Showing posts with label অরুণোদয়. Show all posts
Showing posts with label অরুণোদয়. Show all posts

অরুণোদয়:জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , , ,

রুণোদয় শিলচর শহরের প্রাচীনতম পত্রিকা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুনীল দত্তরায়। গেল এক দশকের বেশি সময় জুড়ে এর সম্পাদনা করছেন চন্দন সেনগুপ্ত। এখানে আপনা   পড়তে পাবেন এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা। 
     
    এতে "নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং আসামের রাজনীতি' শিরোনামে রয়েছে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক অরূপ বৈশ্যের  একটি লেখা, "আধারঃ দেশবাসীকে কব্জায় রাখার একটি অমোঘ কৌশল' লিখেছেন সুমন সেনগুপ্ত, সুশান্ত করের অনুবাদে বেরোচ্ছে দিগন্ত শর্মার ধারাবাহিক  "১৯৮৩র অসম---নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু' । এবারে এর শেষ অধ্যায়। এ ছাড়াও রয়েছে নিয়মিত কিছু সংগ্রাম সংবাদ প্রতিবেদন।
            
                  হয়তো, আপনার এটি পড়তে ফ্লাসপ্লেয়ার দরকার পড়তেও পারে। নামিয়ে নিন এখান থেকে।  মোবাইলে পড়বার জন্যে স্ক্রাইবড এপ দরকার পড়তে পারে। ছবিতেও পড়তে পারেন। ক্লিক করে বড় করে নিন।  একেবারে নিচে রইল।   















অরুণোদয়:সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৭ সংখ্যা

Posted by স্বাভিমান Labels: ,



          রুণোদয় শিলচর শহরের প্রাচীনতম পত্রিকা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত সুনীল দত্তরায়। গেল এক দশকের বেশি সময় জুড়ে এর সম্পাদনা করছেন চন্দন সেনগুপ্ত। এখন থেকে আমরা চেষ্টা করব এর প্রতিটি সংখ্যা স্বাভিমানে তুলে দিতে। শুরু শুরুতে সামান্য প্রযুক্তি গত অসুবিধের জন্যে কোথাও কোথাও পাঠ পড়তে অসুবিধে হবে, কিন্তু আমরা আশা করব অচিরেই সেটি দূর করতে। মাঝে মাস কয় বেরোয় নি, এখানে আপনারা পড়তে পাবেন এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৭ সংখ্যা। 

           এতে "সমাজবাদের ভবিষ্যত' শিরোনামে রয়েছে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ভাস্কর নন্দীর একটি লেখা, "রোহিঙ্গা সমস্যা এবং বর্তমান অবস্থা' লিখেছেন সিদ্ধার্থ দত্ত, "নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল--২০১৭' শিরোনামে লিখেছেন তানিয়া লস্কর, সুশান্ত করের অনুবাদে বেরোচ্ছে দিগন্ত শর্মার ধারাবাহিক  "১৯৮৩র অসম---নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু' । এ ছাড়াও রয়েছে নিয়মিত কিছু সংগ্রাম সংবাদ প্রতিদেবন।



হয়তো, আপনার এটি পড়তে ফ্লাসপ্লেয়ার দরকার পড়তেও পারে। নামিয়ে নিন এখান থেকে।  মোবাইলে পড়বার জন্যে স্ক্রাইবড এপ দরকার পড়তে পারে।  পিডিএফে পড়তে পারবেন না, তাদের জন্যে ছবিতেও রইল। দুবার ক্লিক করুন। ছবি বড় হয়ে যাবে, পড়তে পারবেন। 



















শ্রমিক শ্রেণির উদ্দেশ্যে বিপ্লবী প্রস্তুতির আহ্বান জানানোর সময় সমাগত

Posted by স্বাভিমান Labels: , ,


(অরুণোদয় সম্পাদকীয়)

       
    ভারতীয় সমাজে অসাম্যের কদর্য চেহারা প্রকাশ করেছেন দুই স্বনামধন্য লেখক। ‘একুশ শতকের পুঁজিবাদগ্রন্থের লেখক থমাস পিকেটি ও তাঁর সহযোগী লুকাস চ্যান্সেলের ভারতীয়দের আয়ের অসাম্য, ১৯২২-২০১৪শীর্ষক পেপার প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে উপরের ১% লোকের আয়বৃদ্ধি দেশ হিসেবে ভারতবর্ষে সর্বোচ্চ এবং তা ১৯৮২-৮৩ সালের ৬.২% থেকে বেড়ে ২০১৩-১৪ সালে ২১.৭%-এ দাঁড়িয়েছে যা ব্রিটিশ আমলের সর্বোচ্চ রেকর্ড ১৯৩৯-৪০ সালে ২০.৭% থেকেও বেশি। ১৯৮০-২০১৪ সালের মধ্যে জনসংখ্যার নীচের ৫০%-এর ৮৯%, তারপরের ৪০%-এর ৯৩%, জনসংখ্যার উপরের ১০%, ১%, ০.১%, ০.০১% ও ০.০০১%-এর আয়ের বৃদ্ধি ঘটেছে যথাক্রমে ৩৯৪%, ৭৫০%, ,১৩৮%, ,৮৩৪% ও ২,৭২৬%। আশির দশক থেকে আমাদের দেশে যে উদারবাদী নয়া আর্থিক নীতি চালু হয়েছে এর সাথে এই অসাম্য বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
             অন্যদিকে, ১১৯টি দেশের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটবিশ্ব ক্ষুধা সূচকের ফল প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে ২০১৪ সালেও বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে গোটা বিশ্বে ভারতের স্থান ছিল ৫৫। ২০১৬-য় সূচক নেমে আসে ৯৭-এ। আরও এক বছরের মধ্যে তা নেমে এল ১০০য়। ব্রিকস-ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে ভারতের স্থান সর্বনিম্ন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাক, কিম জং উনের উত্তর কোরিয়া, প্রতিবেশী নেপাল বা বাংলাদেশের নীচে নেমে গিয়েছে ভারত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। ধনী ও ব্যক্তি মালিকদের স্বার্থে রচিত ভারত সরকারের আর্থিক নীতির এ এক করুণ পরিণতি।
             দেশপ্রেম ও স্বদেশী অর্থনীতির কুচকাআওয়াজের আড়ালে ভারতবর্ষের সরকার কর্পোরেট দুনিয়ার নির্ধারিত উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করে আসছে। ইউপিএ জমানায় উদারনীতি ও কল্যাণনীতির মধ্যে যে সামান্য টানাপোড়েন ছিল, এনডিএ জমানায় তা একেবারেই উবে গেছে। আর্থিক সংস্কার কর্মসূচীর জয়গানে দিল্লির ক্ষমতার করিডোর উল্লসিত। এই উন্নয়ন মডেল ভারতবর্ষের নিজস্ব শিল্প বিকাশের পথকে করেছে অবরুদ্ধ, কৃষিনির্ভর ভারতীয় সমাজকে করেছে বিপর্যস্ত।
               লেনিন শিল্প পুঁজি ও বিত্ত পুঁজির (ব্যাংকিং পুঁজি) সম্পর্ক, একচেটিয়া মালিকানা ও পুঁজিবাদের সর্বশেষ রূপ সাম্রাজ্যবাদকে দেখেছিলেন। কিন্তু বহুবিধ ইনস্ট্রুম্যান্টের মাধ্যমে বিত্ত পুঁজির নিজস্ব বাজারের এতো ব্যাপক বিকাশ, বিশাল ও মিটিওরিক স্পিডে বিশ্ববাজারে ঘোরাফেরা করা বিত্ত পুঁজির নিজস্ব বিনিয়োগ অভূতপূর্ব। এই বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে না, অথচ ব্যক্তি মালিক বিনিয়োগকারীদের কাছে জমা হয় মুনাফার পাহাড়। এই মুনাফা আসে বাজারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আয়ের অর্থ পুঁজিপতিদের হাতে সঞ্চালিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই প্রক্রিয়ার উপর রাষ্ট্র ও সরকারের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭১ সালে মুদ্রার বিনিময় নীতিতে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড উঠিয়ে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের বিশ্ব আধিপত্য সুনিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এবং এরপর সবকটি দেশকে তাদের নিজস্ব ফিনান্স সেক্টরের উপর নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে দিতে বাধ্য করে। বর্তমানে মার্কিন ডলারের বিশ্ব আধিপত্য আবার চ্যালেঞ্জের মুখে। বহুবিধ মুদ্রা তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে সচেষ্ট রয়েছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জটি আসছে চীনের কারেন্সি ইউয়ান বা রেনমিনবি থেকে। বিশ্বজোড়া যে এক যুদ্ধের পরিবেশ ও প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব আধিপত্য বজায় রাখার আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিটের আর্থিক নীতির ব্যর্থতা।
                মানবসভ্যতা প্রত্যক্ষ করেছে কীভাবে নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার দেশে দেশে শিল্পদ্যোগ গড়ে তুলেছে, কীভাবে স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কার ভৌগোলিক বাধা অতিক্রম করে জাতিতে জাতিতে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে, কীভাবে মানুষের জন্য কর্মসংস্থান গড়ে তুলেছে। উৎপাদনের সাথে ক্রমাগত জীবন্ত শ্রমিকের সংযোগ স্থাপন সুনিশ্চিত করেছে পুঁজির মুনাফা ও সঞ্চয়ন। বিগত কয়েক দশকে প্রযুক্তির দুনিয়ায় অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে। নতুন প্রযুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে অটোমেশনের ফলে শ্রম সংকোচন ঘটছে তীব্র গতিতে। সাইবারটেনিকসের পর এসেছে রবোটিকস। চালকবিহীন গাড়ি চালু হচ্ছে ও রবোটের মাধ্যমে বৈদ্যুতিন লাইন মেরামতির মত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের সিটিগুলিতেও এ দৃশ্য আগামী দিনে হয়ত দেখা যাবে।
            স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে কৃষক বিদ্রোহ বিশেষ করে সত্তরের দশকের কৃষক বিদ্রোহের ফলে ১৯৭২ সালে জমির সিলিং নিয়ে জাতীয় নির্দেশিকা জারি হয়। ভারতবর্ষে সীমিত হলেও ভূমি সংস্কার হয়েছে, কৃষি মজুরের উপস্থিতি বৃদ্ধি ঘটায় বৃহৎ পুঁজিপতিরা পুঁজিবাদী কৃষি ফার্ম গড়ে তোলার ইচ্ছা ব্যক্ত করে সত্তরের দশকেই, সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষিতে যে আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার শুরু হয় তা বর্তমানে ব্যাপক আকার নিয়েছে, কৃষি সরঞ্জাম সরবরাহ ও উৎপন্ন সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ কমে গেছে এবং এই দুই ক্ষেত্রেই ঘটেছে বহুজাতিক কর্পোরেটদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ, রপ্তানিযোগ্য ক্যাশ ক্রপ উৎপাদনে ও খাদ্য সামগ্রী ছাড়া অন্যান্য কৃষি উৎপাদনেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কৃষি সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সহায়তার অভাবে ভাগচাষ হয়ে পড়েছে অলাভজনক, মাঝারি কৃষকদের একাংশ কৃষি ফার্মের দিকে ঝুঁকছেন ও বড় অংশ কৃষি উৎপাদন থেকে অন্য পেশায় সরে যাচ্ছেন বরাক উপত্যকার মত পিছিয়ে পড়া অঞ্চলেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চুক্তি প্রথায় চাষের মদত দিচ্ছে বৃহৎ বহুজাতিক কর্পোরেট এই প্রবণতা আরও গতি পেয়েছে খুচরা বাজারও কর্পোরেটদের দখলে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। প্রাকৃতিক সম্পদ, সম্পত্তি ও নির্মাণ সেক্টরে বিশ্বপুঁজির বিনিয়োগের প্রবণতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক কৃষক ও নগরায়ণের মাধ্যমে শহুরে আন্ডার-ক্লাস ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ হচ্ছেন। এভাবে তৈরি হচ্ছে এক ব্যাপক গ্রামীণ ও শহুরে শ্রমিক বাহিনী ও প্রব্রজিত শ্রমিক এবং একইসাথে তৈরি হচ্ছে শ্রমিকদের রিজার্ভ আর্মি। এভাবে বহুবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাইরের চাপে বদলে যাচ্ছে উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক। বহুজাতিক পুঁজির ও বাজারের উপর নির্ভরশীল জমিদার পুঁজিপতি, কৃষক পুঁজিপতি ও ক্ষুদ্র কৃষক ও ব্যাপক কৃষি মজুর এটাই হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থার প্রধান দিক। প্রতিটি সংকটকালে পুঁজির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালু হয়। নয়া উদারবাদী পুনর্গঠনের ফলে সংগঠিত শ্রমিকদের ক্ষেত্র ভেঙে যাচ্ছে, জন্ম নিচ্ছে প্রতিটি অঞ্চল প্রতিটি জাতির মধ্য থেকে ব্যাপক অসংগঠিত শ্রমিক বাহিনী। এর প্রভাব পড়ছে পরিচিতির আন্দোলনগুলোতেও।
            বিগত দশকগুলোতে ভারতবর্ষে ও গোটা বিশ্বে যে পরিচিতির আন্দোলন জন্ম নিয়েছিলো সেগুলির অবস্থা কী? সেই আন্দোলনগুলি পরিচালিত হচ্ছিল মূলত মধ্যশ্রেণির নেতৃত্বে এবং আম জনতা তাদের আহ্বানে সামিল হচ্ছিলেন। এই আন্দোলনগুলি এখন ভাঁটার টানে। কিন্তু পরিচিতির গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্তর্বস্তুর নিষ্পত্তি হয়ে যায়নি। এই সংগ্রাম জাগ্রত হবে শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ও শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে। 
                  বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন ভারতীয় অর্থনীতি তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। বিগত প্রায় তিন দশক থেকে জবলেস গ্রোথের পর্যায় চলছে ক্রমাগত। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে ব্যক্তি পুঁজির বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সম্ভাবনাও ক্ষীণ,পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কে অর্থের যোগান দিয়ে ধার দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর সরকারি পদক্ষেপ কতটা উৎপাদনী বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হবে তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। একদিকে ব্যাপক কর্মহীনতা ও অন্যদিকে ভারতীয় গণতন্ত্রে ভোগ করে আসা যেটুকু সামাজিক নিরাপত্তার ও আয়ের গ্যারান্টি ছিল তাও হারাচ্ছে কর্মরত শ্রমিক শ্রেণি। উৎপাদনের সাথে জীবন্ত শ্রমিকের সংযোগ স্থাপনের সুযোগ সংকুচিত হওয়া একদিকে যেমনি পুঁজির সংকট ডেকে এনেছে, অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণিকেও করে তুলছে অস্থির। এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজ ও রাজনীতিতে। বহুধা বিভক্ত শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করার ও শ্রমিক শ্রেণির উদ্দেশ্যে বহুজাতিক কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত করার বিপ্লবী প্রস্তুতির আহ্বান জানানোর সময় সমাগত।


           







            

            





            

বর্তমান প্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদের বিপদ : সম্পাদকীয় নিবন্ধ – অরুণোদয়

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , ,




(সম্পাদকীয় নিবন্ধ – অরুণোদয়)

(C)Image:ছবি
দেশবাসীকে ‘সত্য ভাষণ’ ও ‘দেশপ্রেমের’ পাঠদানের মহড়া চলছে দেশজুড়ে। ‘সত্য ভাষণের’ তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এক, ইন্দ্রীয় গ্রাহ্য সবকিছুকেই সত্য বলে ধরে নিও, যুক্তির কাঠামোয় একে বিচার করে দেখার জন্য মস্তিষ্ককে ব্যবহার করো না, লাল রঙকে লাল ও গেরুয়াকে কেন গেরুয়া বলে দেখো সে প্রশ্ন উত্থাপন করো না অর্থাৎ একধরনের ‘অ্যানিমেল ইনস্টিংকট’ দিয়েই সত্যকে আবিষ্কার করো। দুই, বারংবার উচ্চস্বরে উচ্চারিত তথ্যকে বিনাপ্রশ্নে সত্য বলে ধরে নিও, তিন, ষাঁড় যেমন লাল রঙ দেখলেই উত্তেজিত হয়ে উঠে, সেরকম ‘সত্যসাধকদের’ উত্তেজিত ষণ্ড-ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করো। অনুরূপভাবে ‘দেশপ্রেমের” পাঠদানেরও তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এক, দেশের ভূখণ্ডের প্রতি চরম প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রকাশ করো, যারা এই আনুগত্য দেখাবে না তারা দেশবাসী হলেও তাদেরকে কোতল করে দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করো, কিন্তু অন্য দেশের সার্ব্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হলে এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে বলে ধরে নিও। দুই, অপরকে ঘৃণা করতে শিখো, তিন, রাষ্ট্র যা বলে তাকেই বেদবাক্য জ্ঞানে মেনে নিও এবং যুদ্ধ ও সৈনিক-আত্মত্যাগের মানদণ্ডকে দেশেপ্রেমের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে জ্ঞান করো।

উপরোক্ত এই একমাত্রিক ধারণা সকল ধরনের প্রতিষ্ঠান ও তার পরিচালকদের অসংবেদনশীল ও অমানবিক করে তোলে এবং যার ফলে রোহিত ভেমুলার মত ছাত্রদের হতাশা ও কান্না তাদের কর্ণগোচর হয় না, অকালে মৃত্যু বরণ করেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়, তারপরও নির্লজ্জের মত রোহিত ভেমুলা দলিত ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়। এই ধারণার বশবর্তী হয়েই জেএনইউ’র কতিপয় ছাত্রের বিচ্ছিন্নতাবাদী শ্লোগান দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে ভারতীয় রাষ্ট্র-বাহিনী ও ‘দেশপ্রেমিক’ সর্দারেরা। মত প্রকাশের ও স্বাধীন বিতর্কের যদি কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে শুধু স্তাবকরাই কথা বলে, কথা বলার সীমা লঙ্ঘনের ভয়ে বিরোধী মতাবলম্বীরা তটস্থ থাকে, আর নেতা ও পরিচালকরা স্তাবকদের দেওয়া তথ্য ছাড়া আর কিছুই জানতে পারেন না। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এধরনের পরিবেশ জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে এক ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাহীনতার এরকম পরিস্থিতিতে ১৯৪৩-এর বাংলার মন্বন্তরের ২৫ লাখ মানুষের মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়নি, ১৯৫৮-৬১ সালে চীনের দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ কোটি লোকের মৃত্যুর খবর চীনা কম্যুনিস্ট পার্টীর সদর দপ্তর জানতে পায়নি, তার কারণ যে গণতন্ত্রহীনতা সেকথা মাও যে দঙ পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন। আমাদের দেশে বর্তমানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা নিয়ে যারা ঢোল পেটাচ্ছে তারা সম্প্রতি ইউকে’র স্কটল্যাণ্ড ও স্পেনের ক্যটালনিয়া’র বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারের প্রশ্নে গণভোট থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আচরণের ব্যাপারে কোন শিক্ষা নেয়নি। এর বিপরীতে রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে ওকালতি করা বুদ্ধিজীবীদের যুক্তি হচ্ছে ভারতীয় ও ইউরোপীয় মনস্তত্ত্ব এক নয়, ভারতীয় মনস্তত্ত্বের রক্ষক হিসেবে রাষ্ট্র সঠিক আচরণই করছে। এটা শুধু কুযুক্তিই নয়, আসলে রাষ্ট্রশক্তি জল মেপে দেখতে চাইছে যে উগ্র-দেশপ্রেমের আবেগে ভারতীয় গণমানসকে উত্তেজিত করা যায় কিনা। এই জল মাপার জন্যই স্থানীয় স্তরের নেতারা একের পর এক উগ্র-হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র-দেশপ্রেমিক বয়ানবাজী করে চলেছে, আর সরকার ও রাষ্ট্র অর্থপূর্ণ মৌনতা অবলম্বন করে প্রতিক্রিয়া দেখছে।
ইতিহাস বলছে প্রাচীন গ্রিসে এথেনীয় ভোটভিত্তিক নির্বাচন চালু হলে তা প্রথম ছড়িয়ে পড়ে পূবের দেশগুলিতে, পশ্চিমের দেশগুলিতে নয়, ভারতবর্ষের পুর-প্রশাসনেও যে এই প্রথার প্রয়োগ হয় তার বহু নিদর্শন রয়েছে। সনাতন ভারত, বৌদ্ধ ভারতের প্রতিষ্ঠান এবং আকবরের রাজত্বে মোগল প্রতিষ্ঠানেও বহুমতের স্বাধীন বিতর্কের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়, কিন্তু মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহ্যই ভারতবর্ষের এই অতীত গৌরবময় অধ্যায়কে নস্যাৎ করে দিতে সদা সচেষ্ট রয়েছে। উপরন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যে কোনো রাষ্ট্রই যে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে সচেষ্ট থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এটুকু বোঝার ক্ষমতা রাখে যে কোনটি স্থিতাবস্থার প্রতি প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এবং কোনটি নেহাৎ বৌদ্ধিক বিতর্ক। আমেরিকান রাষ্ট্রের পাশবিক আক্রমণের রক্তঝরানো ইতিহাস, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি রাষ্ট্রের কঠোর অমানবিক আচরণ সম্পর্কে সবাই কমবেশি অবগত, কিন্তু আমেরিকার রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে প্রতিনয়ত মতপ্রকাশ করে চলেছেন সে দেশের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা, অথচ দেশদ্রোহের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার হতে হচ্ছে না, সেটাও বাস্তব। আমেরিকান রাষ্ট্র ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের প্রহরী, যতক্ষন না সেই স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার মত পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে ততক্ষণ রাষ্ট্র অত্যন্ত সহনশীল। রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোর গ্রহণযোগ্যতা যখন তলানিতে এসে ঠেকে, তখনই রাষ্ট্র সব ধরনের বিরোধী মতকে ভয় পায় ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে।    আম-জনতাকে ‘দেশপ্রেমের’ মোহে মোহগ্রস্ত করে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদীকরণের দিকে যাত্রা শুরু হয়। সেরকম পরিস্থিতি আমেরিকাতেও দেখা দিতে পারে, বুশ-জমানায় সেরকম কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু ভারতবর্ষে সেই যাত্রা এক বাস্তবরূপে ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে তা হলফ করে বলা যায়। ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র এক মূল্যবোধের নাম নয়, যে বা যাদের হাত ধরে তা বাস্তবে আবির্ভূত হয় তারা ত্যাগী, সন্ন্যাসী, নিষ্ঠাবান, সৎ কিনা এবিচার নিরর্থক, কারণ ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক রূপ। এঅঞ্চলের এক ‘দেশপ্রেমিক’ বুদ্ধিজীবী ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার দিকে তাকাতে বিরোধীপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছেন। ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাস তাঁর হয়ত স্মরণে নেই। সুকার্নোকে ক্ষমতাচ্যুত করে আমেরিকান পুতুল সুহার্তোকে ক্ষমতায় বসাতে গিয়ে সেদেশের আর্মি দেশবাসীর উপর নৃশংস আক্রমণ নামিয়ে আনে এবং এই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কম্যুনিস্টদের গণ-পার্টী ইন্দোনেশীয় কম্যুনিস্ট পার্টীর (পিকেআই) প্রায় ১০ লাখ সদস্যকে নির্বিচারে কোতল করে। সে যাইহউক, বিভিন্ন দেশে বামপন্থীরাও ফ্যাসিবাদী আচরণ করেছে, সেকথা অনস্বীকার্য। কিন্তু তারা তখনই এই আচরণ করেছে যখন তারা ডানদিকে সরে গিয়ে পুঁজিবাদের সাথে আপসের পথ অবলম্বন করেছে। আমাদের দেশের পশ্চিবঙ্গের মত একটি মাত্র অঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতায় অবতীর্ণ হয়ে বামপন্থীদের পার্টী-সমাজ গড়ে তোলার সর্বগ্রাসী প্রচেষ্টার সাথে তাদের নিও-লিবারেল পলিসি মেনে নেওয়া, সেজ গঠন, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির উদ্যোগ, ডাও ক্যামিকেলের মত কুখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানীকে নিজ রাজ্যে ডেকে আনা ইত্যাদি ডানপন্থী উদ্যোগকে এককরে দেখতে হবে। তাঁরা যদি অতীতের ভুল সংশোধন করে জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থী না হোন তবে তাদের কাছ থেকেও ভবিষ্যত ভারত জবাবদিহি চাইবে।
সবার সম্মতিতে শান্তিপূর্ণভাবে যদি একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখা যায়, তাহলে কোন শাসকই চাইবে না রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী রূপান্তর (আরএসএস ও আইসিসের মত উগ্র-মতাদর্শগত সংগঠনের কথা ভিন্ন, কারণ এদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাদের সংজ্ঞায়িত ধর্মের ভিত্তিতে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা)। আশির দশকে রাজীব গান্ধীর সময় থেকে ভারতবর্ষ যে নিও-লিবারেল অর্থনীতির পথিক হয় এবং নব্বইয়ে মনমোহন সিঙের আমলে যাতে সরকারি সীলমোহর দেওয়া হয় সেই পথ ধরে ভারতবর্ষ এখন বিশ্ব-পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার উত্থান-পতনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্তরীভূত শ্রমমূল্যের শোষণ (diferential exploitation) এখনও বজায় রয়েছে এবং ভারতবর্ষের মত দেশ থেকে বহুজাতিক কোম্পানীগুলি অতি-মুনাফা করে চলেছে, কিন্তু উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের মাধ্যমে শ্রমশোষনের প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী ক্রমশ সাধারণীকৃত হচ্ছে। এই বিশ্ব-পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থা আজ ভীষণ সঙ্কটে। এই সংকট এতোই তীব্র যে যুদ্ধের মাধ্যমে পুরোনো সম্পদ ধ্বংস করে দিয়েও পুঁজি কোনো লাভজনক বিনিয়োগের সন্ধান পাচ্ছে না। বৃহৎ আকারের প্রতিরক্ষা সামগ্রীর ঠিকা প্রাপক লকহিড ও রলস রয়েসের মত কোম্পানীর অসফল হওয়ার কাহিনী সেইদিকেই ইঙ্গিত করে। পুঁজিবাদ টিঁকে থাকে মুনাফা - আরও মুনাফা, সঞ্চয় – আরও সঞ্চয় এই নীতির উপর ভিত্তি করে, সেই অর্থনীতি নিজেই যে বিশ্বজোড়া চূড়ান্ত অসাম্য, আমজনতার ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়া ও চূড়ান্ত বেকারত্বের জন্ম দিয়েছে তার ফাঁদে সে নিজেই ঢুকে গেছে এবং এর থেকে বেড়িয়ে আসার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারী ও মধ্যবিত্তের উপর চূড়ান্ত আঘাত নামিয়ে এবং লগ্নি-পুঁজির স্বনির্ভর নতুন ফাইনান্সিয়্যাল বাজার তৈরি করে এই সংকট থেকে বেড়িয়ে আসার যে নিও-লিবারেল পলিসি’র প্রবর্তন হয়েছিল তাও এখন অসার প্রমাণিত হচ্ছে, অসার প্রমাণিত হয়েছে ‘গ্রোথ অনলি ও ট্রিকল ডাউন’ তত্ত্বের কার্যকারিতা। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ উন্মাদনা, ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ও বর্বরতার রাজত্ব কায়েমের মত একমাত্রিক ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াকে মেনে নেওয়া ছাড়া বিশ্বপুঁজিবাদের আর কোনো গঠনমূলক কার্যকারিতা অবশিষ্ট নেই। এই শূন্যতার মধ্যেই সংঘ পরিবারের উত্থান, এই শূন্যতার মধ্যেই দেশে দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তি ও যুদ্ধ-উন্মাদদের বাড়বাড়ন্ত। যে বামপন্থীরা এই শূন্যতা পূরণ করতে পারত তারা ডানদিকে আপস করতে গিয়ে সম্পূর্ণ পরাভূত। এটার একটু, ওটার একটু – এই লাল মিশ্রণের ঔষধ এখন আর জনগণের অসুখ নিবারণে অপারগ। তবে আশার কথা গোটা ইউরোপ জুড়ে নতুন বামপন্থীদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা শুধু বিকল্প অর্থনীতির কথাই বলছে না, রাষ্ট্রের ক্রমবিকশিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এই অর্থনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের কথা বলছে, যে গণতন্ত্র সবার মত প্রকাশের, সুষ্ঠু বিতর্ক করার, স্বাধীন মিডিয়ার, সবার নির্বাচিত হওয়ার লিবারেল ডেমোক্রেসির অধিকারের চাইতেও বেশি কিছু।
ভারতবর্ষেও যে তার নিজ ঐতিহ্য ও ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে সেই শক্তির উত্থান হবে না সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নন। ইতিমধ্যে যেভাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে, ‘গ্রোথ অনলি’ অর্থনীতির বিরুদ্ধে গণরোষ দেখা যাচ্ছে তাতে সঙ্ঘ-পরিবারের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু যেভাবে বিপর্যস্ত কৃষি পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত ন্যায্য ক্ষোভ জাঠ ও অ-জাঠের সংঘাতে পর্যবসিত হচ্ছে, শ্রমিক শ্রেণির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে গণতন্ত্রের প্রশ্নে শ্রেণি-অসচতনেতা বিরাজ করছে তাতে গণতন্ত্রপ্রেমীদের আশ্বস্ত হওয়ার মতও কিছু নেই। জেএনইউ বিতর্কে উগ্র-দেশপ্রেমিকরা খানিকটা পিছু হটেছে, আর্থিক নীতিতেও কিছুটা পিছু হটার লক্ষণ বাজেটে প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু তাতে আত্মতুষ্টির কোনো স্থান নেই। কারণ এককদম পিছু হটা দু’কদম এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি হতে পারে। সুতরাং সময় থাকতেই ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের উপর আরও বড়ধরনের চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাজেটের দিকে চোখ বোলালেই জনদরদী আওয়াজ ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে ফারাকটা ধরা পড়ে।

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য হ্রাসের ফলে তেল আমদানী থেকে বিশাল অঙ্কের রেভিন্যু সঞ্চয়, সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে সরকারি আয় ইত্যাদির সাথে তূলনামূলক বিচার করলে কৃষি ও সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিমাণ আহামরি কিছু নয়। উপরন্তু খাদ্য সামগ্রীর উপর একশ শতাংশ বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ছাড় খুচরো বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগের দিকেই এককদম অগ্রসর হওয়াকে সূচিত করে। পিএফ ও পেনসন ফাণ্ডের উপর হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতে বেসরকারিকরণের দিকে যাত্রাকে সূচিত করে, কারণ কংগ্রেস সরকার বাজার নির্ভর যে ‘এনপিএস’ চালু করেছিল বিজেপি দলের মুখপাত্ররা তার জয়গানই গাইছেন, শুধু দায়টা ঠেলে দিতে চাইছেন কংগ্রেসের উপর। তবে আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে এবারের বাজেটে যে এনরেগার মত প্রকল্পের প্রয়োজনীতার কথা স্বীকার করা হয়েছে এবং তাতে বরাদ্দ বেশ খানিকটা বৃদ্ধি করা হয়েছে তা ইতিবাচক পদক্ষেপ (যদিও মজুরির বৃদ্ধি হিসেবে রাখলে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি বাস্তবে খুব বেশি নয়)। পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় আয়ের অনুপাতে ২০১৩-১৪ সালে সামাজিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ হয়েছিল ১.২ শতাংশ, ২০১৫-১৬ সালে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ০.৭ শতাংশ, আর এবছর বাজেটে বরাদ্দ হলো ০.৬ শতাংশ। গ্রামোন্নয়ণে ২০১৩-১৪ সালে বরাদ্দ ছিল জাতীয় আয়ের ১.৮ শতাংশ, এবার বরাদ্দ হলো ১.৫ শতাংশ। উপরন্তু বরাদ্দ অর্থের বাস্তবে প্রয়োগের দিক তো দেখার এখনো বাকী। তথাপি এবারের বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্র, কৃষি ইত্যাদির উপর যে জোর দেওয়া হয়েছে সেটাও এই সরকারের থেকে আশা করা যায়নি। কারণ এবারের বাজেটে তাদের ঘোষিত অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে একটু জনকল্যাণের দিকে বেঁকে যাওয়া পরিলক্ষিত হয় এবং এটা সম্ভব হয়েছে সংসদীয় নির্বাচনী গণতন্ত্রে জনগণের চাপের ফলে। আমাদের এই গণতন্ত্রকে শুধু রক্ষা করার শপথ নিলেই হবে না, এই গণতন্ত্রকে বিকশিত করার ও বিকল্প অর্থনীতির কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণ আর পুরোনো বোতলে নতুন মদ দেখতে প্রস্তুত নয়, বিকল্পহীনতায় জনগণ যদি গণতন্ত্র ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির বর্তমান বোতলকেই ভাঙতে উদ্যত হয়, তাতে তাদের দোষ দেওয়া যাবে না। 



                           

১৯৮৩র অসম: নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু-০২

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , , , ,


দিগন্ত শর্মা
(দিগন্ত শর্মা, সাদিন কাগজের সাংবাদিক এবং অনুসন্ধানী লেখক। এর আগে তিনি  ‘ নেলি ১৯৮৩নামে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখেছিলেন তিনি। বর্তমান অনুবাদক  সেটি বাংলাতে অনুবাদ করেছিলাম। দু’টিই আগে পরে বই হিসেবে বেরোয়। সেই বইতে মূলত ধরা হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের  উপরে নেমে আসা আক্রমণের  ছবি। এবারে বাঙালি হিন্দুর উপরে কেমন অত্যাচার নেমে এসেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তিনি ঘুরেছেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার  পূব থেকে পশ্চিমে। আর লিখছেন এই নিবন্ধ। ধারাবাহিক ভাবে এটি এই ব্লগ ছাড়াও প্রকাশিত হবে, আরো দুই একটি ব্লগে এবং ছাপার অক্ষরে বেরুচ্ছে শিলচর থেকে প্রকাশিত চন্দন সেনগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক ‘অরুণোদয়ে’।  এবারে দ্বিতীয় পর্ব। লেখকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে যোগাযোগ করুন, এই নম্বরে: ৯৮৫৪৬-৩১৯২৮। )


মূল অসমিয়াঃ দিগন্ত শর্মা

বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর





           হাত জোড় করছি – জমি বাড়ি সব ছেড়ে যাবো, আমাদের মেরো না:  মহিলার নাম সোনামতি৮৩র ফেব্রুয়ারির হিংসাত্মক ঘটনার কথা বলতে গিয়ে মুখ খুলেই হু হু করে কাঁদতে শুরু করলেন। শাড়ির আঁচলে দুই গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জল মোছবার চেষ্টা করলেন যদিও, স্রোত থামবার নামই করল না। মুহূর্ত কয় আমরাও বেশ অস্বস্তি অনুভব করলাম। “মহিলাকে সেই সব দুঃখের দিনের কথাগুলো জিজ্ঞেস করে কি ভুল করলাম কিছু?”—এমন একটা ভাবনা নাড়িয়ে গেলো। ঠিক সেই সময় আর্নে রামনগরের কিছু মানুষ বলতে শুরু করলেন---না কেঁদে থাকবে কী করে? চোখের সামনে পরিবারে সমস্ত মানুষকে মেরে ফেলল।
            ধীরে ধীরে সোনামতি বলতে শুরু করলেন, “ ওই উত্তর দিক থেকে লাঠি-বল্লম-তিরধনুক-তলোয়ার নিয়ে প্রচুর মানুষে যখন আমাদের বাড়িটি ঘিরে ফেলল, পালাতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। আক্রমণকারী দলটি আমাদের পরিবারটিকে  ধরে ফেলল। আমি ওদের পায়ে ধরে কাকুতি মিনতি করলাম, “হাত জোড় করছি, পায়ে পড়ছি। এই জমিবাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাবো।আমাদের মেরো না।” খানিক থেমে জল চোখে তিনি আরো বললেন, “ কিন্তু ওরা আমার অনুরোধে কান দিল না। আমার চোখের সামনে আমার মানুষটিকে (স্বামী), আমার মা আর চার বছরের মেলে চামেলিকে ঘা মারতে শুরু করল। আমি দু’বছরের ছেলে কাজলকে নিয়ে যে দিকে চোখ যায় দৌড়োলাম। কিন্তু পেছন থেকে কেউ একজন আমাকে লাঠির ঘা মারতেই আমি গড়িয়ে পড়লাম। তারপর আর কিছুই বলতে পারি না। পরদিন দু’জন মানুষ আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেই দেখলাম, আমি বাড়ির কাছেই পড়েছিলাম। আমার পাশেই শুয়ে শুয়ে কাঁদছে ছেলে কাজল। ঐ দু’জনের একজন আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে গ্রামের অন্য মাথায় শিবিরে নিয়ে এলেন। অন্যজন কাজলকে কোলে করে নিয়ে এলেন। গ্রামের লোকেরাই জানালো সেদিনের আক্রমণে আমার বর রাজকুমার নমশূদ্র, মা কুমুদিনী নমশূদ্র , আমার মেয়ে চামেলি মারা গেছে...।
            ওদিকে সেই সময়, আমি চারমাসের গর্ভবতী ছিলাম। সব হারিয়ে আমি উপায়হীন হয়ে পড়লাম।  আহত শরীর , পেটে বাচ্চা। সেই সঙ্গে আহত দুবছর বয়সী কাজল। শিবিরে যে ডাক্তারেরা এসেছিলেন, তারা তার চিকিৎসা করেছিলেন বটে কিন্তু মাস কয় পরে সেও মারা গেল। ভালো চিকিৎসা করাতে পারলাম না।  গর্ভের সন্তানটিই জীবনের ভবিষ্যৎ ভেবে  আশাতে বেঁচে রইলাম। সেই সন্তানেরই আমি মা এখন। সেই অন্যায়ের বিচার আমি পেলাম না। হয়তো ন্যায়, কোনোদিনই পাবো না। ...”
          
ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা গায়ে এখন আঘাতের চিহ্ন
  সোনামতি, পক্ষ, মিছিলা...অজস্র মহিলার জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনের ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ। সারা আসাম ছাত্র সংস্থা, সারা আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ এবং এদের সমর্থক (অসম সাহিত্য সভা) সংগঠনের নেতৃত্বে একাংশ উগ্র-অসমিয়াদের দ্বারা  সংগঠিত বাংলাভাষী গণনিধন কাণ্ডের পরিণতিতে  ধেমাজির শিলাপাথারের নিকটবর্তী আর্নে রামনগর  গ্রামের বহু পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেছিল। কিন্তু শুধু ঐ আর্নে রামনগরই নয়। এই গ্রামের পাশের ‘আর্নে তিরাশি’ গ্রামেও শতাধিক মানুষকে এরা হত্যা করেছিল। ‘অসমের অস্তিত্বরক্ষা’র আন্দোলনের ঘাতক বাহিনীর লোকেরা। শিলাপাথারের কাছের বৃহত্তর আর্নে চর অঞ্চলের অন্তর্গত ‘আর্নে তিরাশি’ নামের গ্রামেই ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে সব চাইতে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।  গ্রামের নাম এমন হবার কারণ ছিল, মাত্র তিরাশিটি পরিবার শুরুতে এই গ্রাম বসিয়েছিল। সেই তিরাশি  পরিবারের গ্রামে মৃতের সংখ্যা ছিল শতাধিক। গ্রামের কোনো এক পরিবারের একটি কুঁড়েঘরও যদি দাঁড়িয়ে থাকতো। আক্রমণকারীরা পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে নিঃশেষ করেছিল। সেই গ্রামের এক ব্যক্তি ঈশ্বর নমশূদ্র। প্রায় ৭০ বছর বয়সের এই বৃদ্ধের বিদেশী বিতাড়ন আন্দোলনের সময় বয়স ছিল দুই কুড়ি।  ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা গায়ে এখন আঘাতের চিহ্ন।  মাথাতে যদি দায়ের ঘায়ের চিহ্ন, পিঠে বল্লমের, পায়ে বন্দুকের গুলির চিহ্ন , তো হাতে তলোয়ারের ঘা। বুকে ধনুক থেকে ছোঁড়া তির বেঁধার চিহ্ন স্পষ্ট।
          
মাথাতে যদি দায়ের ঘায়ের চিহ্ন
  ঈশ্বর নমশূদ্র বলছিলেন, “আমাদের গ্রামের চারদিকে উঁচু উঁচু খাগের জঙ্গল ছিল। তাই আক্রমণ করতে ওরা ঠিক কোনদিক থেকে আসছিল ধরা যায় নি। কিন্তু ওরা যে হা রে রে রে !---- করে আসছিল সেটা টের পাওয়া যাচ্ছিল।  কী করা ঠিক হবে ভাবতে ভাবতেই ভোরের দিকে অসমিয়া, মিশিং জনগোষ্ঠীর একাংশ মানুষ গ্রাম ঘিরে ফেললো। হাতে তাদের অগুণতি অস্ত্র-শস্ত্র। আমাদের বাড়ি ছেড়ে পালাবার বাইরে উপায় ছিল না। তাই সবাই দক্ষিণের ব্রহ্মপুত্র নদীর দিকে দৌড় দিল। কিন্তু ওরা যে আমাদের সবাইকে ঘিরে ফেলেছে, বুঝতে পারি নি। অন্যদের মতো আমিও ন’মাসের ছেলে অজিতকে কোলে করে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলাম। কিন্তু সামনের থেকে একদল লোক আমাকে আটকে দিল। ওদের কেউ আমাকে লম্বা লাঠি দিয়ে মারলো  । আমি গড়িয়ে পড়ে গেলাম।    আমার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল ন’মাসের শিশুটি। কই পড়ল ---দেখবার জন্যে ফিরে তাকাতেই দেখি মাটিতে পড়ে কাঁদছে শিশুটি, ওকেই ঘা মেরে দুই টুকরো করে ফেলল। দেখে আমি চীৎকার করে উঠেছি কি, ওদের কেউ আমাকে দা দিয়ে ঘা দিল, কেউ বল্লমে খোঁচালো,কেউ তির দিয়ে  বুকে পিঠে বিঁধলওরা গেল কিন্তু পরে ঘরে আগুন দিতে এলো আরো একদল, তারা গুলি ছুঁড়লে আমার পায়ে গুলি লাগলো।আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলাম। সেদিন সন্ধ্যাতে কেউ আমাকে তুলে নিয়ে গেলো। পরদিন আশ্রয় শিবিরে ডাক্তার এলো।চিকিৎসা করল। প্রায় এক মাস পরে লখিমপুর গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। আমার পুরো শরীরে আঘাতেচিহ্নগুলোর চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু টাকা ব্যয় হলো। আজও  কখনো শরীরের  প্রচণ্ড ব্যথাতে আমি ছটফটাতে থাকি।  সেই নৃশংস আক্রমণে মরে গেলে ভালোই ছিল। কিন্তু মরলাম না। মানুষের হিংস্রতার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু শরীরে আঘাতের ব্যথা-বেদনার  থেকেও   মনে যে ঘায়ের দাগ থেকে গেলো ---তার যন্ত্রণা যে কী বিষম বোঝাতে পারবো না। সেই যন্ত্রণার চিকিৎসা হাসপাতালে হবে কী করে?

পিঠে বল্লমের

            
পায়ে বন্দুকের গুলির চিহ্ন

তো হাতে তলোয়ারের ঘা

বুকে ধনুক থেকে ছোঁড়া তির বেঁধার চিহ্ন স্পষ্ট
          আর্নে তিরাশি গ্রামের ঈশ্বর নমশূদ্রের সারা শরীরের আঘাতের দাগগুলো শুধু ঐ বল্লম-দা-তলোয়ার-তিরধনুকের আঘাতের দাগ নয় তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্নই ‘অসম –অসমিয়ার অস্তিত্বে’র নামে একাংশ ‘খিলঞ্জিয়া’ অসমিয়ার সুপরিকল্পিত ভাবে প্রদর্শন করা নির্লজ্জ হিটলারি চরিত্রের স্বাক্ষর। ‘অসম আন্দোলনে’র নেতৃত্ব তথা সমর্থক লোকজনের সৃষ্ট ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের জ্বলন্ত প্রমাণ।
            ঈশ্বর নমশূদ্র যখন কথাগুলো বলছিলেন আর্নে তিরাশি গ্রামের মানুষজন ভিড় করেছিলেন। তারই মধ্যে এক বৃদ্ধা মাথায় গালে হাত দিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। ঈশ্বরের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যখন কথা বলতে চাইলাম, গ্রামের লোকেরা বললেন, তিনি ভালো করে কথা বলতে পারেন না। আগে গ্রামের একজন সক্রিয় মহিলা ছিলেন তিনি। তাঁর নাম দিবাসী নমশূদ্র।  শরীরে তাঁর তির বিঁধেছিল। যখন দৌড়ে পালাচ্ছিলেন তিরের ঘায়ে গড়িয়ে পড়েছিলেন।  পড়ে পড়েই দেখছিলেন তাঁর বাবা-স্বামী-পুত্রকে কোপিয়ে কোপিয়ে কাটছিল। সেই থেকে দিবাসী আগের মতো আর কথা বলতে পারেন না। এমনকি স্বামী-পুত্র এবং বাবার নামগুলোও ভুলে গেছেন। কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে ‘আসু’, ‘সারা আসাম গণসংগ্রাম পরিষদে’র নেতৃত্বে চলা আন্দোলনের অস্ত্রধারীরা যখন বাঙালিদের উপরে আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল এমন বহুজনের জীবনে অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল।  দিবাসী নমশূদ্রের মতো মহিলার জীবনেও নামিয়ে এনেছিল অকাল অন্ধকার---যার জন্যে তিনি হারালেন স্মৃতিশক্তি।

অসমের অস্তিত্বরক্ষার নামে আন্দোলনকারীর হিংস্রতাতে
নিস্তব্ধ কিশোর, নিঃশেষিত পরিবার:


             “আমাদের আর্নে তিরাশি গ্রামে আন্দোলনকারীরা  যখন আক্রমণ করে কে কোনদিকে পালিয়েছিল কোন ঠিক-ঠিকানা ছিল না। সবাই শুধু প্রাণটাই বাঁচাতে চাইছিল। পরদিনই শুধু আমরা জানতে পারছিলাম কার পরিবারের কতজন মরেছে, বা কার ঘরে কতজন বেঁচে আছে।  গ্রামের একটাও ঘর দাঁড়ানো ছিল না। সব কটিতে এই আক্রমণকারীরা আগুন দিয়েছিল। ঘটনার পর দিনে পুরো আর্নে তিরাশি গ্রামে হিসেব করে বের করতে হয়েছিল, কে আহত, কে নিহত আর কারাই বা অক্ষত বেঁচে আছেন। আমাদের গ্রামের লোকজনের খবর করে, খোঁজে বের করে , নদীর পারেও গিয়ে মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে দেখি পনেরো ষোল বছর বয়সের কিশোর মাখনদের বাড়ির লোকজন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।” ---আর্নে তিরাশি গ্রামের এক বৃদ্ধ আমাদের সামনে ‘সংঘাতকালে’র বর্ণনা দিচ্ছিলেন এই ভাবে। তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন, এক যুবক তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েছিল নিষ্পলক। তাকে দেখিয়ে বৃদ্ধ বললেন, এই সেই মাখন নমশূদ্র। আন্দোলনকারীদের নিপীড়নের শিকার। ঘটনার পরদিন ওকে নদীর পার থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিল। ওর বাবা সার্থক নমশূদ্র, মা ময়নাবালা  এবং তিন বোনের মৃতদেহ পাওয়া গেছিল গ্রামের মাঝ বরাবর বেরিয়ে যাওয়া পথের পাশে।” জিজ্ঞেস করলাম, ওর তিন বোনের নাম কী ছিল? মাখন সামান্য অপেক্ষা করে কী যেন মনে করল। আর আটকানো স্বরে বলল, বীণামতি নমশূদ্র, রশুমতি নমশূদ্র, খকিলা নমশূদ্র।
            বলেই মাখন ওখানে বসেই হু হু করে কেঁদে ফেলল। কিছুক্ষণের জন্যে আর্নে তিরাশি গ্রামে আমাদের মাঝখানে মৌনতা ছেয়ে ধরল। সেই মৌনতা আবার ভাঙল, “ ওকে আমরা এর পরে গ্রামের মানুষই বড় করলাম। ঘর সাজিয়ে দিলাম নিরাশ্রয় ছেলেটির। ওকে সান্ত্বনা দেবার আরো কোনো ভাষা আমাদের জানা ছিল না।” সেই বৃদ্ধ আবার বললেন, “ মাখনের পরিবারের তবু একজন বেঁচে রইল। কিন্তু আরান মণ্ডলের পরিবারের সব্বাইকে হত্যা করেছিল আন্দোলনকারীরা। মোট কথা শতাধিক মানুষকে এরা সেদিন খুন করেছিল। আহতেরতো কোনো হিসেবই নেই। গেল তিনটা দশক ধরে আমরা অপেক্ষা করে রইলাম, এই গণহত্যার, এই নির্মম কাণ্ডের  বিচার হবে। ন্যায় পাবো আমরা---দোষীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু দেখলাম এই দেশে আমাদের মতো নির্যাতিতেরা বিচার পায় না। এই গণতন্ত্র, এই প্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা হারিয়ে গেছে। আমাদের আর্নে চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আক্রমণ করে গ্রামের মানুষজন তাড়িয়ে অসমিয়াদের দখলে নেবার চেষ্টা করেছিল আক্রমণকারীরা।  আক্রমণ করবার সময় আমাদের বাঙালিদের বিদেশী বলে প্রচার করেছিল। সেসব কথা আমরা সেই ঘটনার পরে জানতে পাই। কিন্তু সত্যিই কি আমরা বিদেশী?” ---তাঁর মুখ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বেরুচ্ছিল কথাগুলো। তাঁর কথাতে  ক্ষোভ আর হতাশার ছবি স্পষ্ট।
            উগ্রজাতীয়তাবাদী অসমিয়াদের একাংশ মানুষ আর্নে চরাঞ্চলের হাজার হাজার জনতার উপরে আক্রমণ চালাবার জন্যে যে পূর্বপরিকল্পনা করেছিল, গোপনে সংগঠিত হয়েছিল---লখিমপুর জেলার (তখনকার) বিভিন্ন জায়গার মানুষ সেই সব কথাও এই বাঙালি মানুষজনে পরে জেনেছিলেন। কিন্তু যে দুই গ্রামের কথা লিখলাম, তারও আগে এই পুরো চরাঞ্চলে প্রথম আক্রমণ এরা নামিয়েছিল নলবাড়ি গ্রামে।

প্রথম আক্রমণ হয়েছিল নলবাড়িতে।
যেখানে ঘরের ভেতরেই জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল সোনাই মণ্ডলকে।

                আর্নে রামনগর, আর্নে তিরাশি, পানবাড়ি, কাকবাড়ি , মুক্তিয়ার, বর্মণ বস্তি, কেম্পবস্তি, দিঘলীয়া বস্তি ইত্যাদি গ্রামে প্রায় একই সময়ে আন্দোলনকারীরা আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু এগুলোর ভেতরে প্রথম আক্রমণ করেছিল কই?
                ভুক্তভোগী লোকজন আমাদের জানালেন, প্রথমে আক্রমণ হয়েছিল টেঙানি নলবাড়ি গ্রামে। আর্নে চরাঞ্চলের অন্তর্গত নলবাড়ি গ্রামের একাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন সেই ভয়াবহ দিনের কথা।  সেই গাঁয়ের সঞ্জয় রায়ের বাড়িতে বসে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ কিছু মানুষ আমাদের সামনে বর্ণনা করেন, ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারিতে বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনের সময় তাদের উপরে আক্রমণ নামার দিনের কথা। সে গ্রামের সুনীল রায় বলছিলেন, “আমাদের গ্রামের চারপাশে নলবন ছিল। লম্বা লম্বা নলবনে ভরা ছিল বলেই এই গ্রামের নাম পড়েছিল নলবাড়ি।” এমনিতে এর আসল নাম টেঙানি নলবাড়ি।
          একাজান গ্রামপঞ্চায়েতের অন্তর্গত আমাদের টেঙানি নলবাড়ি গ্রামেই প্রথম আক্রমণ করেছিল, আক্রমণকারীরা। হাজার হাজার অসমিয়া, আর জনজাতি মানুষ এসে  ভোরে আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে, আর অতি নৃশংসভাবে  সোনাই মণ্ডলকে হত্যা করে।” এইটুকু বলে  কিছু সুনীল রায় কিছুক্ষণ থামলেন।  তাঁর পাশেই বসেছিলেন সেই গ্রামের আরো কিছু মানুষ। তাদের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ সোনাই মণ্ডলের বৌয়ের নাম কী ছিল যেন?” কেউ একজন জবাব দিলেন, “শ্যামলা।” “হ্যা, শ্যামলা।”আবার বলতে শুরু করলেন সুনীল রায়, “ ওরা যে আমাদের গ্রামে আক্রমণ করবে সে আমরা আগেই খবর পেয়েছিলাম।  অসমিয়াদের একাংশ যদিও আমাদের আক্রমণ করতে এসেছিল, তাদেরই একাংশ আমাদের আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ছাত্র সংস্থার নেতৃত্বে আন্দোলনের সমর্থকেরা যেকোনো সময় গ্রামগুলোতে আক্রমণ নামাতে পারে।   খারাপ মানুষের মতো ভালো মানুষওতো আছে।  খবরটি পেয়ে আমরা গাঁয়ের লোকে রাতে রাতে পাহারা দেবার গ্রামরক্ষী বাহিনী তৈরি করেছিলাম।  আমাদের গ্রামে যখন আক্রমণ করে তার সামান্য আগেই গ্রামরক্ষীরা সারা রাত পাহারা দিয়ে গিয়ে শুয়েছিল মাত্র। গ্রামের একদিকে তাদের জন্যে একটা বাঁশখড়ের ঘরও তৈরি করা হয়েছিল। পাহারা শেষে সোনাই মণ্ডল সেখানেই শুয়ে পড়েছিল। ও গভীর ঘুমে শুয়ে থাকতেই আমাদের গ্রাম আক্রান্ত হলো।  লোকে পালাতে শুরু করল। হুলস্থূল চারদিকে।সবাই আর্তনাদ, চিৎকার চেঁচামেচি করে  দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। কিন্তু সোনাই মণ্ডল সেই ঘরে শুয়ে ছিল। ওকে সেখানেই আক্রমণকারীরা পেল, আর দা দিয়ে কোপালো। ঘরে আগুন দিয়ে সেই আগুনেই ওকে ছুঁড়ে ফেলল। পরে শুনতে পাই, আগুনে ছুঁড়ে ফেলবার আগে অব্দি সোনাই বেঁচে ছিল। ওদিকে সোনাইর বৌ শ্যামলা দৌড়ে প্রাণ বাঁচালো যদিও স্বামীর মৃত্যুর পরে  এ রাজ্যে থাকবে না বলে পশ্চিমবাংলার ক্রান্তিহাটে চলে যায়। এখানকার জমি বাড়ি সব ত্যাগ করে চলে যায় শ্যামলা।” সুনীল রায় যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন সঞ্জয়ের মতো একালকার তরুণরা নীরবে কথাগুলো শুনছিল। সেখানে আরো কিছু যুবতী, বৌমানুষেরাও ছিল যারা সেই নৃশংস ঘটনাগুলো দেখে নি। কিন্তু গ্রামের বড়োদের মুখে তিন দশক আগেকার সেই নির্মম ঘটনা শুনে নতুন প্রজন্মের কী ধারণা হবে সেটাই প্রশ্ন।
            সুনীল রায় আরো বললেন, “ গ্রামেরই জগদীশ সরকারের কন্যা শেফালি সরকারকে (১৫) ওরা কোপিয়ে খুন করে। কী দোষ ছিল ঐ কিশোরীর? সেভাবেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল হরিপদ রায়। সেরকম আরো বহু পুরুষ-মহিলার আজঅব্দি কোনো খবর বেরোয় নি। বহুদিন পরে নলবনের মাঝখানে কিছু নরকঙ্কাল পাওয়া গেছিল।  কিন্তু সেই নরকঙ্কালগুলো ছিল কাদের শনাক্ত করবে কে?  আমাদের গ্রামের অনেকেই দৌড়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচালেন যদিও পরে শুনেছি এই গ্রামে হামলা করবার পরে ওরা শিলাপাথার থেকে ব্রহ্মপুত্রের পাড় অব্দি পুরো অঞ্চলটিতেই বিদেশী খেদার নামে আক্রমণ নামিয়েছিল।”
            অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদী তথা বিদেশী খেদার জন্যে মারণাস্ত্র যারা এসেছিল, বা বিদেশী বলে ভেবে ‘মানুষে’র বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে ‘অগ্নিশিখা’ নিয়ে অসমিয়া জাতির ‘অস্তিত্ব’ রক্ষা করতে যারা এসেছিল তারা শিলাপাথারের বৃহত্তর অঞ্চলে চালিয়েছিল গণনিধন পর্ব। অসমিয়া জাতির নামে চালানো এই বর্বর গণহত্যা অভিযানের প্রথম শিকার ছিল সোনাই মণ্ডল।
           
(ক্রমশ:)
লেখকের দূরভাষ: ৯৮৫৪৬-৩১৯২৮। লেখক ‘সাদিন’ কাগজের স্টাফ রিপোর্টার।      
           


স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন