RSS Feed

উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের কিছু দিক (তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া)

Posted by স্বাভিমান

কোনো বড়মাপের সাম্প্রদায়িক ঘটনা বা দাঙ্গা ছাড়াই উত্তপ্রদেশে এবার বিজেপি’র  উত্থান ঘটল, ১৯৯২-এর বাবরি মসজিদের ঘটনা পরবর্তী নির্বাচন থেকেও এবারে বিজেপি’র নির্বাচনী সাফল্য অনেক বেশি। কী ছিল বিজেপি’র স্ট্র্যাটেজি? বিজেপি অতি দক্ষতার সাথে সুকৌশলে দু’টি পরস্পর বিরোধী বিষয়ের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। বড়মাপের বা ম্যাক্রোস্তরের দু’টি বিষয়ের তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অর্থাৎ মাইক্রো স্তরে যে বহিঃপ্রকাশ তাকেই মিশ্রিত করে পেশ করে জনগণকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে। এই দু’টি বিষয়ের একটি হলো নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি বিরোধী ক্ষোভ ও অন্যটি সাম্প্রদায়িকতা। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় উন্নয়ণের বিষয় যেমন সড়ক-বিদ্যুৎ-পানীয় জল-সামাজিক সুরক্ষা-রোজগারের সুরক্ষা-মজুরি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদিকে হাতিয়ার করা, অন্যদিকে কবরস্থান-শ্মশান, ঈদ-পূজা, রোমিও বাহিনী ইত্যাদি বয়ানের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতাকে মানুষের একেবারে দৈনন্দিন জীবনে নামিয়ে আনা। এই দু’টি বয়ানকে মানুষের কল্পনাশক্তির কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য উপরে ও তৃণমূলে উভয়স্তরে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়েছিল সংঘ পরিবার। উল্টোদিকে বিরোধী শক্তি পুরোনো ধাঁচের সমীকরণ, বড় মাপের উন্নয়ণ (বৃহৎ সড়ক ও ব্রিজ প্রকল্প ইত্যাদি) ও কৃষক ইস্যু নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হয়। যখন হাজার হাজার ইউপি-বাসী দিনমজুর মহারাষ্ট্র থেকে ভোট দিতে আসে তখন তাদের কাছে যেমন চাকুরির সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা বড় বিষয় হয় তখন তাদের সাথে শহর ও গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও বেকারদেরর ইস্যু মিলে যায় – শহরবাসী ও গ্রামবাসী ছোট ছোট উন্নয়নের বিষয়কেই প্রাধাণ্য দেয়, উদারবাদী অর্থনীতিতে যে বিষয়গুলি সবচাইতে বেশি উপেক্ষিত। আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে সঙ্ঘ পরিবার যেমন ফায়দা লুটেছে, বিমূদ্রাকরণ নিয়ে বিরোধী দল এবং বিশেষ করে বামদলগুলি সেরকম কোনো আন্দোলন দিল্লিতে গড়ে তুলল না এবং ফলে বিরোধী পক্ষের বয়ান আমজনতার বয়ান হয়ে উঠল না। বিরোধীরা জিডিপি গ্রোথ ও দীর্ঘম্যাদী কুফল নিয়ে যে কূটতর্ক করলেন তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হল না, কারণ মেহনতি মানুষ শেখে জীবনসংগ্রাম ও সচেতন সংগ্রামের মাধ্যমে। বিরোধীদের কেন্দ্রীয় কোনো সচেতন সংগ্রাম না থাকায় আমজনতা বিমুদ্রাকরণকে ধনী বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে মেনে নিল। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির সবচাইতে কট্টর রূপায়ণকারী দল হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি এই অর্থনীতির বিরুদ্ধে গণক্ষোভকে বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধেই কাজে লাগালো। বিহার থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজেপি ইউপি-তে স্ট্র্যাটেজি পাল্টেছে, তবে বিহারে একাজটি কঠিন হতো কারণ লালু প্রসাদ আর যাই হোক সূক্ষ্ম দেহাতি কারুকার্য বুঝতে উস্তাদ।
সঙ্ঘ পরিবারের উপরোক্ত স্ট্র্যাটেজি’র বিপরীত স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে? নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সাথে যুক্ত প্রথম বিষয়গুলি কিন্তু অন্তর্বস্তুতে বিজেপি বিরোধী ইস্যু, সুতরাং সেই ইস্যুগুলিকে তৃণমূল স্তরে গণআন্দোলনের মাধ্যমে আরও তীব্র ও র‍্যাডিকেলাইজেশন করলে বিজেপি এগুলির সমাধান করতে পারবে না বা তাদের উদারবাদী আর্থিক সংস্কারের নীতি থেকে সরে আসতে হবে যা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উদারবাদী আর্থিক সংস্কারের অর্থই হচ্ছে সরকারি সামাজিক ব্যয় কমানো, বেসরকারিকরণ ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের স্বার্থে নীতি প্রণয়ণ করা। তাতে যে গণক্ষোভকে বিজেপি কাজে লাগিয়েছে তা আরও বৃদ্ধি পাবে ও রেডিক্যালাইজড হবে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে জনগণের বিষয় করে তুলতে হলে সেই তৃণমূল স্তরেই তাকাতে হবে। তৃণমূল স্তরে ব্যবহারিক জীবনে এমন কিছু সামাজিক আচার-অনুষ্ঠাণ-প্রতিষ্টান প্রচলিত ও প্রবহমান থাকে যা সামাজিক ঐক্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলিকে সুকৌশলে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ করে ১৯৯২ সালের পর থেকে। সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করার জন্য মেহনতি মানুষ এগুলির মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক বয়ানের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে। ভাষিক অধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকারের প্রশ্নগুলির তৃণমূল স্তরে, বিদ্যালয় স্তরে, সামাজিক স্তরে যে ইস্যুগুলির মাধ্যমে রূপ পায় সেখানে লড়তে হবে। তৃণমূল স্তরে উদারবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এই লড়াইয়ের সহযোগী হিসেবে যদি উপরে তার সামগ্রিক রূপ নিয়ে অবিরত প্রচার ও জনমত গঠনের কাজ করা যায় তাহলেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকশিত হবে, দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও দেশব্যাপী গণজাগরণের রূপ নেবে।               

International women's day, 8th March : Social movement and women’s question

Posted by স্বাভিমান


Revolutionary transformation of movements

The human habitats in a particular geographical space remain confined to a particular social and production relation. The relation of human being with nature is also determined by this social relation. This relation is the basic premise of the system of expropriation of labour. Labour is, first of all, a process between the human being and nature, a process by which human being through their own actions mediate, regulate and control the metabolism between themselves and nature. The needs and capacities of humans as species being are mediated through conscious activities. These conscious activities come in confrontation with the constraints of the given social relation. The relentless social and class struggle against the system of expropriation continues at various dimensions and levels. The vicissitudes of internal dynamics of social relations under the overall influence and modulation of global capitalism give rise to social movements of subaltern classes who are susceptible to the pressure of falling wage rates, rising unemployment and inequality, environmental degradation and ecological disaster, social insecurity, lack of civic amenity etc. The institution of family as the fundamental unit of the social relation and its structure and character depend on women’s labour. So the revolutionary transformation of the social movements and the social relations cannot be achieved without a deep understanding of the nature of expropriation of women’s labour and incorporating the women’s question in the programme of social movement. 
 
The participation of women in the movement

Within the ongoing social movements, there exists ambiguity, lack of clarity and consciousness on the question of women’s struggle. However, the participation of women and their militant role in the social movements are increasing day by day. In many occasions the women workers in India are the main participants in the movements, because women are the main working force in the sectors like ICDS, health, certain jobs in IT sectors, big retail outlets, NREG or in the plantation etc. The issues of social and workers’ rights are raised in those movements through large-scale participation of women, but the question of women’s liberty as a class or community remain by and large neglected. The role of women leaderships in women organizations is mostly confined to the opposition of the physical oppressions of women. The increasing spate of physical violence on women is certainly the manifestation of overall degradation of socio-cultural values under neo-liberal hedonistic milieu. But the confinement of this battle within the reformation of rule of law amounts to give legitimacy to the hegemonic class rule and social relation.

During freedom struggle and within its garb, the principal aspect of women’s struggle was reformism of patriarchal social practices. The phase of fifties and sixties passed in social calm and stalemate with the satisfaction of social need generated during freedom struggle through post independence constitutional guarantee of equality between men and women and certain legal provisions for protections against women’s repressions. The women’s question fell into a brown study of reformist programme even during the upswing of social movements in seventies and its rejuvenation in the current phase. The confinement within a narrow boundary is largely due to lack of clarity on both theoretical and practical premise.

Theoretical impasse

On the question of women’s liberty, two positions are primarily held. According to mainstream left opinion, the question of women’s liberty need not be dealt with separately, because the working class movement by itself will resolve this issue, formation of women’s organization is needed only to ensure participation of women in the overarching workers’ movement. The contrary view held by a section of feminists emphasizes that women should get separately organized without being mingled with working class movement. The extravagant claim of the advocates of these two streams of thoughts can be interpreted as the theoretical impasse in the overall social and workers movements because these two thoughts do not take family as basic unit of social relation into consideration. However, feminist consciousness shows how women came together to articulate previously unspoken but increasingly powerful discontent, and in so doing created at one and the same time a movement and a theory which radically disrupted the gender relationship of previous generations. But if the family labour and social labour are not considered intertwined within the ambit of law of value and expropriation of surplus value, the importance of formulation of programme on women’s labour and women’s liberty within the essence of social and workers’ movement is undermined. In the backdrop of rising social and working class movement, the Gramsci’s ‘good sense’ rooted in our actual experience must articulate the question of women’s liberty within the ambit of mass movement as against the hegemonic ‘common sense’ which tells us how things are supposed to be and what we supposed to think, feel and do.  

Family labour and Social labour

It is often argued that family labour is valueless or unpaid because it is not productive labour. It is not productive labour because it does not pass through commodity value chain or exchanged in the market. In this logical-structure, the use value and exchange value and in this sense the family labour and social labour are segregated in two mutually unrelated space-time continuums. The value of goods produced through family labour even when not exchanged in the market, is determined by notional familial reckoning. The notional price of the family products for consumption is less than the price of the same product for exchange between buyer and seller in the market, because the prices in market transaction are influenced by transportation costs, commissions of many intermediaries in the supply chain, the balance between supply and demand etc. Let us consider an example. The family members produced a quantity of vegetables in their own field. They used these vegetables for their own consumptions. The family labour got expended in cultivation and cooking. Had they not cultivated the vegetables, they would have purchased these items from the market. They would have opted for market had the competitive prices of the products in the market are less than the expenditure incurred for production by the family for own consumption. It means that the value payment is ingrained in both use and exchange.  But the women’s labour like cooking, child rearing etc within the family are not paid directly. This family labour is also integrated with the overall social and production relation. Let’s consider a case of the woman family member who works in a social productive space. This woman may not have the time to spend for certain aspects of family labour e.g. cooking or child-rearing. In this situation, she will engage outside labour (especially of women) as maid-servant for cooking and avail service of child care centre in exchange of money for child rearing. But the women who are engaged as domestic maid servants or in child care centres for exchange value of their labour power will also perform the similar unpaid labour within their own family for creating use value. Thus depending on market demand of exchange, the character of family structure as well as the family labour will change. Under this changed situation, the male members who are engaged in social productive labour will get further relieved from family labour. This domestic family labour of cooking, rearing, providing family support system for mental health etc reproduces the social labour power which is sold to earn exchange value in the market by both men and women. Two broad divisions are visible in this changed production relation. In exchange of same value following the rule of economics, the men have to do only outside labour while women have to do both outside and domestic labour, on the other hand a small of section women are getting a part of domestic labour done by other women labour in exchange of money. Moreover, if the demand created by the need of family to earn means of livelihood is more than the market demand of women labour, then wages of women’s labour will be below the value of their labour power and less than the men’s wage. The regulator and controller of such need within the family is the male member, because women’s incomes are treated as supporting income, women are not considered as main bread earner. The participation of women in the labour market is high in the case of low income group. When men start treating women as their competitor in the social labour market and as the cause of shrinking job opportunities, the patriarchal values of considering women as family centrepieces that should remain within the confine of four boundaries of home, are strengthened. The undeclared rules of family management or the rules of contract of marriages determine the forms of women’s labour, and the changes in the family rules in turn are influenced by the dynamics of production relation. That’s why the division between women and men’s labour and division within women’s labour need to be considered while formulating the programme of social and working class movement.

Marxist Conception

If the basic law of unity of opposites of dialectical materialism is applied for developing struggling unity among the working class, the practical formulation of struggle should be ascertained basing on such internal non-antagonistic divisions. Here the production is also unity of opposites of social and family labour. In capitalist production, the value of the product is calculated by adding values of three factors. These factors are value of labour power, surplus value and value of past or dead labour. The value of dead labour is the value of that part of means of production which has been utilised to produce the new product. On the other hand, the value of these three factors is determined by the average social labour time expended. The immense women’s labour which is ingrained in the production and reproduction of labour power of living labour and the production of past or dead labour remain unaccounted. Women themselves perform the necessary labour required for reproduction of their own living social labour. Thus the domestic labour of women not only produces use value for consumption, but it also produces the exchange value for sale of labour power of both men and women. So the issues of special rights of women’s labour need to be incorporated in the revolutionary working class movement.

Indian reality and movement programme

Let us examine the status of the women’s labour in India with the help of most reliable NSSO survey report. According to this report, the participation of women in social labour is more in rural sector than in urban sector. But this gap is being narrowed down from mid-2000 due to declining trend of women’s participation in Indian villages. The agricultural disaster, declining job opportunities etc are the cause of shrinking social-space for labour primarily of women, and this trend reveals the acute crisis of rural unemployment despite the ongoing schemes like PMNREGA, ICDS etc. The decline of women’s participation is also caused due to the huge penetration of modern implements in the agricultural production. The large-scale eviction from land for construction of SEZ areas is causing loss of jobs. According to one reliable economic calculation, out of five people who loses employment from traditional earning source due to such eviction and displacement to facilitate economic activities of big capitalists, only one gets reemployed. The participation of women in social production and empowerment thereof do not take place automatically by the capitalist transformation of agriculture under competitive pressure of market oriented demand, rather in certain circumstances women may be pushed back within the confine of family boundaries. The gap between the number participation of male and female labour is more in the urban areas than in the rural areas. The number of women who are losing traditional jobs is proportionately more than the rate of increase of new labour and as such women are compelled to work with abysmally low wages. The presence of a huge reserve army of women’s labour is pulling the wages down to a value below that of labour power in the sectors like health service, child rearing, NREGA, plantation etc where women are primarily employed. The women are primarily engaged in informal sectors and as such they are also deprived of legal social and labour security. As per NSSO survey report 2011-12, the average daily wages for female workers in organized and unorganized sectors are Rs. 481.90/- and 120.30/- respectively and that of male workers are Rs.632.20/- and Rs. 194.20/- respectively. The state-wise data shows that the participation of women in social labour is highest in NE India and least in North India. The state-wise data reveal that the patriarchal value does have an influence over the participation of women in social labour, and the capitalist transformation of relations of production by itself does not weaken the patriarchal value system. Both in pre-capitalist and capitalist relation of production women are workers within the bounds of family and are twice expropriated both within and outside family bounds when they participate in social production. The domestic labour not only creates use value, but also reproduces the labour power of male and female members by making it worthy for exchange in the labour market for exchange value. The owners of the means of production expropriates surplus value of both forms of women’s labour by means of a stratified wage structure, and thus create a labour aristocracy who stand in favour of giving legitimacy to the system of expropriation of labour. Consciously or unconsciously, a small section of woman in the elite and middle class falls in this trap, and it does not make much difference whether they are for or against any reform.
Women’s liberty from two forms of oppression is intertwined with women’s freedom of right over their own body. This freedom can be obtained by leading struggle against patriarchy and male hegemony in the realm of the institution of family. But this struggle is not autonomous struggle as envisaged by a section of feminists. Without the militant struggle for just wages in social labour, equal wages for both male and female, creation of job opportunities and social security for women, the feminist movement against the patriarchy and even the working class movement cannot be victorious. The struggle against patriarchy must be primarily launched within the women who are participating in the social labour, within their own space and organizations because they are simultaneously oppressed both in social space and family space. And the participation of male workers in this struggle must be ensured to build greater working class unity.




Posted by স্বাভিমান

সামাজিক আন্দোলন ও নারী প্রশ্ন

অরূপ বৈশ্য
(আমাদের সমকালের পরবর্তী সংখ্যার জন্য লেখা)

আন্দোলনের বৈপ্লবিক রূপান্তর

এক নির্দ্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারী মানব সমাজ এক নির্দ্দিষ্ট সামাজিক তথা উৎপাদন সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে। প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কও এই সামাজিক সম্পর্ক দিয়ে নির্ধারিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই সম্পর্কই সকল ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থার ভিত্তি। এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত চলতে থাকে বিভিন্ন মাত্রার ও স্তরের সামাজিক তথা শ্রেণি আন্দোলন। আজকের ভারতবর্ষও এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত ও প্রভাবিত অভ্যন্তরিণ সামাজিক সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাত মজুরি বৃদ্ধি, বেকারত্ব, চূড়ান্ত অসাম্য, প্রাকৃতিক ধ্বংস ও বিপর্যয়, সামাজিক অ-সুরক্ষা, নাগরিক অসুবিধা ইত্যাদি বহুবিধ প্রশ্নে আবর্তিত হচ্ছে। এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন মাত্রার সামাজিক আন্দোলনও গড়ে উঠছে। সামাজিক সম্পর্কের প্রাথমিক একক হিসেবে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং পরিবারের কাঠামো ও পরিবারের চরিত্র দাঁড়িয়ে আছে নারী শ্রমকে কেন্দ্র করে। সুতরাং সামাজিক আন্দোলনগুলির এক উন্নত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে বা শোষণমূলক সামাজিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য নারী শ্রম-শোষণকে অনুধাবন করা ও নারী প্রশ্নকে প্রতিটি সামাজিক আন্দোলনের কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ

বাস্তবে চলমান সব সামাজিক আন্দোলনে নারী সংগ্রামের বিষয় নিয়ে এক ধোঁয়াশা, অস্বচ্ছতা বা সচেতনতার অভাব বিদ্যমান। অথচ এইসব আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ও লড়াকু মনোভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটছে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরাই মূল অংশগ্রহণকারী, কারণ সার্ভিস সেক্টর যেমন অঙ্গনওয়াড়ি ওয়ার্কার, আশাকর্মী, সাফাই কর্মী, আইটি সেক্টরের নির্দ্দিষ্ট কাজ কিংবা প্ল্যান্টেশন ওয়ার্কার ইত্যাদিতে প্রধানত নারীরাই যুক্ত। এই আন্দোলনগুলিতে সামাজিক ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়গুলি উত্থাপিত হচ্ছে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে, কিন্তু উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে শ্রেণি বা গোষ্ঠী হিসেবে নারী মুক্তির প্রশ্নটি। নারী প্রশ্নে নেতৃত্বদায়ী নারী সংগঠনগুলির ভূমিকা প্রধানত নারীর দৈহিক নিপীড়ণের বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে দেখা যায়। নিপীড়ণের ক্রমবর্ধমান এই রূপগুলি নিশ্চিতভাবে সামগ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু শাসন ও আইনের সংস্কারের মধ্যে এর বিরোধিতাকে সীমাবদ্ধ রাখলে শোষণমূলক সামাজিক সম্পর্ক ও আধিপত্যাধীন শ্রেণি-শাসনকে কোন কোন ক্ষেত্রে এমনকী বৈধতা প্রদান করা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যায়ে এবং এই সংগ্রামের গর্ভে পিতৃতান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের সামাজিক সংস্কার নারী আন্দোলনের প্রধান দিক ছিল। স্বাধীন ভারতে নারী-পুরুষ সাম্যের সাংবিধানিক বৈধতা ও নারী নিপীড়নের ক্ষেত্রে কিছু আইনী সুরক্ষা প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক এক স্থবির পর্যায় অতিক্রম করে। সত্তরের দশকে উত্তাল সামাজিক আন্দোলন এবং বর্তমান পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান সামাজিক আন্দোলনের পুনর্জাগরণের পর্যায়েও নারী প্রশ্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচীতে আটকে আছে। এই আটকে যাওয়ার মুখ্য কারণ নারী মুক্তির প্রশ্নে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক অস্বচ্ছতা। অথচ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আন্দোলনে নারী-শ্রমের বিষয়টিকে সুনির্দ্দিষ্ট রূপে প্রবিষ্ট করতে না পারলে সামাজিক ও শ্রমিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক রূপান্তর সম্ভব নয়।

তাত্ত্বিক বিপর্যয়

নারী মুক্তির প্রশ্নে মুখ্যত দু’টি অবস্থান নিতে দেখা যায়। বামপন্থী মুখ্য ধারার মতে নারী মুক্তির প্রশ্নকে আলাদা করে ভাবার কোন দরকার নেই, কারণ শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনই এই বিষয়ের মিমাংসা করবে, নারীদের আন্দোলনে সামিল করার জন্যই শুধুমাত্র নারী সংগঠন বানাতে হবে। অন্য ধারার প্রবক্তাদের মতে, নারীদের সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সংগঠিত হতে হবে, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের সাথে একে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। প্রচলিত এই দুই ধারার অতিশয়োক্তি সামগ্রিকভাবে শ্রমিক ও সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক তাত্ত্বিক বিপর্যয় হিসেবে ভাবা যেতে পারে, কারণ এই দু’টি ধারাই সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক একক হিসেবে পরিবারকে বিবেচনা করে না। মূল্যের নিয়ম ও উদ্বৃত্ত মূল্য লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পারিবারিক শ্রম ও সামাজিক শ্রমের আন্তঃসম্পর্ককে বিচার্য বিষয় হিসেবে না ভাবলে নারী শ্রম ও নারী মুক্তির প্রশ্নকে সামাজিক ও শ্রমিক আন্দোলনের অন্তর্বস্তুতে স্থান দেওয়ার কর্মসূচী নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

পারিবারিক ও সামাজিক শ্রম

যুক্তি দেখানো হয় যে পারিবারিক শ্রম মূল্যহীন বা যার মূল্য দেওয়া হয় না, কারণ সেই শ্রম উৎপাদনী শ্রম নয়। এটা উৎপাদনী শ্রম নয় কারণ এই শ্রমের উৎপাদ মূল্যের ব্যবস্থা অর্থাৎ বাজারের মধ্য দিয়ে যায় না বা বিনিময় হয় না। এই যুক্তি-কাঠামোয় ব্যবহারিক মূল্য ও বিনিময় মূল্যকে এবং সেই অর্থে পারিবারিক শ্রম ও সামাজিক শ্রমকে পরস্পর সম্পর্করহিত দু’টি পৃথক স্থান-কালে আলাদা করে দেওয়া হয়। বাজার থেকে না কিনে পারিবারিক শ্রম দিয়ে তৈরি সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষত্রে বাজারের বিনিময় যুক্ত না থাকলেও সেটা নির্ধারিত হয় পারিবারিক লাভালাভের হিসাব থেকে। এই ব্যবহারিক মূল্য বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতার বিনিময় মূল্য থেকে কম হয়, কারণ বিনিময় মূল্যের ক্ষেত্রে পরিবহণ শুল্ক, মধ্যসত্ত্বভোগীদের কমিশন, যোগান ও চাহিদার ভারসাম্য ইত্যাদি বাজার দরকে প্রভাবিত করে। একটি উদাহরণ বিচার করা যাক। নিজের ফার্মে পরিবারের সদস্যরা স্বল্প পরিমাণ সব্জির চাষ করলেন। সেই সব্জি বাড়ির সব সদস্যরা রান্না করে খেলন। ফলন ও রান্নায় তাদের শ্রম যুক্ত হলো। সেই সব্জি বাজারে বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে বাজার থেকে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যেত। তারা যদি সব্জি ফলাতেন না, তাহলে সেই সব্জি তারা বাজার থেকে কিনতেন। সেটা তারা করতেন যদি ঘরোয়া উৎপাদনে যে ব্যয় প্রতিযোগিতার বাজারে তার চাইতে কম দামে সেই সামগ্রী কিনতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যবহারেই হোক বা বিনিময়েই হোক মূল্য অন্তর্নিহিত। কিন্তু পরিবারের অভ্যন্তরে ভোগের জন্য যে শ্রম হয় যেমন পরিবারের সব সদস্যদের রান্না করে খাওয়ানো, শিশু পরিচর্যা ইত্যাদি পরিবারের মহিলারা করলেন, কিন্তু সেই পারিবারিক শ্রমের জন্য তারা সরাসরি কোন মূল্য পেলেন না। সেই পারিবারিক শ্রমও সামগ্রিক সামাজিক ও উৎপাদন সম্পর্কের সাথে যুক্ত। ধরা যাক ঘরের মহিলা সদস্যকে অন্যত্র সামাজিক উৎপাদনী পরিসরে কাজ করতে হয়। সেই কাজের জন্য গৃহশ্রমের কিছু অংশ যেমন রান্না করা বা শিশু পরিচর্যা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে রান্নার জন্য বাইরের শ্রমিক (মুখ্যত যারা মহিলাই হোন) এবং শিশু পরিচর্যার জন্য ক্রেসের মহিলাদের শ্রমশক্তি অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করাই যদি লাভজনক বিবেচ্য হয়, তাহলে তারা তা’ই করবেন। কিন্তু যেসব মহিলা শ্রমিক অন্যত্র রান্নার কাজ বা শিশু পরিচর্যার কাজ করবেন তাদেরকে নিজের পরিবারেও অনুরূপ কাজ করতে হবে। অর্থাৎ বাজারের বিনিময়ের চাহিদার উপর নির্ভর করে পারিবারিক কাঠামো ও পারিবারিক শ্রমেরও পরিবর্তন ঘটবে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গৃহশ্রম, যার সরাসরি মূল্য দেওয়া হয় না, তার থেকে পারিবারিক গণ্ডির বাইরে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকরা অনেকখানি মুক্ত হবেন। এই গৃহশ্রমে খাওয়া-দাওয়া, পরিচর্যা ও পারিবারিক সাপোর্ট-সিস্টেমে মানসিক স্বস্তির মাধ্যমে পুরুষ ও নারী উভয় শ্রমিকের শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদন হয় যাতে বাইরে গিয়ে তারা নিজেদের শ্রমশক্তি বিক্রির বিনিময় মূল্য অর্জন করতে পারেন। এই পরিবর্তিত উৎপাদন সম্পর্কে ও একই উৎপাদন সম্পর্কের অধীনে দু’টি বিভাজন পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতির নিয়মে একই মূল্যের বিনিময়ে পুরুষদের করতে হচ্ছে শুধুমাত্র বাইরের শ্রম, নারীদের করতে হচ্ছে বাইরের ও গৃহশ্রম, আবার অন্যদিকে একাংশ নারী গৃহশ্রমের একাংশ অন্য নারীদের দিয়ে মূল্যের বিনিময়ে করিয়ে নিচ্ছেন। উপরন্তু নারীদের বাইরের শ্রমের ক্ষেত্রে পারিবারিক ভরণ-পোষণের চাহিদা যদি বাজারের চাহিদা থেকে বেশি হয়, তাহলে সামাজিক শ্রমে নারীর মজুরি শ্রমশক্তির মূল্যের কিংবা পুরুষের মজুরির চেয়ে কম হয়। পারিবারিক ক্ষেত্রে এই চাহিদার নিয়ন্ত্রক ও চালিকাশক্তি হচ্ছে পুরুষ সদস্য, কারণ নারীদের মূল উপার্জনকারী হিসেবে ধরা হয় না, তারা সহযোগী। সামাজিক শ্রমে পুরুষরা যদি নারীদের প্রতিযোগী ও পুরুষদের কর্মসংকোচনের কারণ হিসেবে ভাবতে শুরু করে তাহলে নারীরা গৃহের ভূষণ ও তাদের গৃহের অভ্যন্তরে থাকাই সমীচীন এই পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমাজে চাগার দিয়ে উঠে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে পরিবার পরিচালনার অঘোষিত নিয়ম কিংবা বিবাহজনিত সামাজিক চুক্তি নারীর শ্রমের স্বরূপ নির্ধারণ করে, অন্যদিকে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে সামগ্রিক উৎপাদন সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। তাই পুরুষ ও নারী এবং নারী শ্রমিকের মধ্যেকার বিভাজন শ্রমিক আন্দোলন ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মসূচী নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়।

মার্কসীয় বীক্ষা

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মৌলিক সূত্র বৈপরীত্যের ঐক্য যদি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে শ্রমিক শ্রেণির এই অভ্যন্তরিণ উল্লিখিত অবৈরী দ্বন্দ্বকে সংগ্রামের প্রায়োগিক রূপে নির্ধারিত করতে হবে। এখানে উৎপাদনেও বৈপরীত্যের ঐক্য – সামাজিক ও ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক। পুঁজিবাদী উৎপাদনে উৎপাদের মূল্য নির্ধারণ হয় তিনটি উপাদানের মূল্যের যোগফল থেকে। এই তিনটি উপাদান হলো শ্রমশক্তির মূল্য, শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য, উৎপাদনের উপকরণের ব্যবহৃত মূল্য অর্থাৎ অতীত শ্রম বা মৃত শ্রম যা এই উপকরণগুলি তৈরি করেছে তার যে অংশ নতুন উৎপাদে ব্যবহৃত হলো তার মূল্য। অন্যদিকে এই তিনটি উপাদানের মূল্য নির্ধারণ হয় কতটা গড় সামাজিক শ্রম-সময় ব্যয় হলো তা দিয়ে। শ্রমশক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ও উপকরণের ব্যবহৃত মূল্য বা অতীত শ্রমের ক্ষেত্রে নারীর অফুরন্ত ঘরোয়া শ্রম হিসাব বহির্ভূতভাবে যুক্ত রয়েছে। নারী শ্রমিকের সামাজিক শ্রমের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনের জন্য শ্রমও নারী নিজেই করতে হয়। সুতরাং নারীর গৃহশ্রম শুধু উপভোগের জন্য ব্যবহারিক মূল্যই সৃষ্টি করে না, পুরুষ সদস্য ও নিজের সামাজিক শ্রমের জন্য শ্রমশক্তির বিক্রির বিনিময় মূল্যও সৃষ্টি করে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী সংগ্রামে নারী শ্রমিকের বিশেষ অধিকারের সংগ্রামকে সন্নিবিষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।                       

ভারতীয় বাস্তবতা ও সংগ্রামী কর্মসূচী

সবচাইতে গ্রহণযোগ্য উৎস এনএসএসও সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে এবার ভারতবর্ষের মহিলা শ্রমিকের অবস্থান দেখা যাক। এই হিসাব অনুযায়ী গ্রামীণ ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা শহর থেকে বহু বেশি। ২০০০ সালের মধ্যবর্তী সময় থেকে গ্রামীণ ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমতে থাকায় এই ব্যবধানও ক্রমশ কমে আসছে। কৃষির বিপর্যয়, তীব্র বেকারত্ব, রোজগারের সুযোগ হ্রাস ইত্যাদির ফলে গ্রামীণ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে মহিলারাই বেশি কাজ হারাচ্ছেন, এমজিএনরেগা, আইসিডিএস-এর মত প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও এই প্রবণতা গ্রামীণ ক্ষেত্রে তীব্র কর্মসংস্থানের সংকটকে দেখায়। কৃষি উৎপাদনে আধুনিক মেশিন সরঞ্জামের ব্যাপক অনুপ্রবেশও কৃষিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। বৃহৎ পুঁজিনির্ভর সেজ এলাকা গঠনের জন্য কৃষিজমি থেকে উচ্ছেদের ফলেও মহিলারা কাজ হারাচ্ছেন। একটি নির্ভরযোগ্য হিসাবে দেখা গেছে এধরনের উচ্ছেদের ফলে প্রতি পাঁচজন কর্মহারাদের মধ্যে মাত্র একজনের পুনর্নিয়োগ হয় এবং সেটাও জোটে পুরুষ শ্রমিকের ভাগ্যে। বাজারের চাহিদা-নির্ভর প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকতে কৃষির পুঁজিবাদী রূপান্তর যে নারী সশক্তিকরণ ঘটায় না বরঞ্চ নারীকে পারিবারিক গণ্ডির ভেতরে ঠেলে দেয় এটা তারই উদাহরণ। এমনকী মহিলা ও পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যার ফারাক গ্রাম থেকে শহরে অনেক বেশি। যদিও আনুসঙ্গিক কিছু সার্ভিস সেক্টরের কাজে নতুন নারী শ্রমিক গড়ে উঠছে, তবে সামগ্রিকভাবে কাজ হারানো শ্রমিকের সংখ্যার তূলনায় এই নতুন শ্রমিকের আনুপাতিক বৃদ্ধির হার কম হওয়ায় নারী-শ্রমিকরা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ যে সব সেক্টরে নারীদেরই মুখ্যত নিয়োগ করা হয়, যেমন  স্বাস্থ্যসেবা, শিশু পরিচর্যা, প্ল্যান্টেশন, সাফাই কিংবা এমজিএনরেগার কাজ ইত্যাদি, সেসব ক্ষেত্রেও নারী-শ্রমিকের রিজার্ভ-আর্মির উপস্থিতি মজুরিকে শ্রমশক্তির মূল্যের বহু নীচে বেঁধে রাখছে এবং মহিলারা মুখ্যত ইনফর্মাল সেক্টরে কাজ করায় আইনী সামাজিক শ্রম-সুরক্ষা থেকেও তারা বঞ্চিত। ২০১১-১২-এর এনএসএস সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলাদের গড় দৈনিক মজুরি যথাক্রমে ৪৮১.৯০ টাকা ও ১২০.৩০ টাকা এবং পুরুষদের দৈনিক মজুরি যথাক্রমে ৬৩২.২০ টাকা ও ১৯৪.২০ টাকা।  রাজ্যভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে যে উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে এবং সামগ্রিকভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতে সামাজিক শ্রমে মহিলাদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। মহিলাদের সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ যে প্রভাব বিস্তার করে এবং সামাজিক সম্পর্কের পুঁজিবাদী রূপান্তর যে নিজে থেকেই এই মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে না, বরঞ্চ একে শক্তিশালী করে রাজ্যভিত্তিক তথ্য এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে। প্রাক-পুঁজিবাদী বা পুঁজিবাদী যে কোন সামাজিক সম্পর্কে মহিলারা পারিবারিক গণ্ডিতে সর্বদাই শ্রমিক, যখন তারা বাইরের সামাজিক শ্রমে অংশগ্রহণ করেন তখন তারা দ্বিবিধ শোষণের শিকার হোন। কারণ স্বামী-সন্তান পরিচর্যা ইত্যাদিতে যে গৃহশ্রম তা ব্যবহারিক মূল্যই সৃষ্টি করে না, পুরুষ সদস্য ও নিজের শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে শ্রম বাজারে বিনিময়যোগ্য করে তোলে বিনিময় মূল্যও সৃষ্টি করে। ফলে এক স্তরীভূত মজুরি কাঠামোর মধ্য দিয়ে উৎপাদনের উপকরণের মালিকশ্রেণি নারীদের উভয় শ্রমের উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ করে এবং তাতে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে এক বিশেষ সুবিধাভোগী অংশ শোষণের বৈধতা প্রদানের পক্ষে দাঁড়ায়। জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে মহিলাদের এক ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণিও এই ফাঁদে পা দেন, এই মহিলারা সমাজ সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে থাকলেও তাতে ইতর বিশেষ ফারাক হয় না।

নারীর সামাজিক শ্রম করার অধিকার নারী-দেহের উপর নিজের স্বাধীন অধিকার প্রতিষ্ঠার উপর নির্ভরশীল। এই স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব পিতৃতন্ত্র তথা পারিবারিক গণ্ডিতে পুরুষ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই সংগ্রাম একাংশ নারীবাদীদের ধারণার অনুরূপ কোন স্বয়ংক্রিয় সংগ্রাম নয়। সামাজিক পরিসরে নারী শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, নারী-পুরুষ সম মজুরি, কাজের বহুল সুযোগ সৃষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য জঙ্গি নারী আন্দোলন ছাড়া পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীবাদীদের ঘোষিত সংগ্রামে, এমনকী শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনেও বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রাথমিকভাবে পরিচালিত করতে হবে সামাজিক-শ্রমে অংশগ্রহণকারী নারী-শ্রমিকদের মধ্যে, তাদের নিজস্ব পরিসরে – নিজস্ব সংগঠনে, কারণ তারা একইসাথে পারিবারিক শ্রমে যুক্ত ও দ্বিবিধ শোষণের শিকার। এবং বৃহত্তর শ্রমিক ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই লড়াইয়ে সামিল করতে হবে পুরুষ শ্রমিকদেরও।










          

Bhangar : What is at stake? – A bird’s eye view.

Posted by স্বাভিমান

Bhangar : What is at stake?
Arup Baisya

It’s predictable that the Left front, like other left-democratic forces, would organize protest on recent Bhangar episode. But why the mainstream left fails to make a distinction between the land-grabbing in Singur-Nandigram to serve the interest of big private capital and in Bhangar by the local land mafias to serve the interest of local promoters raises many eyebrows. Regaining the lost credibility is not the journey a posteriori. Their protest is destined to lose credibility if the conceding of the mistake on the land grabbing issue during left front rule and the apology to the people thereon is not forthcoming. “Chire Bhaja-Muri Bhaja Shilpayon” sarcasm against Mamata Govt does not augur well in the backdrop of Left front’s policy persuasion through abject surrender to big capital. It is also surprising that Left front find no issue raised by TMC against despotic act of the centre even for qualified unity.  
But this is one side of the story. The social milieu of West Bengal is agog with resentment or even surreptitious acts of protest or revenge against the old patriarchal economic and physical power and this becomes evident in the outburst of public fury on any issue of public nuisance.  The emergence of large scale wage labourer and the erosion of feudal patriarchal control lead the society-in-transition with restlessness. The society is waiting for class hegemony with new dimensions. These are the Achilles heels for Mamata Benerjee and her party which came to power in this void. But she so far failed to create a new political leadership in the Gramscian sense from her rural support base in the emerging classes. Mamata’s aid de camp and the TMC leaders who come to the fore from the emerging class apply the same old method a la mode for blatant display of patriarchal muscle power and economic power as property appropriator. The national political issues and issues related with statecraft from above are articulated by the few educated and sophisticated leaders, but to carry this down to ground level, TMC still has to rely on the old-styled and old-fashioned leaders who are suffering from gradual diminishing social credibility. This diminishing credibility of rural leaderships is naturally prone to diminishing return for political control of TMC over the masses.
The Bhangar imbroglio has unveiled this phenomenon quite prominently. The accumulated resentment of the inhabitants of Bhangar against the muscle power and the economic power of the leaders like Arabul et el turned into rebellion. The argument that the TMC failed to convince the people about the benefit of Power Grid Sub-station and line is not convincing. The fact that the villagers could not get adequate compensation of the land due to the middleman role of local TMC leaders who themselves acted as land-grabbers is adequate to contemplate the narrative of accumulated ager to get burst out with a triggering effect of Power Grid issue. Mamata Benerjee and her party are making half-hearted efforts to nurture new alternative of articulate political leaderships organically linked to the rural masses and thus failing to build a sustainable hegemony over the masses for a long time. This hegemony must be based on a cultural value that takes into account of the denouncement of the masses to be obsequious to ‘your worship or master’ and on indigenous industrialization route.  Building of alternative cultural hegemony is more urgent because of the fact that the challenges are coming from an obscurantist all-out cultural hegemony of Hindutwa.
If Mamata Benerjee does not understand this rule of the game, her meticulously portrayed crusader image against the ultra-nationalist fascist forces cannot be the cementing factor to bind the people of West Bengal as a coherent whole behind her to fight the fascist menace. In that case, she is destined to lose ground and to be dethroned in near future.

                 

সংখ্যালঘু প্রশ্ন ও ভারতীয় গণতন্ত্র

Posted by স্বাভিমান

সংখ্যালঘু প্রশ্ন ও ভারতীয় গণতন্ত্র
(আমাদের সমকালে প্রকাশিত)
সংখ্যালঘুর সংখ্যালঘু হয়ে উঠা
সংখ্যালঘু কীভাবে সংখ্যালঘু হয়ে উঠল? প্রশ্নটি বেয়াড়া মনে হলেও এর উত্তর ইতিহাসে নিহিত। সংখ্যালঘুর বাস্তব অস্তিত্ব, এবং চেতনায় সংখ্যালঘু অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ -  এই দু’য়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।  সংখ্যাগুরুর চেতনায় সংখ্যালঘু সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়া ও সংখ্যালঘুর নিজের মধ্যে সেই ধারণার সুস্পষ্ট রূপ পাওয়া এই দু’য়ের আন্তঃক্রিয়া রাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের আগে সংখ্যালঘু প্রশ্ন রাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তার মানে এই নয় যে তার আগে সংখ্যালঘুর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। একটি স্থূল উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যাক। ‘আমি প্রতিদিন হেঁটে অফিসে যাই’ এই বিবৃতির মধ্যে রাস্তার কথা উহ্য, কারণ সেটা বাস্তবে বিশেষত্বহীনভাবে উপস্থিত আছে। যদি তীব্র দাবদাহে রাস্তার পিচ গলে যায় তাহলে এই পরিবর্তীত বাস্তবকে বোঝাতে তখন বলতে হবে ‘প্রতিদিনকার মত অফিসে হেঁটে যেতে আজ অতি সন্তর্পণে রাস্তার গলা পিচকে পাশ কাটিয়ে যেতে হয়েছে’। এখানে রাস্তা নিজের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে, পথচারীকেও এই পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে নিজের স্বার্থেই এক বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। রাস্তার মত জড় পদার্থের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত সরল, কিন্তু নিয়ত পরিবর্তনশীল ও জীবন্ত মানব সমাজের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। যাইহউক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রব্রজনের ফলে জনবিন্যাসে পরিবর্তন এবং উপনিবেশ বিরোধী জনজাগরণের গর্ভে জন্ম নেওয়া সমাজের অভ্যন্তরীণ উথালপাতালের ফলে বাস্তবে বিদ্যমান বিভিন্ন জনগোষ্ঠীগত নিপীড়ণ ও বঞ্চনার প্রশ্নটি সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর বয়ানে সচেতন ভাষা পায়। সংখ্যালঘুর সংখ্যালঘু হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় একে সামিল করে নেওয়ার সংখ্যাগুরুর গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পরষ্পর পরিপূরক হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়।
সংখ্যালঘু হয়ে উঠার ক্ষেত্রে আরও কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির কোনো গোষ্ঠীতে জন্ম নেওয়াই গোষ্ঠী পরিচিতির পেছনে অন্যতম কারণ নয়। নির্ভরতার বিভিন্নধরনের ও জটিল সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি গোষ্ঠী চেতনায় উপনীত হয়। গোষ্ঠী চেতনা ভাষা, এথনিসিটি, রেস, ধর্ম ইত্যাদিকে ভিত্তি করে গড়ে উঠে এবং ব্যক্তির আদিম নঞর্থক পরিচিতি গোষ্ঠী পরিচিতির স্বার্থকে জাহির করায় রূপান্তরিত হয়। এটা চেতনার একধরনের অগ্রগতীও বটে। কিন্তু এই অগ্রগতীর মধ্যেই নতুন বিপত্তি লুকিয়ে থাকে। এই চেতনা গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে সবকিছু ভাল, আর এর বাইরে সবকিছু খারাপ - এরকম এক ধারণার জন্ম দেয়। কোনো গোষ্ঠী যখন অন্য গোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য কিংবা আধিপত্যের ফলে নিজেদেরকে বঞ্চিত বলে ভাবতে শুরু করে তখনই সংখ্যালঘু সংখ্যালঘু হয়ে উঠে। এই গোষ্ঠী চেতনাকে অস্বীকার, অবজ্ঞা বা দমন করে ব্যক্তি স্বাধীনতার আধুনিকতা ও গণতন্ত্রকে সাব্যস্ত করা যায় না।
সংখ্যালঘুর ভারতীয় বয়ান      
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে সংঘপরিবারের সংখ্যাগুরুবাদী সাম্প্রদায়িক আদর্শে ধর্মীয় রাষ্ট্র ও অতীত পুনরুত্থানের গান্ধীবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত রাষ্ট্রকে অস্বীকার করে নেহেরুবাদী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের যে প্রয়াস শুরু হয়েছিল তা উপরোক্ত বাস্তব প্রেক্ষিতের মধ্যে নিহিত। সংঘ পরিবার এমন এক তাত্ত্বিক যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যে মত অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে সংখ্যালঘু তৈরি করা হয়। এরজন্যই তারা সংখ্যালঘু অধিকারের পক্ষে কোনো বয়ান কিংবা সংখ্যালঘুর জন্য নির্ধারিত যে কোনো কল্যাণকামী পদক্ষেপের বিরোধিতা করে এবং সংখ্যালঘু তোষণবাদ হিসেবে প্রচার করে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদকে উষ্কে দেয়। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করা যাক। রাস্তায় প্রহরারত পুলিশ যখন চেঁচিয়ে বলে “হে তুম, রোখো”, তখন সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটি ফিরে তাকায় এবং এভাবে বিষয় (subject) নিজেকে বিষয় করে তোলে। অর্থাৎ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই বিষয়কে বিষয় করে তোলা হয়, তার আগে পর্যন্ত বিষয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। এভাবে তারা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে নাকচ করে দিয়ে তাৎক্ষণিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং এভাবে সংখ্যালঘুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কিংবা সংখ্যালঘুর অস্তিত্বকেই ধ্বংস করে দিতে চায়। এভাবে অনৈতিহাসিক ও অবৈজ্ঞানিক প্রকরণের মধ্যে গণতন্ত্রের যে কোনো স্থান নেই তা বলাই বাহুল্য, বরঞ্চ এই প্রকরণ অনুকূল পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার যুক্তিকাঠামো হিসেবে পরিগণিত হয়। অন্যদিকে গান্ধীবাদের মধ্যে অতীত সমাজের পুনরুত্থানের এক রোমান্টিসিজম বিদ্যমান। নিয়ত পরিবর্তনশীল সামাজিক কাঠামোয় পুরোনো সমাজ ব্যবস্থাকে অবিকল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তা করতে গেলে সামাজিক বিকৃতি দেখা দেওয়া সম্ভব এবং সংখ্যালঘুর অধিকার মানার যে আধুনিক গণতান্ত্রিক বয়ান তাকে অস্বীকার করা হয়। এটা নিশ্চয়ই বলা যায় যে নেহেরুর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বহু খামতি ছিল এবং একে আরও বিকশিত করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু যারা সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গণতান্ত্রিক ধারণাকেই নস্যাৎ করে দিতে উদ্যত তাদের প্রয়াস নিশ্চিতভাবে বিপজ্জনক। নেহেরুবাদী রাষ্ট্র গঠনের বয়ানে যুক্তি ও প্রগতির আধুনিক ধারণা প্রোথিত ছিল, কিন্তু এর স্বরূপ ছিল এলিটিস্ট, কারণ এই বয়ানে ধরে নেওয়া হতো যে আম-জনতা স্থবির ও পিছিয়ে পড়া যাদেরকে অন্ধরকার থেকে আলোয় আনতে হবে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ-বিভাজনের মাধ্যমে যে ভারতীয় রাষ্ট্র জন্ম হয় তাতে জাতি-রাষ্ট্রের উপাদান ছিল প্রবল। এই জাতি-রাষ্ট্র ভাষা-সংস্কৃতির একধরনের সমসত্তা দাবি করে। তাই নেহেরুবাদী আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু প্রশ্নের মীমাংসার একমাত্র পথ রয়ে যায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের পথ। স্বাধীনতা সংগ্রামের দিয়ে মধ্য যে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীগত চেতনা জাগ্রত হয়েছিল, স্বাধীন ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের সময় জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাকে খানিকটা নমনীয় করে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন ও সংখ্যালঘুর কিছু সাংবিধানিক অধিকার মেনে নিয়ে এরজন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়। নেহেরুবাদী আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের এই দুর্বলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সংকটকালে আগ্রাসী জাতিয়তাবাদীদের উত্থানের রহস্য। এরজন্যই স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যখনই কোনো পরিচিতির দাবি জোরদার হয় তখনই এর সামনে ভারত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে মনে হয় অসহায়। ভারতীয় উপমহাদেশে পরিচিতির সীমা ও স্তরতন্ত্র অত্যন্ত অনমনীয়, কারণ যারা শাসন ব্যবস্থায় আধিপত্য বজায় রেখেছে তারা প্রতিনিয়ত বাকী সব পরিচিতিদের অপর হিসেবে হেয় প্রতিপন্ন করে ও দাবিয়ে রাখে। ভারতীয় দলিতদের ক্ষেত্রে এই বাস্তবটি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে উন্মোচিত। তথাকথিত আধুনিকতার বয়ানেও এই সমস্যা রয়েছে - ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রবক্তারা ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গোষ্ঠীগত অধিকার এই দু’য়ের মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্ককে দেখতে অপারগ।    
সংখ্যালঘুর অধিকার
ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্নটি বেশ জটিল। আমাদের দেশে ১৮টি অষ্টম তপসিলিভুক্ত স্বীকৃত ভাষা সহ ৪৬০০ ভাষা/উপভাষা রয়েছে যেগুলি ১২ টি ভাষা-পরিবারের ও ২৪টি লিপির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে ২৮০০ এথনিক কম্যুনিটি এবং ২০,০০০ বর্ণগোষ্ঠী রয়েছে। ভারতে বিশ্বের সব প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাস। একই জনগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক পরিচিতি ভারতীয় বৈচিত্র্যের বৈশিষ্ট্য। উপরন্তু একথা মনে রাখা উচিত যে কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীই সমসত্তাবিশিষ্ট নয়।
ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রশ্নটি সবসময়ই স্পর্শকাতর। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে আজ পর্যন্ত আমরা বহু পরিচিতির বহুবিধ দাবি উত্থাপিত হতে দেখছি। প্রারম্ভিক ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের পরও ভাষিক-পরিচিতিকে ভিত্তি করে নতুন রাজ্য গঠন হতে দেখেছি। সম্প্রতি এমনকি জাঠ – মারাঠাদের মত প্রাগ্রসর পরিচিতিও সংরক্ষণের দাবি তুলছে। আসামে বিভিন্ন জনজাতীয়রা সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছে, বাঙালিরা চাইছে ভাষিক পরিচিতির নিরাপত্তা। দেশব্যাপী দলিত আন্দোলন নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। তালিকা দীর্ঘ না করে আমরা একথা নির্বিবাদে বলে দিতে পারি যে এদের সবার মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু মনস্তস্ত্ব। তাই এধরনের সব জনগোষ্ঠীকে আমরা এককথায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। নির্ধারিত জনগোষ্ঠী নিজেকে কীভাবে দেখে তার মাধ্যমে এবং জনগোষ্ঠীগত সীমার বাইরে অন্যরা বা সংখ্যাগুরুরা যেভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দেখে তার সাথে আলাপচারিতা বা তাকে সংগ্রামের মাধ্যমে মোকাবিলা করার মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘু পরিচিতি গড়ে উঠে। মুসলমানদের উদাহরণই ধরা যাক, কারণ মুসলমান প্রশ্নটি আজকের ভারতে প্রধান বিচার্য বিষয়। মুসলিম পরিচিতির একটি উপাদান যেমনি মুসলমানরা নিজেদেরকে কীভাবে দেখে, ঠিক তেমনি অ-মুসলমানরা মুসলমানদের কীভাবে দেখে তার সাথে ডায়লগের মাধ্যমে কিংবা সংগ্রামের মাধ্যমে মোকাবিলা করার মধ্য দিয়েই মুসলমানদের সংখ্যালঘু পরিচিতির স্বরূপ নির্ধারিত হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত।        
ভারতবর্ষের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে সংখ্যালঘু প্রশ্নটি এক গুরুত্ত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যায়ে সামাজিক উথালপাতাল সংখ্যালঘুর অস্তিত্বকে যেভাবে ব্যক্ত করেছে তা বাস্তবের একটি দিক। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ যে সাম্প্রদায়িক ভিত রচনা করে এর উপর দাঁড়িয়ে গত শতকের শেষ দিকে দক্ষিণপন্থী হিন্দু শক্তির উত্থান এই বাস্তবের আরেকটি দিক। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস এই উত্থানের মাইলস্টোন, কারণ এই পর্যায়ে রাষ্ট্রের সাথে মুসলিম সংখ্যালঘুর সম্পর্ক একেবারে তলানিতে এসে ঠেকে, যদিও সাম্প্রদায়িক হিংসা ভারতীয় ইতিহাসে নতুন নয় এবং স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এর যাত্রা শুরু হয় দেশ বিভাজনের মধ্য দিয়ে। সুতরাং সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্ন অস্তিত্বের ও সুরক্ষার প্রশ্নকে এড়িয়ে আলোচিত হতে পারে না।
সংখ্যালঘুর সাংবিধানিক ব্যবস্থা
সংবিধান সভার বিতর্কের সময় কিছু দলিত সদস্যরা নিজেদেরকে ‘রাজনৈতিক সংখ্যালঘু’ হিসেবে মর্যাদা প্রদানের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। সংখ্যালঘু নির্ধারনের ক্ষেত্রে তাঁরা সংখ্যাগত হিসাব নয়, তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা ও জাতিগত শোষণের বিষয়কে বিচার্য বিষয় করেন।
সংবিধান সভার আগে মতিলাল নেহেরুর পৌরোহিত্যে গঠিত নেহেরু রিপোর্ট ১৯২৮ এবং সাপরু কমিটি রিপোর্ট ১৯৪৫ সংখ্যালঘুর আধিকারের প্রশ্ন সূত্রায়িত করে। এই রিপোর্ট সংখ্যালঘুদের জন্য রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধি সংরক্ষণ এবং সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা করার জন্য আলাদা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার পরামর্শ দেয়। ১৯৪০ সালে আবুল কালাম আজাদ ঘোষণা করেন যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন তা সংখ্যালঘুদেরই নির্ধারণ করা উচিত, সংখ্যাগুরুদের এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কিন্তু  দেশবিভাজনের ফলে বিষিয়ে উঠা পরিবেশের প্রেক্ষিতে সংবিধান সভা এই গণতান্ত্রিক অবস্থান থেকে সরে আসে। সংখ্যালঘু বিষয়ক পরামর্শদাতা কমিটির চ্যায়ারম্যান বল্লভভাই প্যাটেলের পরামর্শ অনুযায়ী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ও চাকুরি সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংরক্ষণের মাধ্যমে সুরক্ষা প্রদান করার প্রাথমিক সূত্রায়ন বাদ দেওয়া হয় এবং তার বদলে সংখ্যালঘু সাব-কমিটি গঠনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া হয় এবং পরামর্শদাতা কমিটির সব পরামর্শই খসড়া সংবিধানের ১৪ নং ভাগে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এভাবে পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে তপসিলি জাতি – জনজাতি থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়।
ভারতীয় সংবিধানের ২৯(১) ধারায় যে কোনো জনগোষ্ঠী তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষা করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। অনুরূপভাবে ৩০ নম্বর ধারায় ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনা করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। তবে সংবিধান সংখ্যালঘুর কোনো সংজ্ঞা দেয়নি। জাতীয় স্তরকেই সংখ্যালঘু নির্ধারণ করার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। ২০০২ সালে টি.এম.এ পাই ফাউণ্ডেশন বনাম কর্নাটক রাজ্য ও অন্যান্যদের এক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রথমবাররে মত সংখ্যালঘু প্রশ্নের কিছু ব্যাখ্যা মেলে। কেন্দ্র, রাজ্য ও অঞ্চলকে সংখ্যালঘু নির্ধারণের একক মানা হবে কিনা, কেন্দ্র স্তরের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রাজ্যে কিংবা রাজ্য স্তরের সংখ্যালঘু সেই রাজ্যের কোনো অঞ্চলে সংখ্যাগুরু হলে সেই জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু মর্যাদা হারাবে কিনা এনিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিতর্ক হয়। সুপ্রিম কোর্ট এই নীতি জারি করে যে কেন্দ্র স্তরে কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রাজ্যে যদি সংখ্যাগুরু হয় তাহলে সেই রাজ্যে এই জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হবে না। অর্থাৎ রাজ্যগুলিতে সংখ্যালঘু নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজ্যের জনসংখ্যাগত বিন্যাসকে বিবেচনায় রাখা হবে। সংবিধানের ধারা ৩০ মতে যেহেতু ধর্মীয় ও ভাষিক এই দ্বিবিধ জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তাই রাজ্যিক জনসংখ্যা অনুযায়ী ধর্মীয় ও ভাষিক জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজ্যকে একক হিসেবে ধরে নেওয়ার পেছনে মূল যুক্তি হলো ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন। ২০০৪ সালে সংবিধানের ১০৩ তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংখ্যালঘু জাতীয় কমিশনকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের মে মাসে ক্যাবিনেট সুপ্রিম কোর্টের টি.এম.এ পাই ফাউণ্ডেশন মামলা সহ বিভন্ন মামলার রায়ের সূত্র ধরে রাজ্যভিত্তিক সংখ্যালঘু নির্ধারণে স্বীকৃতি দেয়।  
কিন্তু এই যুক্তির ক্ষেত্রে বিপত্তি রয়েছে। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন সংখ্যাগুরু ভাষিক পরিচিতিকে রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। আসামের কথাই ধরা যাক। আসামে ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে অসমীয়া ভাষিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিবেচনায় আসাম রাজ্য গঠন হয়, পরবর্তীকালে এই ভাষার ভিত্তিতেই পুরোনো আসাম ভেঙে আরও রাজ্য তৈরি হয়। বর্তমান আসামে অসমীয়া ছাড়া আরও বহু ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে যার মধ্যে বাংলাভাষীরা প্রধান। রাজ্যিক পরিসরে সংখ্যালঘু নির্ধারণ করার নিয়ম অনুযায়ী আসামে অসমীয়া ছাড়া বাকী সবাই শিক্ষা ক্ষেত্রে (সংবিধানের ৩০ নং ধারা শুধুমাত্র শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ) সংখ্যালঘু সুরক্ষা পাবে। এক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু ভাষিক জনগোষ্ঠীর কোনো সমস্যা দেখা দেয় না, কারণ রাজ্যিক স্তরের উভয় জনগোষ্ঠীই জাতীয় স্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। রাজ্যিক স্তরে ভাষিক সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু হওয়ার সুবাদে রাজ্য পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে সুবিধা ভোগ করে সেই সুবিধা তারা জাতীয় স্তরে ভোগ করতে পারে না। অর্থাৎ অন্য সব ফ্যাক্টর বাদ দিলে, শুধুমাত্র জনসংখ্যার বিচারে রাজ্যিক স্তরে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু ভাষিক জনগোষ্ঠীদের জাতীয় স্তরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা না পাওয়ার সংখ্যালঘু মানদণ্ড ধরে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে রাজ্যিক মানদণ্ড খানিকটা গোলমেলে। ভাষাভিত্তিক রাজ্যের সীমানা যেহেতু ধর্মীয় পরিচিতির সীমানাকে নির্ধারিত করে না, তাই ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে রাজ্যকে একক হিসেবে ধরার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। পঞ্জাবের উদাহরণই ধরা যাক। পঞ্জাবে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। রাজ্যকে একক ধরলে সংবিধানের ধারা ৩০ অনুযায়ী শিক্ষা ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে হিন্দুদের বিশেষ অধিকার দিতে হয়। কিন্তু জাতীয় স্তরে হিন্দুরা পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে নীতি নির্ধারণ ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে আধিপত্যাধীন অবস্থানে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে যে সুযোগ লাভ করছে তা শিখদের ক্ষেত্রে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। সুতরাং এই নীতিতে সংখ্যালঘু অধিকার দেওয়ার পেছনে সম-অধিকার, সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা
গ্রামাঞ্চলের বসত এলাকাতে চোখ রাখলে যে কোনো পর্যবেক্ষকের বসত অঞ্চলের এক প্যাটার্ন নজরে পড়বে। মিশ্র জনবিসতিপূর্ণ অঞ্চলেও অঘোষিত ডিমার্কেশন লাইন থাকে যে লাইনের এপার ওপারে সম্প্রদায়ভিত্তিক বসতবাটি থাকে। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বা সংকীর্ণ সম্পত্তি স্বার্থকে কেন্দ্র করে কোন দ্বন্দ্ব যদি বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপে সংঘাতের সংকট সৃষ্ঠি করে তাহলে এই ডিমার্কেশন লাইনগুলো ফল্ট-লাইনে রূপান্তরিত হয়। অনুন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় এই বিভাজনরেখা স্বাভাবিক হিসেবে সবাই মেনে নেয়। তবে উন্নয়নের এক সাধারণ দৃশ্যপট আমাদের নজর এড়িয়ে যায় না। জনগোষ্ঠীগত মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির উপর ভিত্তি করে নাগরিক সুবিধার তারতম্য গ্রামাঞ্চলেও চোখে পড়ার মত, যদিও বর্তমান সার্বিক আর্থ-সামাজিক সংকটকালে এই তারতম্য অনেকটাই আবছা হয়ে পড়ছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক সামাজিক দূরত্ব যখন ভারতের নগর সভ্যতায়ও প্রকটভাবে বিদ্যমান থাকে তখন বুঝতে অসুবিধে হয় না যে বিভাজন আমাদের সামাজিক পরিসরে কতটা গভীরে প্রোথিত। একদিকে নগরায়নের প্রকল্পের মধ্যেই এই বিভজনের বীজ নিহিত, অন্যদিকে আমাদের মানসিক দূরত্ব এই বিভাজনকে স্বীকৃতি প্রদান করে ঘেটো (ghetto)-সংস্কৃতির জন্ম দেয়। আমাদের শহর-নগরগুলির সামাজিক বিন্যাসের একটা প্রোফাইল যদি তৈরি করা যায় তাহলে এই বিষয়টি পরিষ্কার আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। দলিত-সংখ্যালঘুদের বাস সাধারণত শহরতলিতেই দেখা যায়। শহরের কমার্শিয়্যাল সেন্টার কিংবা মূল-শহরে গড়ে উঠা নতুন বসত অঞ্চলগুলিতে সামাজিক বাধা ও উন্নয়নের নীতি কসমোপোলিটান-কালচার গড়ে উঠার প্রধান অন্তরায়। মজুরি, রুজি-রোজগার কিংবা শিক্ষা-চাকুরির ইত্যাদির সন্ধানে শহরে আসা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর লোকরা শহরের পরিধিকে বিস্তৃত করে নতুন বসত অঞ্চল গড়ে তুলছে, কিন্ত এই প্রব্রজন বিভাজন রেখাকে মুছে ফেলতে পারছে না। তার ফলে সাংস্কৃতিক বিভাজন এক নতুন আধুনিক রূপ পরিগ্রহ করছে। কাঠামো ও উপরি-কাঠামোয় যুগপৎ বিদ্যমান স্তরীভূত বিভাজন যেমনি দলিতদের অপর করে দিয়েছে, ঠিক তেমনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এই কাঠামোর বাইরে রেখে দিয়েছে। এই কাঠামো যতটা শিথিল হয় ঠিক ততটাই সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে উঠে। আমাদের বৃহৎ নগরি যেমন নতুন-পুরোনো দিল্লি, নতুন-পুরোনো হায়দ্রাবাদ কিংবা আহমেদাবাদের নতুন বিস্তৃতির অঞ্চলগুলির জনবিন্যাস বিচার করলে সাংস্কৃতিক দূরত্ব কতখানি গভীরে এবং কারা ঘেটো-কালচারের বলি তা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। মুম্বাই’র বিশাল বিশাল ঝুপড়ি অঞ্চলে যে লাখ লাখ লোক বাস করেন তাদের অধিকাংশই দলিত, তাঁরা হয় পুরোনো বস্ত্রশিল্পের কাজ-হারানো শ্রমিক কিংবা কাজের সন্ধানে আসা নতুন শ্রমিক। বিচ্ছিন্নতার মাত্রার ও প্রভাব প্রতিপত্তির তারতম্য বাদ দিলে এই একই মানদণ্ড ভাষিক সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আসামের মুণ্ডারি-সাঁতালি-কুর্মালি-সাদরি ভাষীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যেমনি কোনো জায়গা নেই, আমাদের সামূহিক সাংস্কৃতিক চর্চায়ও তাঁরা অনুপস্থিত। অন্যান্য নিতান্তই সংখ্যালঘু ভাষিক জনগোষ্ঠীদের অবস্থাও তথৈবচ। বাঙালিরা ঐতিহাসিক কারণে এই অধিকারগুলির অনেকটাই আদায় করে নিতে পারলেও, এখনও তাদের বিনা বিচারে যেতে হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে।
এধরনের বিচ্ছিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক দ্বীপগুলি থেকেই এই জনগোষ্ঠীগুলো নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচিতি রক্ষা ও বিকাশের আওয়াজ তুলে। এই আওয়াজগুলিকে দমিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মধ্যেই নিহিত বৈচিত্র্যের প্রতি আঘাত ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকৃতির রহস্য। তথাকথিত আধুনিকতার সবধরনের খবরদারি দূরে ঠেলে এই আওয়াজগুলিকে জনগোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তর থেকে উঠে আসার পরিসর তৈরি করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এই মূল্যবোধের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্তর্বস্তু হওয়া বাঞ্চনীয়। যাহা বিদ্যমান তাহাই যদি আধুনিক হয়, তাহলে বৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও বিকাশকে সুনিশ্চিত করাই আজকের আধুনিকতার পরম কর্তব্য।      
সংখ্যালঘু সমস্যা ও সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
উপরের আলোচনায় দু’টি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। শুধুমাত্র সংখ্যার বিচার করে সংখ্যালঘু মর্যাদা নির্ধারণ করা মুষ্কিল এবং স্থান-কাল ভেদে সংখ্যালঘু অধিকারের স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন। ২০০৬ সালে জাস্টিস সাচার কমিটি ও ২০০৭ সালে রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন সংখ্যালঘু প্রশ্নে রিপোর্ট প্রদান করে। প্রথম রিপোর্ট থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিদারুণ দূরবস্থার কথা আমরা জানতে পারি এবং দ্বিতীয় রিপোর্ট সংখ্যালঘুর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনসংখ্যা অনুপাতে সংরক্ষণের সুপারিশ করে। সম্প্রতি কুণ্ডু কমিশনও অনুরূপ রিপোর্ট পেশ করেছে। একথা আমাদের বোঝা উচিত যে ভারতীয় বৈচিত্র্যকে যদি সঠিক অর্থে স্বীকৃতি প্রদান ও প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তাহলে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। সংখ্যালঘুর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সংখ্যাগুরুর গণতন্ত্র প্রসারিত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে সংখ্যালঘুর যে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠা গণতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে এক একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত, যেমনটি হয়েছিল স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সংবিধান রচনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই একেকটি পদক্ষেপ সংখ্যালঘু সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে অপারগ হওয়ায় যে কোন প্রতিক্রিয়াশীল আক্রমণের মুখে কিংবা কোনো রেডিক্যাল দাবির মুখে ভারতীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থা অসহায় হয়ে পড়ে। সুতরাং একটা সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সংখ্যালঘু তথা ভারতীয় বৈচিত্র্যের প্রশ্নকে বিচার করতে হবে এবং এর সমাধানের উপায় নির্ধারিত করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল গণতান্ত্রিকীকরণ ও জনগণ-কেন্দ্রীক নতুন উন্নয়ণের মডেল ছাড়া এই সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
সাংবিধানিক ঘোষণা অনুযায়ী ভারতীয় রাষ্ট্র একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, কিন্তু অন্তর্বস্তুতে এটি এককেন্দ্রিক। ভাষাভিত্তিক রাজ্যগঠন এই এক কেন্দ্রীকতাকে খানিকটা দুর্বল করলেও নীতি নির্ধারণের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে। কেন্দ্রের অধীনে রাজ্যগুলির ক্ষেত্রেও এককেন্দ্রিকতার এই অন্তর্বস্তু বিদ্যমান। যারফলে সর্বভারতীয় কিংবা রাজ্যের এই ক্ষমতার কেন্দ্রে যে জনগোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম তাদের স্বার্থ, মতামত, ভাষা-সংস্কৃতি রাষ্ট্র-পরিচালনার জন্য নীতি প্রণয়নে অধিক গুরুত্ত্ব পায়। সুতরাং আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকেই ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন। কীভাবে?
প্রথমতঃ উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ক্ষমতার যে বিন্যাস, যে বিন্যাসে উপরের ক্ষমতাবানরা নীচের স্তরে ভাগ-বাটোয়ারার এক দালাল নেটওয়ার্ক তৈরি করার সুযোগ পায় তাকে উল্টে দিয়ে তলা থকে উপরের দিকে ক্ষমতার বিন্যাস করতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্র হতে হবে পঞ্চায়েত কিংবা মিউনিসিপাল অথরিটি। নীচের সেই স্তর থেকে সাধারণ বিষয়গুলি একে একে উপরের দিকে বিন্যস্ত হবে। মূদ্রা, পররাষ্ট্র, সর্ব-ভারতীয় যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় ছাড়া বাকী সব বিষয়ের বেকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। নির্দিষ্ট এলাকায় যে সব জনগোষ্ঠীর বসত নেই এবং বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাদের জন্য জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণের বিধান রাখতে হবে। সব জনগোষ্ঠী যাতে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে ক্ষমতার সমান অংশীদার হতে পারে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এসমস্যার অনেকখানি সমাধান করতে পারবে। আলাপ-আলোচনা ও সহমতের ভিত্তিতে যাতে নীতি নির্ধারণ করা যায় তার উপর গুরুত্ত্ব দিতে হবে, তাতে যুক্তির বিচারে কোনো প্রগতিশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হলেও আখেরে লাভ হবে ও গণতন্ত্র বিকশিত হবে। জনগণের ক্ষমতায়ন করার জন্য জনপ্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনার অধিকার দিতে হবে এবং জনমত যাচাইয়ের জন্য গ্রামসভা, মহল্লাসভা, ফ্যাক্টরি সভা, ওয়ার্ড সভা এবং সর্বোপরি গণভোটের উপর গুরুত্ত্ব আরোপ করতে হবে, এব্যাপারে এলিটিস্ট ধারণার বশবর্তী হয়ে জনগণের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভয়ে এগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। কারণ ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণ নতুন সমাজ গড়ার দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে, এলিটিস্ট হুকুমবাদী পরিচালনায় যা এতাবৎ ব্যাহত হয়ে আসছে। উন্নয়ণের ক্ষেত্রেও বিদেশি পুঁজি-নির্ভর ‘গ্রোথ-অনলি’ মডেলের বিপরীতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মিডিয়াম শিল্পের উপর গুরুত্ত্ব আরোপ করতে হবে যেখানে রাষ্ট্রের মদতে জনগণ তার শ্রমের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উপলব্ধ ক্ষুদ্র পুঁজিকে কাজে লাগাতে পারে। শুধুমাত্র এই অর্থনৈতিক মডেলের মধ্যেই থেমে থাকলে চলবে না, কারণ এমন এক অর্থনৈতিক ভিত্তি রচনা করতে হবে যা উপরের রাজনৈতিক কাঠামোর অনুকূল। শ্রম-সমবায়ের মালিকানা ও একে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। ব্যক্তি-শ্রমিকের আয় বৃদ্ধির প্রয়াস যাতে সমবায়ের সব সদস্যের আয়বৃদ্ধির অধীন হয় তারজন্য শ্রমিকের যৌথ মূল্যবোধ গড়ে তোলার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে যাতে সমবায়িক উৎপাদনের কোনো সংকটকালে শ্রমিক-সদস্য সংখ্যা কমানো না হয়, একইসাথে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নতুন শ্রমিকদের পরিচালনায় উৎপাদনী উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে যাতে বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি না ঘটে ও নতুন নতুন ক্ষেত্রকে আধুনিক উৎপাদনী ব্যবস্থার অধীনে আনা যায়। এধরনের পরষ্পর পরিপূরক এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া পূর্ণ গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বজায় রাখা যাবে না। এভাবেই জনগণ দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব যেখানে সংখ্যা কিংবা আর্থিক-সামাজিক মানদণ্ডে কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীই নিজেদেরকে শোষিত বঞ্চিত বলে ভাববে না। এভাবেই ভবিষ্যত সমাজের এক সাদামাটা রূপরেখা তৈরি করা যায় যা জনগণের সৃজনশীল অংশগ্রহণে আরও বিস্তৃত ও অর্থবহ রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। কর্মক্ষত্রে দায়িত্ববোধ নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের একথা বোঝা উচিত যে মানুষ যখন শুধুমাত্র নিজের জন্য ও নিজের পরিবারের জন্য নয়, নিজের স্বার্থে কাজকে যখন সচেতনভাবে জাতির জন্য-দেশের জন্য ও মানব সমাজের জন্য কাজ করছে বলে ভাবতে শুরু করে তখনই কাজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। বর্তমান ব্যবস্থায় সংকীর্ণ পরিসরে এই বোধ জাগ্রত থাকে, বৃহত্তর পরিসরে এই বোধকে জাগ্রত করার জন্য চাই নতুন ব্যবস্থা যেখানে মানুষ ব্যাপক সমষ্ঠি স্বার্থের কথা ভাবতে পারে। বর্তমানে গণতান্ত্রিক ফেডারেলিজমের ও বৈচিত্র্যের উপর যে আক্রমণ নেমে আসছে তা উৎপাদন ও এর সাথে যুক্ত বন্টন ব্যবস্থার দ্রুত বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত।    

এ তো গেল ভবিষ্যত সমাজের কথা। কিন্তু এখনই আমাদের সামনে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই যে যেটুকু সাংবিধানিক গণতন্ত্র স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা আজ ভূলুণ্ঠিত হতে চলেছে। উগ্র-সাম্প্রদায়িকতাবাদ, উগ্রজাতিয়তাবাদ ও বর্ণবাদ ভাষিক-ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও দলিতদের সমস্ত অধিকার হরণ করতে উদ্যত হয়েছে। রাজ্যের হাতে থাকা ক্ষমতাগুলি প্রতিনিয়ত হরণ করা হচ্ছে। বেসরকারিকরণের মাধ্যমে রাজ্যের হাতে থাকা সম্পদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, আয়ের পুনর্বন্টনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের মর্জিকে দেওয়া হচ্ছে অধিক গুরুত্ত্ব, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মত পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলির যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিধান ছিল তা তুলে নেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতাহীনতার মূল সূত্রই হচ্ছে মুষ্ঠিমেয়ের হাতে সবার উন্নয়নের দায়িত্ব সঁপে দেওয়া, উপনিবেশিক যুগে আলোকপ্রাপ্ত ইউরোপিয়ানদের হাতে আমরা যেভাবে দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিলাম। এমতাবস্থায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য ভারতবর্ষের সাংবিধানিক ফেডারেলিজমকে রক্ষা করার মাধ্যমে সংখ্যালঘু অধিকার প্রতিষ্ঠা আশু কর্তব্য হিসেবে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আশু ও সুদূর-প্রসারী লক্ষ্যে নির্ধারিত কর্মসূচীর মাধ্যমেই জনগণ সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরুর বিরোধহীন এক নতুন সমাজ, নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে।







   

EPW article : JNU episode and the popular discourse on history

Posted by স্বাভিমান


Democracy and the Popular Discourse on History

Arup Baisya (swabhiman.ngo@gmail.com) is a social activist based in Silchar, Assam.
The people of India are disillusioned. The present phase of neo-liberal capitalism, and the changes that it spells, do not take into account the vertically and horizontally disintegrated working class and the structurally remodelled castes-communities. The Jawaharlal Nehru University debate around the constitutional right to speak only re-emphasises the fact that if we wish to stall the rise of fascism, the past needs to be reconstructed as a paradigm for the future.
The debate that revolved around the arrest of Kanhaiya Kumar, the Jawaharlal Nehru University Students’ Union (JNUSU) president, and other student leaders on sedition charges raised more questions than answers. Though the central theme of this debate is the constitutional right to speak, the moot question is how the future of India, rooted in the present, articulates the past. Thus, the discourse on the history of the Indian past in popular political parlance gets constantly constructed and reconstructed with a vision to the future. This is bound to happen because the history of the Indian past, like the socio-historical past of mankind, is not fixed, one-dimensional and completely knowable for all.
Meaning of the Present
The aggressive state intervention to scuttle the effort of the Jawaharlal Nehru University (JNU) students to open up a space for multiple voices, and the high-handed approach of the Rashtriya Swayamsevak Sangh (RSS) bandwagon to muzzle alternative voices to their Hindutva-vadi nationalist narrative generated a vibrant debate within the educated class. But the reasoned argument, which is essential for safeguarding and promoting democracy, cannot be sustainable without linking it to the Indian past with a view to formulating a future plan of action. In this framework, the participation of the left in this debate fails to catch the imagination of the popular psyche and leaves the space open for obscurantist forces to take over. Whether the progressive or regressive characteristics of the Indian past will be reconstructed is squarely dependent on the future project envisioned in the present.
The meaning of the present is used as a key to unlock the meaning of the past leading to the present, which in its turn, unlocks formerly unidentified dimensions of the present leading to the future not in the form of rigid mechanical determinations but as anticipation of aims linked to a set of inner motivations. Thus, we are involved in a dialectic movement which leads from the present to the past and from the past to the future. In this movement the past is not somewhere there, in its remote finality and ‘closure,’ but right ‘here,’ ‘open’ and situated between the present and the future (Mészáros 2013: 68).
People are disillusioned with the present state of affairs. But there cannot be any change without a radical break from the present; without a structural discontinuity. Without a conscious desire for change, a discontinuity within the framework of structural continuity may be projected as a change to misguide the collective unconscious. On this count the RSS has a mission to change the state’s character based on religious nationalism within the crisis-ridden capitalist structure. Mutatis mutandis, the left appears to be playing within the same arena without having any alternative plan. The mainstream left nowadays claims its commitment to secure the idea of Akhand Bharat that negates the principle of the “right to self-determination.” Its selective opposition to the neo-liberal reform agenda does not entail an alternative vision for a future beyond neo-liberal capitalism. The undertaking of secularism, which is construed within the framework of truncated democracy and the societal imbalances caused by neo-liberal onslaught, is not qualitatively different from the secularism of the United Progressive Alliance (UPA) variety, with which people are so disillusioned. Participating in the JNU debate, the Communist Party of India (Marxist) (CPI(M)) leader Sitaram Yechury expressed vainglory in his Rajya Sabha speech for upholding the concept of Akhand Bharat in his JNU days. It becomes difficult to assess whether it is a defensive stance or principled stand.
Future That Articulates the Past
The popular perception of our past is always based on a derivative discourse. One always looks back to his past to envision a future. The British introduced communal historiography in India. This historiography is a way of looking at the historical phenomenon through the lens of religion. The RSS has mastered the art of propagating our past derived with the instrument of religious doctrine for a future project of an authoritarian state. Their concept of an authoritarian state is projected as a mythical “Ramrajya,” a change based on the Hindu Yuga division of time for popular acceptance. This historiography catches the imagination of collective unconscious when the system itself is in deep crisis in absence of a popular discourse on historiography that envisions a future from a working class perspective.
It needs to be emphasised that today, for state-of-the-art historical understanding anywhere in the world where South Asia is being studied, the assumption of Savarkar or Golwlajar would appear so absurd as hardly worth refutation or debate. Irrespective of their other differences, historians of all trends, liberal, nationalist, the erstwhile ‘Cambridge’ school, Marxist of diverse kinds, late-subalterns, feminist, post-or anti-modernists—would all agree that the essentialised assumptions of Hindus and Muslims being homogeneous, continuous blocs across time and subcontinental space, with Muslims as a community ruling Hindus in the medieval centuries, are totally unacceptable (Sarkar 2004: 254).
Despite this being the fact, the RSS variants of historical interpretation are catching the imagination of the people in this neo-liberal phase of capitalism. Here, we have a coincidence in time in the ideologies of globalisation and liberalisation with the spectacular advance of Hindutva which requires much further explication. The spectacular advance of Hindutva is inevitable if the assertion of the oppressed caste/class, and for that matter the working class assertion against neo-liberal capitalism, is not articulated with a future project.
Based on this assertion of the under-privileged in the present milieu of neoliberal policy regime, our historical past can only be articulated with a vision for future. Therein lies the real process for the development of ideological and material force to combat the religious bigotry and authoritarian rule. The mainstream left parties with a doctrinaire mindset believe that the working class is a tabula rasa and that they only internalise verbatim the content that the left ideologue preaches. This mindset makes them defensive and compels them to gesticulate within the dominant world view to suppress the future.
As early as the Bernstein Debate it was clear that the opportunists had to take their stand ‘firmly on the facts’ so as to be able to ignore the general trends or else to reduce them to the status of a subjective, ethical imperative (Lukacs 1993: 182).
Facts are to be judged in a social context; the static representation of the past in the Hindutva-vadi discourse must be contested with a future project that does not invent the past, but articulates it.
Democracy and Justice
One of the reasons behind the rise of the Aam Aadmi Party (AAP) to power in Delhi with an overwhelming majority in the midst of a countrywide Hindutva-vadi wave was the popularly perceived notion that the citizens would have the opportunity to participate in the governance and decision-making process. The vote base of a section of the oppressed castes/communities adhered to their mentor Lalu Prasad Yadav, despite all his misdeeds, because of his politics of instilling a sense of self-respect and empowerment in daily mundane affairs. But this perceived notion is not sustainable if it is not transcended and institutionalised.
The rapidly changing canvas of discontent against the backdrop of neo-liberal onslaught from the powers-that-be makes the terrain of political discourse complicated. The discourse on comparative advantage of dirigiste Nehruvian model and notional participatory democracy and justice cannot match the changing mental wavelength of the vertically and horizontally disintegrated working class and structurally remodelled castes–communities in the present phase of neo-liberal capitalism. In the context of the present, the past needs to be reconstructed as a project for the future.
B R Ambedkar, who chaired the drafting committee that collated the new Indian Constitution for adoption by the Constituent Assembly shortly after Indian independence in 1947, wrote fairly extensively on the relevance, if any, of India’s ancient experiences in local democracy for the design of a large democracy for the whole of India (Sen 2010: 330).
But the bourgeoisie has no democratic mission of its own to ensure justice and participation of all citizens in policymaking, because the sole driving force and the motive of capitalism rests on ensuring profit and accumulation. The concept of bourgeois democracy is an offshoot of a compromise between the bourgeoisie and the working class to guarantee the capitalist hegemonic structure. The constitutional democracy was articulated in the situation after Indian independence in 1947. It needs to be transcended and rearticulated against the backdrop of the here and the now, because the determination from the past and the anticipation of the future converges into the present. All of this comes to life in a synthetic unity of the dialectical totalisation in which subjectivity and objectivity are inextricably fused.
A totalitarian state is one that suppresses the interplay of state and society, extending the sphere of its exercise to the totality of collective life. This necessitates a vision of history that abuses and hates dissent. On the contrary, demand for democracy is carried or concealed by the idea of a new society, the elements of which are being formed at the very heart of contemporary society. The Hindutva-vadi forces intend to transmit the historical facts taken out of its context with a view to stereotype the name “Muslim” and for that purpose, education needs to be confined to the deductive logic of Brahminical texts. This self-destructive tendency can be combated only by the process of transmitting the universality of knowledge. It is not a conflict between your Hindutva-vadi Akhand Bharat versus our secular Akhand Bharat.
Amartya Sen in his book The Idea of Justice emphasised that the excellent record of Athenian democracy of electoral governance had no immediate impact in the countries to the west of Greece and Rome; rather Indian vis-à-vis the Asian cities had incorporated this democratic practice. He further opined that while Athens certainly had an excellent record in public discussion, open deliberations also flourished in several other civilisations like India. This civilisational trait of democracy finds its resonance in the post-independence constitutional democracy. This constitutional democracy was formulated by the bourgeois class to accommodate all diverse interests that were unleashed during the long-drawn out freedom struggle.
But now against the backdrop of a deep structural crisis of global capitalism, this bourgeois class is trying to roll back the provisions of constitutional democracy which has become anathema to the neo-liberal policy drive. So, the content of democracy needs to be reconstructed with a linkage to the past from a working class perspective. That demands inclusion of absolute right to dissent including the right to secede and a decentralisation of power to the fullest extent so that people can participate in the decision-making process. Furthermore, the neo-liberal policy doctrine should be opposed in letter and spirit along with an alternative economic policy framework.
German Experience and Indian Fascism
After careful discussion of social origin, educational background, income differentials, organisational experience, and status consciousness, J Kocka concludes that American white-collar workers showed a much lower propensity to see themselves as a distinct class or status group superior and hostile to the working class. So while the white-collar workers turned to the Nazis in large numbers, their American counterparts joined manual workers in support of the New Deal (Dobkowski and Wallimann 1989: 75).
In addition to that, the fragmentation of the petty bourgeoisie and workers was influenced by religious and ethnic differences in Germany, the interventionist state emphasised the collar line and legally cemented the lines of differentiation, and a stratified educational system was put in place to restrict the mobility between manual and non-manual jobs. In Germany, the political culture was deficit of some essential ingredients of a modern bourgeois or civil society that was closely but inversely related to the strength of Germany’s pre-industrial and pre-bourgeois traditions. In the case of white-collar workers this created a much-ready support for the fascists.
Both Germany and Italy were societies experiencing accelerated capitalist transformation, through which entire regions were being visibly converted from a predominantly rural to a urban environment. The pace of social change outstripped the adaptive capabilities of the existing political institutions. In a situation of widespread political uncertainty, the existing political bloc of industrial, agrarian, and military–bureaucratic class took recourse to a new kind of radical nationalism, which stressed the primacy of national allegiances and priorities normally with heavily imperialist or social–imperialist inflection over everything else. The attraction of radical nationalism may be grasped partly from the ideology itself, which was self-confident, optimistic, and reaffirming. It contained an aggressive belief in the authenticity of German national mission, in the unifying potential of nationalist panacea, and in the popular resonance of the national idea for the struggle against the left. Radical nationalism was a vision of the future, not of the past. The dramatic conjuncture of war and revolution between 1914 and 1923 produced a crisis, which brought domestic unity, foreign mission, and territorial integrity of the nation into question. It was thus able to achieve popular appeal.
Though in many ways present-day India resembles the German phenomena, there are new criteria too. Not only is capitalism in deep crisis, the neo-liberal policy drive has also failed to mitigate this crisis situation. After the post-independence period of uneven and combined development process, and especially after the neo-liberal policy drive, the relation of production has undergone a drastic change. The pressure group of organised labour in the public sector has been dismantled to a large extent due to privatisation and contracualisation. The rapid urbanisation and conversion of the rural masses into wage labour has also reconstructed the caste/class dynamics. Now unorganised urban and rural labour constitutes the largest chunk of the workforce. The pursuit of a neo-liberal jobless growth model has led to increased and growing unemployment. In the absence of a left agenda to address the contested terrain of popular democratic aspirations, this working class is amenable to fall prey to the most telling political intervention of fascist right.
The Alternative
The proponents of liberal secular democracy are advocating Keynesian economy, but they are confining themselves only within the demand management instead of dwelling on the most radical aspect of Keynesian economy. Keynes foresaw a stage when fiscal and monetary stimuli alone would not suffice to increase investment sufficiently:
Then a somewhat comprehensive socialisation of investment will prove the only means of securing an approximation to full employment; though this need not exclude all manners of compromises and of devices by which public authority will co-operate with private initiative (Desai 2013: 60).
With the legitimacy of left politics at its nadir, a new institutional democracy reconstructing the civilisational democratic practices and an alternative economy challenging the neo-liberal policy needs to be projected from a working class perspective to address the popular democratic aspirations. The rise of fascism can only be stalled by an oppositional unity based on this premise. The UPA variant of a rainbow coalition of all oppositional forces conceptualised within the framework of neo-liberal policy may not be able to stop the fascist juggernaut once and for all.
References
Desai, Radhika (2013): Geopolitical Economy, After US Hegemony, Globalisation and Empire, London: Pluto Press.
Dobkowski, Michael N and Isidor Wallimann (ed) (1989): Radical Perspectives on the Rise of Fascism in Germany, 1919–1945, Kolkata: Cornerstone Publications.
Lukacs, Georg (1993): History and Class Consciousness, New Delhi: Rupa.
Mészáros, István (2013): The Work of SartreSearch for Freedom and the Challenge of History, New Delhi: Aakar Books.
Sarkar, Sumit (2004): Beyond Nationalist Frames: Relocating Postmodernism, Hindutva, History, New Delhi: Permanent Black.
Sen, Amartya (2010): The Idea of Justice, New Delhi: Penguin Books.

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন