আমাদের মস্তিষ্ক ও মনোজগতে চালিত হয় না, সেটা তৈরি হয় পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা বিষয়-আঙিকের বিভিন্ন বাস্তবতার মধ্য থেকে এবং নাট্যকারের সুচারু হস্তক্ষেপে, তাই ভাল নাটকের জন্য এই রাজনীতি চর্চা অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ। কোরাসের ১৯৯১-৯২-এর পরিক্রমা ছিল সাম্প্রদায়িকতার কড়াল গ্রাস থেকে মানুষকে বের করে আনার এক শিক্ষামূলক অভিযান যে অভিযানের সুফল উপর থেকে অনুধাবন করা যায় না, সমাজের অভ্যন্তর থেকে দেখতে হয়। এবারের পরিক্রমা ছিল ভেতরের ও বাইরের দুই বিপরীতমুখী চেতনা-প্রবাহের এক আন্তঃক্রিয়া যেখানে উভয়পক্ষ কথা বলছে। শ্রমজীবী মানুষরা নিজেরা নাটক করছে, আধুনিক বয়ানকে তার ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে নিচ্ছে এবং সেসব অঞ্চলেই সমস্ত সামাজিক-রাজনৈতিক আপত্তিকে অস্বীকার করে মানুষ ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে যেখানে শ্রমজীবীদের প্রচলিত আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের গণ্ডী অতিক্রম করার কোন না কোন প্রয়াস রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অঙ্কুরোদ্গমনই এবারের পরিক্রমার বিশেষত্ব যার উত্তোরোত্তর বিকাশ নাট্যধারায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।       

নাট্য আন্দোলন – একটি ভাবনা /সংযোজন ঃ বিশ্ব নাট্য দিবস উপলক্ষ্যে কোরাস নাট্য সংস্থা অয়োজিত আড্ডা থেকে ফিরে এসে।

Posted by স্বাভিমান Labels: ,



                                                                      ।। অরূপ বৈশ্য।।
                            ( বিশ্বনাট্যদিবস উপলক্ষে লেখা প্রবন্ধটি অরুণোদয়ে বেরুবে)




রাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক বিশেষ স্থান জুড়ে রয়েছে নাট্যচর্চা। সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বরাকের নাট্যচর্চারও রয়েছে জোয়ারভাটা। বরাকের এই নাট্যচর্চা ও নাট্য আন্দোলনের বিষয় নিয়ে গভীর কোন বিশ্লেষণ বা পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস রচনার কাজে কোন নাট্যকর্মী, গবেষক বা সমালোচক ব্রতী রয়েছেন বলে আমার জানা নেই। সমালোচকদের একাংশ বরাকের নাট্যচর্চাকে পশ্চিমবাংলা বিশেষ করে কলকাতার অনুকরণ হিসেবে অভিহিত করে কোন ধরনের বিশ্লেষণে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করে দেন। অথচ কলকাতার নাট্যচর্চা বরাকের মত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদে শহরের নাট্যচর্চাকেও যে প্রভাবিত করতে পেরেছে তারও একটা কার্যকারণ সম্পর্ক বিচার করে দেখা চাই। যারা অতীতের নাট্যমোদীদের নাটক দেখার উৎসাহকে অনুকরণের স্পৃহা বলে খারিজ করে দেন এবং যারা যা  কিছু বিদ্যমানতা নিয়েই বেঁচেবর্তে থাকতে চান তাদের দুদলই ভাবনার যান্ত্রিকতায় আবদ্ধ হয়ে যান। সব ঠিক আছেবা সবই ফাঁকি’ – এই দুয়ের টানাপোড়েনে নাট্য আন্দোলনেরনতুন রূপরেখা তৈরির প্রয়াস অনায়াসেই দিকভ্রষ্ট হয়। একথা অনস্বীকার্য যে বরাকের বিভিন্ন পর্যায়ের নাট্য আন্দোলনের জোয়ার মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি ও কলকাতার নাট্যচর্চার প্রভাবে প্রভাবিত থেকেছে। প্রাণের সাথে প্রাণ জুড়িয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পারেনি অর্থাৎ সময়ের তাগিদে যে নাটক ও নাট্যদর্শক তৈরি হয়েছিল তাকে বরাকের লোকজীবনের স্পর্শে রাঙাতে পারেনি। তথাপি ভাঁটার অন্তিম লগ্নেও বরাকের নাট্যজননীরপ্রাণশক্তি একেবারে ফুরিয়ে যায়নি, যদিও নাট্যচর্চার এই প্রাণশক্তিকে ভেন্টিলেটারেরউপর নির্ভর করে ধরে রাখতে হচ্ছে। কোন এক অলৌকিককারণে এই নাট্যজননীভেন্টিলেটার থেকে বেরিয়ে এসে আবারও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে নতূন প্রাণের জন্ম দিতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। সাধারণের কাছে এই  অলৌকিককারণটিই আসলে পরিস্থিতি, সময় ও উদ্যমের কার্যকারণগত সম্পর্ক।

                   সামগ্রিকভাবে নাট্যচর্চা এই নিবন্ধের বিষয় নয়, বরঞ্চ নাট্যচর্চা কখন নাট্য আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং সমাজে আলোড়ণ সৃষ্টি করতে পেরেছে সেটাই এখানে আলোচ্য বিষয়। আঠারো শতিকার ইউরোপের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রাণবন্ত নাট্যচর্চা থেকে উদ্ভূত রঙ্গমঞ্চকে এদেশে আমদানি করে বাংলাতে গিরিশচন্দ্র ঘোষের মত বাবুরা যে বিষয়গুলিকে সংযোজিত করে পেশাদারি নাটকের জন্ম দিয়েছিলেন তা কলোনিয়্যাল প্রভুদের উপযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যখন সামাজিক পরিস্থিতি নিস্তরঙ্গ ও স্থিতিশীল, যখন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকদের আধিপত্য প্রশ্নাতীত, সেই সময়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মননশীল নাটক দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত করা কি সম্ভব? নাটক এমন এক শিল্পমাধ্যম যা নাট্য আন্দোলনরূপেই প্রতিভাত হয় এবং সমাজ পরিবর্তনের সহায়ক হয়ে উঠে। কারণ নাটক থেকে সমাজ ও সমাজ থেকে নাটক এই দ্বিবিধ ও বিপরীতমুখী প্রত্যক্ষ ও নিরন্তর যাত্রার সংঘাতময় পরিস্থিতিই এই শিল্পকর্মের মূল রহস্য। ফলে নাটক প্রায়শই সমাজবদ্ধ ও সেই সুবাদে রাজনীতির সামাজিকীকরণের সাথে যুক্ত হয়ে রাজনীতিবদ্ধ। অবশ্য নিস্তরঙ্গ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতেও অন্তঃসলিলা ব্যতিক্রমী সৃষ্টিশীল নাট্যচর্চার কাজ নিরন্তর চলতে পারে এক সর্বব্যাপী নাট্য আন্দোলনের অপেক্ষায় সলতে পাকানোর কাজ হিসেবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ১৯২৯  সালে আমেরিকায় গ্রুপ থিয়েটারের জন্ম হওয়া এক ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। ১৯২৯ সাল শেয়ার বাজারের পতনের মাধ্যমে বিশ্ব পুঁজিবাদের মহামন্দার ঘোষণা। শ্রমিক ছাঁটাই, তীব্র বেকারত্ব, ক্ষুধা-অনাহার ও লাগামহীন সামাজিক অসাম্যের ফলে চারিদিকে সামাজিক অস্থিরতা। সংকটে জেরবার অর্থব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি। একদিকে উত্থানোন্মুখ জার্মান ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের জন্য অক্ষশক্তি-মিত্রশক্তির শিবির বিভাজনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে ন্যায়-সাম্য-মুক্তির লক্ষ্যে ও ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব-সহমর্মিতার ভিত্তিতে দেশ-জাতি-জনগণের সংগ্রামের প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতির মুখে দাঁড়িয়েই আমেরিকাতে গ্রুপ থিয়েটার এবং ভারতবর্ষে গণনাট্য আন্দোলনের বিস্তার। সাম্রাজ্যবাদী অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তির দুই কেন্দ্র জার্মানী ও আমেরিকা এবং দেশ-জাতি-জনগণের সংগ্রামের মতাদর্শগত কেন্দ্র সবচাইতে প্রাগ্রসর ও প্রতিবাদমুখর আমেরিকান শ্রমিকশ্রেণি। এরজন্যই ব্ল্যাক থিয়েটারথেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন ধরনের প্রাণবন্ত থিয়েটার প্রেক্টিসতখন গড়ে উঠে আমেরিকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। বাংলা তথা ভারতবর্ষের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই নাট্য আন্দোলনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়, যখন বাংলায় মঞ্চস্থ হয় বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ননাটক। বিয়াল্লিশের মন্বন্তরের করুণ পরিণতির উপর ভিত্তি করে রচিত এই নাটক মধ্যবিত্ত মননে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং শুরু হয় লোকসমাজের মধ্যে গিয়ে নাট্য  আন্দোলন গড়ে তোলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নাট্যকর্মীদের যাত্রা এই নাট্য আন্দোলনে লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করার কিছুটা প্রচেষ্টা থাকলেও এবং বাংলার লোকসমাজের ও সমসাময়িক বিষয়বস্তু উঠে আসলেও আঙ্গিকের দিক থেকে গ্রুপ থিয়েটারেরআঙ্গিক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি এবং এই নাট্য আন্দোলন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ভদ্দরলোক দৃষ্টিভঙ্গিরনিয়ন্ত্রনাধীন রয়ে যায় ইতিমধ্যে যুদ্ধ পরবর্তীতে শ্রম-পুঁজির নিউ ডিলেরমাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতার বাতাবরণ আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণির নতুন সমাজ গড়ার লড়াকু মতাদর্শগত কোরপুঁজির সাথে সমঝোতার মাধ্যমে তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে এবং এর প্রভাব বাংলার গণনাট্য আন্দোলনেও পড়তে শুরু করেছে। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ারে বাংলার নাট্য আন্দোলন যে নতুন সমাজ গড়ার এজেণ্ডাকে সামনে রেখেছিল তা ধীরে ধীরে সংস্কারমুখী প্রবণতায় পর্যবসিত হতে শুরু করে। যে সব কৃষক বিদ্রোহ স্বাধীনতার নামে ঔপনিবেশিক আপস মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল এবং যার উপর ভিত্তি করে বামপন্থা টিঁকে থাকতে পারত সেগুলির মধ্যপন্থী সমাধান বামপন্থায় ভাঁটার টানের জন্ম দিল। আসলে শ্রমিক-কৃষকের প্রশ্নটি যে আমাদের মত দেশে ভাষা-জাতি-বর্ণের প্রশ্নের অধীন হয়ে রয়েছে এই সত্যটি বামপন্থীরা অনুধাবন করতে পারেননি। ফলে তথাকথিত স্বাধীনতা অর্জেনের মাধ্যমে শ্রমিক-কৃষক সমস্যার যে আপাত সমাধান বেরিয়ে আসল তাতে বামপন্থীরা আর নিজেদের বাম অস্তিত্ব বজায় রাখার জনভিত্তি খুঁজে পেলেন না। গণনাট্য কর্মীদের উপর যখন নেমে এল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তখন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কম্যুনিস্ট পার্টির সর্বভারতীয় নেতা পি সি যোশী সংস্কারমুখী কর্মসূচীর ভিত্তিতে নগরকেন্দ্রিক নাট্য চর্চার উপর গুরুত্ব দিলেন। প্রাণবন্ত-প্রাণচঞ্চল নাট্যচর্চার এই পর্যায়ে ভদ্দরলোকদেরগণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন নাট্য ধারা যাকে সমাজ বহন করবে এরকম কোন নাট্য ধারার জন্ম দিতে ব্যর্থ হলো। এই ব্যর্থতা জন্ম দিল নাট্যচিন্তার বিভিন্ন মতবাদনিয়ে অবান্তর সব বিতর্ক আসলে এইসব বিতর্কের আড়ালে ছিল পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুখ লুকোনোর প্রচেষ্টা। ৩০-৪০ দশকের অস্থির পরিস্থিতি যে নাট্য আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল সেখানে নাট্যচিন্তার বিভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসীরা একযোগে নাট্যচর্চায় ব্রতী হতে বাধ্য হয়েছিলেন, কম্যুনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রনের প্রশ্নটি সেখানে ছিল অবান্তর। সমাজ পরিবর্তনের ভাসাভাসা এক মতাদর্শগত আবহের নিয়ন্ত্রনের প্রশ্নকে বিফলতার কারণ হিসেবে যারা বিবেচনা করেন তারা স্নানের জলের সাথে বাচ্চাটিকেছুঁড়ে ফেলার দুঃসাহস করেন। বরাক উপত্যকায় ঐ পর্যায়ে কীধরনের নাট্যচর্চা হয়েছিল তার কোনো লিখিত বয়ান আমাদের কাছে নেই এবং এব্যাপারে আমার কোন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও থাকার কথা নয়। কিন্তু একথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে বাঙালি অধ্যুষিত বরাকভূমি পূববাংলারই সম্প্রসারিত অংশ এবং নবান্ননাটকের পর পূববাংলাতেই আইপিটিএর শাখা গড়ে ওঠে এবং তেভাগা-নানকার কৃষক বিদ্রোহ বর্তমান বরাক উপত্যকার বিস্তৃত অঞ্চলকেও প্রভাবিত করে।

                
              পরবর্তীতে দেশভাগজনিত ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের আবেগ, কৃষক বিদ্রোহ-শ্রমিক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি সমস্ত সমসাময়িক বিষয় উঠে আসে পঞ্চাশের দশকের পশ্চিমবাংলার নাট্যচর্চায়ও। কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারের অঙ্গনে এই নাট্যচর্চাও বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারল না। ফলে দিশাহীন বিতর্কে নিমজ্জিত হয়ে গ্রুপ থিয়েটারকে পর্যবসিত হতে হল বাজারশক্তির ক্রীড়নকে। কিন্তু ১৯৬৫ সালের কল্লোল নাটক জনমণ্ডলীর জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন লাভে সফল হলো। ঐ একই সময়ে ১৯৬৭ সালে শতাব্দী নাট্যগোষ্ঠী গঠন করে বাদল সরকার তৃতীয় নাট্য ধারার প্রয়োগে সচেষ্ট হন। তৃতীয় বিশ্বের বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আঙ্গিক হাজির করার এক প্রয়াস নেন বাদল সরকার। গণআন্দোলনের পাশাপাশি নাট্য-আন্দোলনকেও যাতে সমাজ বহন করে নিয়ে যেতে পারে, সামাজিক আন্দোলনগুলিই যাতে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে নিজেরাই নাটক তৈরি করতে এবং সংগ্রামরত জনগণের সামনে পেশ করতে পারে অর্থাৎ নবউত্থিত জনসমাজের সাথে যাতে নাট্যচর্চা এক জৈবিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে  সেই চিন্তা থেকেই সম্ভবত বাদল সরকার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের এক সুসমঞ্জস্য কাঠামো তৈরি করার চেষ্টায় ব্রতী হন। কিন্তু এই ধারাও শুরুতে যে আশার আলো জাগিয়েছিল তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। তথাপি গ্রামসমাজের বিষয়বস্তুকে শহরে তুলে এনে নগরকেন্দ্রিক এবং শিক্ষিত-ভদ্দরলোক নিয়ন্ত্রিত নাট্য ধারার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বাদল সরকারের এই প্রয়াস নাটকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে এক অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু ষাটের দশকের টালমাটাল সময়ের টানে নাটকের যে জনপ্রিয়তা দেখা দিয়েছিল তাকে জনসমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।

                 ষাটের দশকের শেষে বিশ্ব-পুঁজিবাদ আবারও এক গভীর সংকটের পর্যায়ে প্রবেশ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তুহারাদের পুনর্বাসনের অধিকারখাদ্য আন্দোলন ইত্যাদিকে হাতিয়ার করে বামপন্থীদের গ্রহণযোগ্যতার গ্রাফ পুনরায় উর্ধমুখী হতে শুরু করে। ইমার্জেন্সি বিরোধী জেপির আন্দোলনের আবহে বামপন্থী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যে বেঞ্চমার্ক অতিক্রম করে তার হদিস মেলে ১৯৭৭-এর নির্বাচনী ফলাফলে। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে এবং একইসাথে এও অভিযোগ উঠতে শুরু করে যে কম্যুনিস্ট পার্টি নাট্য আন্দোলনকে নির্বাচনে ব্যবহার করেছে এবং এনিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করে। এই অভিযোগ সত্যকিন্তু এহ বাহ্য। নির্বাচনী লড়াই যদি সামাজিক লড়াইয়ের একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়তাহলে নাটকের মত শিল্পমাধ্যম তাতে ব্যবহৃত হলে কোন মহাভারত  অশুদ্ধ হয় না। যা নাট্য আন্দোলনকে অশুদ্ধ করে ও শুকিয়ে যেতে সাহায্য করে তা হল নির্বাচনপূর্ব সমাজপরিবর্তনের এজেণ্ডাকে নির্বাচন পরবর্তীতে ক্রমশঃ পরিহার করার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নাট্য আন্দোলনকে যা ব্যাহত করে তা হলো বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে একে অঙ্গীভূত করার পরিবর্তে মধ্যবিত্ত বাবু-ভদ্দরলোকদের’ প্রাণহীন গণ্ডিতে তাকে আবদ্ধ করা। এই পর্যায়ের নাট্য আন্দোলনে আবারও ৩০-৪০ দশকের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ১৯৮০-এর উদার-অর্থনীতির অন্তর্গত কাঠামোগত পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে বামফ্রন্টের বাম-রাজনীতি ১৯৮২ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে অঙ্গীভূত হয়ে যায়ঠিক সেভাবেই নাট্য-আন্দোলনও বাজারের চাহিদার বাইরে বেরিয়ে প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করতে অপারগ হয়। এই দুই পর্যায়ই বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের এক জীবন্ত ঐক্যের ভিত্তিতে নতুন কোন স্বনিয়ন্ত্রিত ও সমাজ-নিয়ন্ত্রিত নাট্যধারার সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়।

                 ৩০-৪০ দশকের পূববাংলার এবং ষাটের দশকের পশ্চিমবাংলার নাট্যচিন্তার এই সীমাবদ্ধতার প্রভাবে বরাক উপত্যকার নাট্যচর্চাও প্রভাবিত ছিল। এই প্রভাব এখনও দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান থাকায়ই বরাকের নাট্যচর্চা ভেন্টিলেটারের’ উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। কিন্তু আন্দোলনের ক্ষেত্রে এতগুলো ব্যর্থতা বরাকের মত প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাট্যকর্মীদের সামনে এক নতূন সুযোগও এনে দিয়েছেবিশেষ করে এই কারণে যে আমাদের রয়েছে পূববাংলার মত ভাষিক অধিকারের প্রশ্নে জীবন্ত ও নিরন্তর গণকার্যকলাপের এক ঐতিহ্য সুতরাং এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বৌদ্ধিক চর্চা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রাণবন্ত প্রচেষ্টা যদি বরাকের নাট্যকর্মীরা অব্যাহত রাখে তাহলে এক নতুন সৃষ্টি উন্মাদনায় আবারও জেগে উঠার সুযোগ আমাদের সামনে আসছে। নাট্যচর্চার প্রাণশক্তি সঞ্চার করার জন্য বিষয়ীগত পরিস্থিতি আবারও অনুকূল হয়ে উঠছে। বিশ্বায়নের সম্মোহনী মায়া এখন মুহ্যমান – উদার আর্থিক নীতি আর্থ-রাজনৈতিক সংকটকে প্রতিনিয়ত ঘনীভূত করে চলেছে। পুনরায় শ্রমিকশ্রেণির জাগরণ আমেরিকার অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের রূপে উইসকনসিন প্রদেশে ব্যাপক ও জঙ্গি শ্রমিক ধর্মঘট সংগঠিত করে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের মত কৃষক প্রধান ও জাতি-বর্ণে বিভাজিত দেশের জনগণের লড়াইয়ের জন্য সবচাইতে প্রাগ্রসর শ্রমিক শেণির মতাদর্শগত কোর আবার জেগে উঠছে। বিশ্বব্যাপী এই শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারও আবার পরিলক্ষিত হচ্ছে। বেকারত্বঅসাম্যদারিদ্রঅনাহার-বুভুক্ষা আমাদের মত দেশের ঘুমন্ত শ্রমিক-কৃষককেও জাগিয়ে তুলছেআড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে জেগে ওঠা সিংহের গর্জনধ্বনি প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে। নবউত্থিত সামাজিক আন্দোলন সমস্ত ধরনের নিস্পেষণ যন্ত্রকে ভেঙে দিয়ে নতুন সমাজ গড়ার আকাঙ্খাকে প্রকাশ করছে। এই নতুনের সন্ধান করাটাই আজকের সময়ের জরুরি কাজ যা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যতটুকু প্রযোজ্যঠিক তেমনি প্রযোজ্য নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। বরাকের নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে নতুনের এই সন্ধান শুরু হতে পারে অতীত অভিজ্ঞতার সার সংকলনবরাকের জনসমাজকে জানা ও বোঝার প্রচেষ্টাগণ-আবেগকে বুঝতে ইতিহাসের চর্চা ও সর্বোপরি নতুন বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এই কাজ করার জন্য বরাকে এক শক্তিশালী নাট্যকর্মীদলের উপস্থিতি রয়েছেপ্রয়োজন শুধু সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির।

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন