শ্রমিক আন্দোলনের দিশা – একটি প্রস্তাবনা

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , ,






  ।। অরূপ বৈশ্য।।
    (শিলচর থেকে প্রকাশিত মাসিক অরুণোদয়ে প্রকাশেরর জন্য)
 

শির দশক থেকে পুঁজির বিশ্বায়নের যে নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর এক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী সংগঠিত শ্রমিকদের ইউনিয়নের চাপকল্যাণকামী (welfare)’ রাষ্ট্রকে বজায় রাখার অন্যতম বাধ্যবাধকতা ছিল। জনগণের বিভিন্ন অংশকে চলতি ব্যবস্থার মধ্যে বেঁধে রাখার যে জাতীয় পুঁজিবাদী উন্নয়নের রাষ্ট্রীয় নীতি বজায় ছিল তার মেরুদণ্ড ছিল অর্থনৈতিকভাবে সচল এই সংগঠিত শ্রম। ভারতবর্ষে সংগঠিত শ্রমিকের এই সংখ্যা মোট শ্রমবাহিনীর দশ শতাংশেরও কম ছিল, তথাপি অর্থনৈতিকভাবে সচল এই জনগোষ্ঠী কল্যাণকামী রাষ্ট্র বজায় রাখার মূল চালিকা শক্তি ছিল।

                  কিন্তু আশির দশক থেকে চালু ব্যাক্তিগতকরণ ও ঠিকাপ্রথার উদারবাদী নীতির ফলে আর্থিকভাবে সচল এই শ্রমিকশ্রেণির অধিকাংশ অস্থায়ী, ঠিকা শ্রমিক কিংবা বেকারে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রায় সব হিসেবে দেখা গেছে যে কৃষির সাথে যুক্ত কৃষি শ্রমিক ছাড়াও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অধিকাংশ, এমনকি আসামের মত পশ্চাৎপদ রাজ্যে, দিনমজুরে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এদের এক বড় অংশ নিজ জেলা, রাজ্য ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রব্রজিত শ্রমিক হিসেবে মূলত সার্ভিস সেক্টরের সাথে যুক্ত হয়েছে। মজুরি প্রাপ্ত কৃষি শ্রমিকরা তাদের শ্রমশক্তি বিক্রি করে কৃষি-বাণিজ্যে বিনিয়োজিত পুঁজির প্রকৃত অধীনস্থ (real subsumption) হয়ে পুঁজির মুনাফা বৃদ্ধি করছে। উপরন্তু ১৯৯১ থেকে প্রায় ৮% বিকাশের হারের পরিস্থিতিতেও কারখানা উৎপাদনে (manufacturing) তেমন কোন শ্রম-নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়নি। উৎসা পট্টনায়ক লিখেছেন, “কর্পোরেট শিল্পপতিরা যে শুধুমাত্র অতিরিক্ত কোন শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করেনি তাই নয়, তারা তাদের একচেটিয়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে (আরও সাধারণভাবে আমি যাকে অধিগ্রহণের (encroachment) মাধ্যমে সঞ্চয় হিসেবে অভিহিত করি) যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ছাড়, উচ্ছেদ ও বিস্থাপনের মত জনবিরোধী বিভিন্ন শর্ত সরকারের উপর আরোপ করা, জমির ফাটকা বাণিজ্য ইত্যাদি রয়েছে


 কল্যাণকামী রাষ্ট্র ছিল পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে শ্রম-সৃষ্ট মূল্যকে শ্রম-শক্তির দিকে স্থানান্তরিত করার এক সংগ্রাম, যেখানে শ্রমিকের মজুরির অপ্রতুলতা ও নিরাপত্তাহীনতা পুঁজির অস্তিত্ব ও পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে বিপদ স্বরূপ। বিশ্বায়ন ও পুঁজির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া মুনাফার জন্য শ্রমের দরকে তার প্রকৃত দামের নীচে নামিয়ে আনার ক্রমবর্ধমান কার্যকারণ-গত প্রক্রিয়াকে সচল করে দিয়েছে।       শ্রম-প্রক্রিয়ার উপর ম্যানেজারিয়্যাল নিয়ন্ত্রণ বৌদ্ধিক কাজ ও তার রূপায়ণকে পৃথক করে দিয়েছে। জ্ঞান ও দক্ষতার বিস্তৃতির বদলে তার মেরুকরণ চলছে, এক ক্ষুদ্র অংশ তা আয়ত্ত করছে ও গরিষ্ঠাংশরা তা হারাচ্ছে। তাতে স্তরীভূত শ্রম-সংগঠন, শ্রমিকের হাত ও মাথার উপর নিয়ন্ত্রণ, অতি-মুনাফা ইত্যাদি সহ জনগণের চাহিদা ছাড়া বাকী সবকিছুর জন্য সুবিধেজনক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। পুঁজিবাদের সঙ্কটকালে যান্ত্রিকীকরণ, মজুরি হ্রাস অথবা শ্রম-সময়ের বৃদ্ধি ঘটানোর উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সরকারি তথ্য অনুসারে, ১৯৯১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে সংগঠিত পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ দ্রুত হ্রাস পেয়েছে এবং সংগঠিত ব্যক্তিগত খণ্ডে সেই অনুপাতের অনেক কম বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অসাম্য বৃদ্ধির এক পদ্ধতির মাধ্যমে বিকাশের হারের বৃদ্ধি ঘটানো হচ্ছে, এই বৃদ্ধি অসাম্যকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে। বিকাশের হারের এই ঘাতক বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অমিত ভাদুড়ি লিখেছেন, “ দরিদ্র জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিকাশের হার বৃদ্ধি যে সামান্যই অবদান রেখেছে তাই নয়, রাষ্ট্রের কল্যাণকামী ব্যয় কমিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদাকে কমিয়ে দিয়েছেসুতরাং বিকাশের লক্ষ্য প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে শ্রমের অধিকার ও তার সাথে সম্পর্কিত জনগণের কল্যাণকামী প্রয়োজনকে সুনিশ্চিত করার সমস্ত আইনি ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
 


                           াজার অর্থনীতিতে শ্রমিকের শ্রমশক্তি একটি পণ্য হলেও অন্যান্য সব পণ্যের সাথে এর সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। শ্রমশক্তি ব্যয় হওয়ার আগে পর্যন্ত এই পণ্য জীবন্ত শ্রমিকের সাথে ওতোপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। শ্রমশক্তি হচ্ছে জীবন্ত ব্যক্তির শ্রম করার ক্ষমতা যা শ্রমিকের উৎপাদনশীল ভোগের উপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিক, ামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারিত হয়। শ্রমই একমাত্র পণ্য যা মজুরি ও উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের উপর নির্ভর করে উৎপাদিত হয় না। সেটা উৎপাদিত হয় বাজারের পরিধির বাইরে পরিবার ও গৃহের অভ্যন্তরে যেখানে বাজার ও রাষ্ট্র বাইরে থেকে তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও তাকে আত্মস্থ ও ব্যবহার করে। অনুরূপভাবে, তিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নির্দিষ্ট ভারতীয় বর্ণব্যবস্থাকে কী পুঁজিবাদী অসম বিকাশের কাঠামোয় আত্মস্থ করে নিতে পারে না? ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা একইসাথে স্তরীভূত ও বহুধা খণ্ডিত। এই স্তরীভবন ও খণ্ডিকরণ একই মতাদর্শের অঙ্গ ও এই মতাদর্শের ধারক হিসেবে গভীরে প্রোথিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই হচ্ছে বর্ণব্যবস্থা। কিন্তু এই ব্যবস্থাটি সে অর্থে অদ্বিতীয় নয় যাতে স্তরীভূত ও বহুধাবিভক্ত শ্রমবাহিনীকে ভারতবর্ষের অসম পুঁজিবাদী বিকাশ উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের কাঠামোয় আত্মস্থ করে নিতে নিতে পারে না। উপরন্তু সম্মতিসূচক আধিপত্য ও বলপ্রয়োগ শুধুমাত্র ভারতবর্ষের মত পিছিয়ে পড়া দেশের বৈশিষ্ট্য নয়, ুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় বলপ্রয়োগের বৈশিষ্ট্য উন্নত পুঁজিবাদী পশ্চিমী দেশেও বিদ্যমান। সম্প্রদায়গত পরিচিতির সাথে শ্রমিকের সাংস্কৃতিক যোগসূত্র তার জীবনধারণের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে যা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন শ্রমের চেয়ে অধিক উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের উপযোগী। অন্যদিকে গোষ্ঠীগত আদিম চেতনা শ্রমিক শ্রেণিকে বিভাজিত করার উপযোগী এবং ঐ বৈশিষ্ট্যে আধুনিকতা-বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি ও পুঁজিবাদীদের স্বার্থ এক জায়গায় মিলে যায়।


                কায়িক শ্রমিক ও সার্ভিস সেক্টরে নতুন কর্মীদের ক্ষেত্রে এই ঘটনাপ্রবাহ দৃশ্যমান। আই.টি সেক্টরের সাফল্যের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে এই যে এই সেক্টরের সাথে শহুরে বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তদের প্রাগ্রসর শিক্ষা, ইংরেজি জ্ঞান এবং কিছু পরিমাণে পশ্চিমী সামাজিক ধ্যান-ধারনা ও আচার আচরণ সহ তাদের সাংস্কৃতিক পুঁজিকে ব্যবহার করতে পেরেছে। উচ্চবর্ণের বাইরে অন্যান্য বর্ণের মধ্যবিত্তরাও কিছু পরিমাণে এই সেক্টরে সামিল হয়েছে, কিন্তু বর্ণ-বিভাজনের প্রাচীরকে অতিক্রম করতে পারেনি। চা-শ্রমিকদের মত প্ল্যান্টেশন লেবারদের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ জমানায় শ্রম-শোষণের বা মার্ক্সীয় ভাষায় উদ্বৃত্ত শ্রমের মূল্য আহরণের ক্ষেত্রে পুঁজি বহুলাংশে নির্ভর করত বলপ্রয়োগ বা অর্থনীতি বহির্ভূত শোষণের উপর। উপরন্তু চা-বাগান গড়ে উঠেছিল মূলত প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় যেখানে শ্রমিকরা বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক খাদ্য অত্যন্ত কম পরিশ্রমে সংগ্রহ করার ফলে প্রয়োজনীয় শ্রমের মূল্যকে কমিয়ে রাখার সহায়ক ছিল। এই দ্বিবিধ কারণে চা-শিল্পে নিয়োজিত পুঁজির কাছে শ্রম শক্তির ব্যবহারিক মূল্য ও উদ্বৃত্ত মূল্য (মুনাফা) ছিল অত্যন্ত বেশি। স্বাধীনতা-উত্তর দীর্ঘ পর্যায়ে পারিপার্শ্বিক উন্নয়নের ফলে প্রাকৃতিক খাদ্য আহরণের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে আসায় চা-শিল্প থেকেই শ্রমিকদেরকে মজুরি হিসেবে পাওয়া প্রয়োজনীয় শ্রমের মূল্যের উপরই জীবনধারণ নির্ভরশীল। ব্রিটিশ আমলের প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ বন্ধ হয়ে গেলেও অপ্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগের নানা প্রাতিষ্ঠানিক কূটচাল এখনও বজায় রয়েছে এবং শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা প্রসূত দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে নিরিখ (task)বৃদ্ধিও অন্তিম সীমায় পৌঁছে গেছে। জাতিগত শোষণের অবশিষ্ট চরিত্র বজায় থাকায় চা-শ্রমিকরা এখনও সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত। কিন্তু পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে এভাবে ন্যূনতম মজুরি না দিয়ে অতি-মুনাফা আহরণ শ্রমিকরা আর বেশিদিন মেনে নেবে না। দ্রুত নগরায়ণ ও শহর-নগরের বিস্তৃতির পরিস্থিতিতে নির্মাণ, পরিবহণ ক্ষেত্র ও আনুষঙ্গিক বিবিধ ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত হতে গড়ে উঠছে প্রব্রজিত অসংগঠিত শ্রমিকদের বিশাল বিশাল ঘেঁটো। এই শ্রমিকদের না আছে শ্রমের নিরাপত্তা, না নাগরিক সুবিধা। দ্রুত বেসরকারিকরণের ফলে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা গরিষ্ঠাংশ নাগরিকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিল্পের নামে জমি জবরদখল ও কৃষির বাণজ্যিকীকরণ, কেন্দ্রীভূত বৃহৎ কারখানা উৎপাদনের পরিবর্তে অ্যাসেম্বলি-লাইন পদ্ধতির মাধ্যমে শিল্প-উৎপাদন, বেসরকারিকরণ ও অস্থায়ী ও ঠিকা প্রথায় শ্রমিক নিয়োগের পদ্ধতি ইত্যাদির উপর গুরুত্ব আরোপের ফলে সর্বহারা ও নিঃস্ব শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে চলেছে। আশির দশক থেকে চালু উদার অর্থনীতি ইতিমধ্যে উৎপাদন সম্পর্কেও পরিবর্তন সাধন করেছে। সংগঠিত শ্রমিক ইউনিয়নের দরকষাকষির ও         নীতি-নির্ধারণে প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা এখন একেবারে তলানিতে। সাম্প্রদায়িক-ফ্যাসিস্ট রাজনীতির প্রভাবাধীন ইউনিয়ন তাদের প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শগত আবেগের ছত্রছায়ায় শ্রমিক সদস্য সংখ্যা কিছু পরিমাণে ধরে রাখতে সক্ষম রয়েছে, বাকী ইউনিয়নগুলির সদস্য সংখ্যা প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বায়নের নতুন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে  শ্রমিক ইউনিয়নগুলিকে যদি তাদের রণনীতি নির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে নিঃস্ব ও অসংগঠিত শ্রমিকবাহিনী কোন বিকল্পের অভাবে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের দিকে আকর্ষিত হবে। এমতাবস্থায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলি কী কর্মসূচীর ভিত্তিতে সংগ্রাম গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে?



  প্রথমত, রাষ্ট্রের কল্যাণকামী সামাজিক সুরক্ষাগুলি ভেঙে দেওয়ার এবং শ্রম-আইন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট সংশোধন করে ইউনিয়ন করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার যে কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ১০০ জনের কম শ্রমিক সংখ্যার কারখানায় ইউনিয়ন নিষিদ্ধ করার সরকারের যে প্রস্তাব তা আপাত দৃষ্টিতে ক্ষুদ্র মালিকদের সহায়ক মনে হলেও, আজকের বহুজাতিক পুঁজির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতিতে সে পদক্ষেপ আসলে কর্পোরেট সেক্টরের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই করার চেষ্টা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সকল শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ব্যাপক সংগ্রাম গড়ার পাশাপাশি সব জনগণের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা আদায়ের সংগ্রামও গড়ে তুলতে হবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলিকে। দিল্লির বিশাল বিশাল কলোনিগুলোতে নাগরিক সুবিধা আদায়ের কর্মসূচীতে আপ’-এর ভূমিকার ফলে নির্বাচনে তাদের যে ব্যাপক সাফল্য দিয়েছে তা এই বিষয়গুলির গুরুত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, রূপের ও জনগোষ্ঠীর দিক থেকে বিচার করলে নির্দিষ্টভাবে সীমাবদ্ধ, কিন্তু অন্তর্বস্তুর দিক থেকে সর্বজনীন সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু নিয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে যাতে সামগ্রিকভাবে শ্রমিকের চেতনার মানোন্নয়নের এক প্রক্রিয়া নিরন্তর চালু থাকে। কিন্তু উৎপাদন এবং বণ্টন প্রক্রিয়া, জীবনধারণের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা ও মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার কার্যকলাপের উপর মেহনতি মানুষের যৌথ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ইউনিয়নকে পরিচালিত না করলে, বর্তমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেহনতি মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ীগত শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এরজন্য প্রয়োজন প্রতিটি গ্রাম-শহরে, পঞ্চায়েতে, ওয়ার্ডে, মহল্লায়, কারখানায় ও প্রতিটি জনপদে মেহনতি মানুষের ইউনিয়ন কমিটি গড়ে তোলা ও এই কমিটিগুলো যাতে সাধারণ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে মেহনতি মানুষকে পরিচালিত করতে পারে তারজন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও উৎসাহ দিতে হবে। এই কমিটিগুলোকে এই লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে যাতে এগুলি স্থানীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শুধুমাত্র প্রতিস্পর্ধী শক্তি (counterveiling force) নয়, হয়ে উঠতে পারে মেহনতি মানুষের বিকল্প প্রতিষ্ঠানও। উচ্চতর কমিটিগুলো ও আগসারির নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রক না হয়ে সহযোগী ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দিশা নির্ধারণের জন্য সচল ও উদ্যমী ভূমিকা পালন করতে হবে। কমিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সমালোচনা ও আত্ম-সমালোচনার পদ্ধতি এক কার্যকরী পদ্ধতি তো নয়ই, বরঞ্চ শ্রেণি সংগ্রাম থেকে সংগঠনকে বিযুক্ত করে দেখার এক বিপদজনক প্রক্রিয়া, সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রাখতে হবে শ্রমিকের স্ব-উদ্যোগ ও স্ব-পরিচালনা। পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে আনার সুদূরপ্রসারী চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার আগে বিষয়ীগত বিকল্প শক্তির বিকাশের লক্ষ্যে সংগঠনকে পরিচালিত করতে হবে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণও এক বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতির বর্তমান বিকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজি উৎপাদন সম্পর্ককে অর্থাৎ পুঁজি-শ্রমের সম্পর্ককে পুনর্বিন্যস্ত করতে চাইছে, শ্রমিক শ্রেণি তাকে চ্যালেঞ্জ জানাবেই। তবে এই চ্যালেঞ্জ পুঁজির কাছে পুনরায় অধীনতা স্বীকার করেই শেষ হবে, না পুঁজির আধিপত্যকে ভেঙে দিতে সক্ষম হবে তা নির্ভর করছে শ্রমিক আন্দোলনে সঠিক দিশার উপর। তাই বর্তমান সময় ধ্বংস ও সৃষ্টি, বর্বরতা ও সমাজবাদের এক যুগ-সন্ধিক্ষণ যার মাপকাঠি হিসেবে দিশাহীনতা এক ভয়ঙ্কর রূপে বিরাজমান।        

Memorandum on tea-workers’ plight.

Posted by স্বাভিমান

To,
The Honourable Chief Minister
Government of Assam
Dispur, Guwahati.
(Through Asstt. Labour Commissioner, Silchar)

Sub – Memorandum on tea-workers’ plight.

Respected Sir,
We, on behalf of Assam Mojuri Shramik Union, would like to place the following points before you for your kind perusal and immediate needful action.

(1) In the Minimum wage schedule declared by the Government of Assam in the year 2013, there was categorical mention of the name of Plantation worker, and according to that schedule the minimum wage of Plantation worker was Rs 169.00. Your directive in this regard is a most welcome step. In this recent circular, you have directed the labour department to issue notification for treating the minimum wage of Plantation (Tea) worker as Rs. 169.00. But till date, no such notification issued. The tea-workers of Assam should not be deprived of their legitimate right to avail the law of the land and as such they need to be brought under the purview of the Minimum Wage Act. Due issuance of notification in this regard considering variable dearness allowance along with basic wage should be ensured on the basis of your directive.

(2) In contravention to the above stated facts and without taking the above-mentioned minimum wage schedule into cognizance, the wage of the tea-workers is being settled through bi-partite negotiations below the scheduled minimum wage. This process must be terminated forthwith and due process of the wage settlement above the minimum wage through tripartite negotiation with all the unions must be restored.

(3) The labour commissioner has recommended that our union should be invited to the wage board constituted at your behest. But it is surprising to note that our union has not received any such invitation.

(4) There must be parity of wages for the workers engaged in the similar industry throughout India. But not to speak of the nation, we have a differential wages of tea- workers in the same state of Assam. 
                                                  
Through bipartite agreement, the wages of tea-workers of Brahmaputra valley has already been hiked from Rs. 95 to Rs. 115, but tea-workers of Barak Valley is getting a meager amount of Rs. 75 per day till date.

Furthermore, the plantation in Tamil Nadu, Kerala and Karnataka pay daily wages of Rs 206.22, Rs. 222.97 and Rs.228.35 respectively in addition to providing all the facilities under plantation labour act. Productivity per labour (Kg of made tea per worker) is 705 Kg in Assam whereas it is only 613 Kg for Tamil Nadu and 688 Kg for Kerala. The price of tea in the auctions in 2012-13 was Rs. 142 per Kg for northern states including Assam and Rs. 93 for the southern states. Hence even though productivity and prices are higher in Assam, labour gets at least Rs 100 less than those who work in southern India. The southern states do not provide subsidized foodgrain, but the monetary value of wage-in-kind provided as ration for the tea-workers of Assam is only Rs. 14.20. The quality of ration is also sometime very poor and there is lot of corrupt practices to deprive the workers from their legitimate right to get wages in kinds.

So, the nationwide parity of wages for the workers in the same industry should be established through wage revision.

(5) The last but not the least is the question of proper implementation of provisions of Plantation Labour Act. Your recent directive in this regard is a most welcome step, but the follow up actions in this regard for implementation of the same at ground level needs to be ensured.


Dated Silchar                                      Yours faithfully
The 1st June, 2015
                                                                      sd/-         
                                                        (General Secretary)
                                                 Assam Mojuri Shramik Union
                                                     Assam State Committee 
                   Office Address : C/o Mrinal Kaniti Shome

                                          
Copy to :   (1) The Labour Commissioner, Guwahati.
                 


                                                   (General Secretary)

১৯৮৩র অসমঃ নিপীড়িত বাঙালি হিন্দু

Posted by সুশান্ত কর Labels: , , , , ,



দিগন্ত শর্মা
(দিগন্ত শর্মা, সাদিন কাগজের সাংবাদিক এবং অনুসন্ধানী লেখক। এর আগে তিনি  ‘ নেলি ১৯৮৩নামে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখেছিলেন তিনি। বর্তমান অনুবাদক  সেটি বাংলাতে অনুবাদ করেছিলাম। দু’টিই আগে পরে বই হিসেবে বেরোয়। সেই বইতে মূলত ধরা হয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের  উপরে নেমে আসা আক্রমণের  ছবি। এবারে বাঙালি হিন্দুর উপরে কেমন অত্যাচার নেমে এসেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে তিনি ঘুরেছেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার  পূব থেকে পশ্চিমে। আর লিখছেন এই নিবন্ধ। ধারাবাহিক ভাবে এটি এই ব্লগ ছাড়াও প্রকাশিত হবে, আরো দুই একটি ব্লগে এবং ছাপার অক্ষরে বেরুবে শিলচর থেকে প্রকাশিত চন্দন সেনগুপ্ত সম্পাদিত মাসিক ‘অরুণোদয়ে’। লেখকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে যোগাযোগ করুন, এই নম্বরে: ৯৮৫৪৬-৩১৯২৮। )
( মিছিলা নমশূদ্র)


মূল অসমিয়াঃ দিগন্ত শর্মা

বাংলা অনুবাদঃ সুশান্ত কর





প্রস্তাবনা
             ৯৭৯এর প্রথম ভাগে অসমের মঙ্গলদৈ লোকসভা সমষ্টির সাংসদ হীরালাল পাটোয়ারির আকস্মিক মৃত্যু হয়। সে বছরের শেষের দিকে আসনে উপনির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন আয়োগ। একই সঙ্গে ঐ বছরের এপ্রিল মাস থেকে ভোটার তালিকাতে নাম ভুক্তির কাজ আরম্ভ করে। মেমাস অব্দি এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ অব্যাহত ছিল। কিন্তু মেমাসের প্রথম সপ্তাহে ভোটার তালিকাতে প্রচুর অবৈধ বিদেশীর নাম ঢোকে গেছে বলে এক অভিযোগ উত্থাপিত হয়  বলা হয়, কংগ্রেস (আই) দল নিজের ভোট ব্যাঙ্ক শক্তিশালী করতে কৌশলে  সন্দেহজনক নাগরিকের নাম ভোটার তালিকাতে ঢুকিয়েছে।  এই অভিযোগ উত্থাপন করে পুরো আসাম কাঁপিয়ে তোলে সারা আসাম ছাত্র সংস্থা  এর আগে অসমে বিদেশী অনুপ্রবেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে সারা আসাম ছাত্র সংস্থা, সংক্ষেপে ‘আসু’ বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচী রূপায়ণ করে আসছিল। অন্যদিকে সংসদে তখন ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী ১৯৭৯র আগেই অসম সহ সমগ্র পূর্বোত্তরে বাংলাদেশীদের অবাধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে বলে বক্তব্য রেখেছিলেন। সেই বক্তব্য অসমের একাংশ সচেতন ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বকে আন্দোলনমুখী করে তোলে। এর আগে ‘আসু’ মুখ্যমন্ত্রী গোলাপ বরবরাকে কয়েক দফা দাবি সম্বলিত স্মারকপত্র প্রদান করেছিল। এমনকি তারা প্রধানমন্ত্রীকেও সত্তর দশকের মধ্য ভাগ থেকেই নানা দাবিতে স্মারকপত্র দিয়ে আসছিল। কিন্তু কেন্দ্রের সরকার সেই সব সমস্যা সমাধানের জন্যে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেয় নি। ১৯৭৭এ জরুরি অবস্থার পরে কেন্দ্রের সরকার বদল হলো।  অসমেও সরকার বদল হলো। একই সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন সারা আসাম ছাত্র সংস্থারও নেতৃত্ব বদল হলো। আসুর নেতৃত্বে এলেন প্রফুল্ল কুমার মহন্ত এবং ভৃগু কুমার ফুকন।  মঙ্গলদৈ লোকসভা আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত বিদেশী নাগরিকের প্রশ্নটিকে আসুনেতৃত্ব বড় করে তোলে ধরলেন। মঙ্গলদৈ লোকসভা চক্রে ভোটার তালিকাতে বিদেশী নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে নির্বাচনী আয়োগের কার্যালয়ে হাজার হাজার অভিযোগ পত্র প্রেরণ করে। নির্বাচনী আয়োগ সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষাও করেন। গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে নির্বাচন আয়োগও এই সব অভিযোগ-পত্রের ৬৪.২৮% সত্য বলে ঘোষণাও করে। অর্থাৎ আয়োগ স্বীকার করে নেয় যে প্রায় ৪৫,০০০ ভোটার এই চক্রে       সন্দেহজনক নাগরিক।
          
              
           
মিছিলা নমশূদ্র
এই ঘটনা পুরো আসামকে উত্তেজিত করে তোলে। মঙ্গলদৈর ঘটনাকে আধার করে আসু দাবি তোলে সারা রাজ্যের ১৩টি লোকসভা আসনের ভোটার তালিকাই প্রকাশ করতে হবে এবং বিদেশী নাগরিকের নাম সেগুলোর থেকে বাদ দিতে হবে।  মঙ্গলদৈর ঘটনা রাজ্যের ভূমিপুত্র এবং মধ্যবিত্তদের একাংশকে উত্তেজিত এবং আবেগিক করে তোলে। তাদের বিদেশী বহিষ্কারের দাবিকে আসামের আরো কিছু জাতীয় সংগঠনও সমর্থন জানায়।  বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ থেকে অসমে প্রব্রজন অব্যাহত আছে বলে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়।  ১৯৭৯তে ‘আসু’র নেতৃত্বে বিভিন্ন দল-সংগঠনের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সর্বদলীয় সভাতে সারা আসাম গণ-সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ‘আসু’র নেতারাই এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। অসম সাহিত্য সভাও এই সংগঠনে সামিল হয়।আসুর সভাপতি প্রফুল্ল কুমার মহন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এক স্মারক পত্র প্রেরণ করেন, যেখানে অসমে অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যা তুলে ধরা হয়। এর পরেই আরম্ভ হয় আন্দোলনের কর্মসূচী---প্রতিবাদী মিছিল, বন্ধ, গণ-সত্যাগ্রহ ইত্যাদি ইত্যাদি...।
         
             
দিগন্ত শর্মার আগেকার বইএর বাংলানুবাদের প্রচ্ছদ
     দিল্লিতে সরকার বদল হয়। ইন্দিরা গান্ধি আবার রাজপাট দখল করেন। দিসপুরে বারবার সরকার গঠন এবং পতনের ঘটনা ঘটে। ‘আসু’র বিদেশী কেন্দ্রিক আন্দোলন সারা রাজ্যকে উত্তাল করে তোলে। সংগঠিত হয় নানা হিংসাত্মক ঘটনা। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারী নেতৃত্বের কয়েক দফা বৈঠক হয়ে যায় কিন্তু এই সব আলোচনা-বৈঠক সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারল না। আন্দোলনকারী নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হলো না। ফল-স্বরূপে অসম থেকে এই বিদেশী বিতাড়ন বা বহিষ্কার এক জ্বলন্ত সমস্যা রূপে মাথা তোলে। আসু, গণ-সংগ্রাম পরিষদ তথা আন্দোলনকারী নেতা, কর্মী, সমর্থকেরা বিদেশীর বিরুদ্ধে নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে গোপনে শলা-পরামর্শ করতে শুরু করে। ‘বিদেশীরা আছে কই?’ ‘বিদেশী কারা?’ ‘ বিদেশী প্রধান অঞ্চল কোনগুলো...?’ এসব কথার ব্যাপক গুঞ্জন ওঠে।  একাংশ লোক ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতে  বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান বসতি-প্রধান এলাকাগুলোই বিদেশীর বাসস্থান  বলে চিহ্নিত করে।  সেই প্রব্রজনকারী বা আভ্যন্তরীনভাবে স্থানান্তরিত (internally displaced) মানুষ যে এলাকাগুলো দখল করে বসতি স্থাপন করেছিলেন সেই এলাকাগুলো দখলমুক্ত করবার জন্যে একাংশ নেতা-কর্মীদের গোপন আহ্বান  ছড়িয়ে দেয়া হয়।  আন্দোলনের সমর্থক হাজার হাজার মানুষ এই সব ‘বিদেশী’দের তাড়িতে দেবার জন্যে নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন, কোথাও বা তা হিংসাত্মক আকারও নেয়। একই সঙ্গে ‘আসু’, গণ-সংগ্রাম পরিষদ নেতৃত্ব প্রশাসনযন্ত্রকেও অচল করে দেবার জন্যে বহু গোপন বেআইনি কর্মসূচী শুরু করে। এরই মধ্যে ইন্দিরা গান্ধি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে অসম বিধান সভার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৭৯র থেকে বেশ কবার অসম রাষ্ট্রপতি শাসনাধীনও ছিল। সেখানে কেন্দ্রের কংগ্রেস (ই) সরকার নির্বাচন করবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে প্রত্যাহ্বান জানিয়ে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে আবেদন করা হয়। ন্যায়ালয় সেই আবেদন ১ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রত্যাখ্যান করে। ইন্দিরা গান্ধি সঙ্গে সঙ্গে যে সব কর্মচারী নির্বাচনের কাজে  অংশ নেবেন তাদের জন্যে গ্রুপ ইন্সিওরেন্সের সুবিধে দেবার কথা ঘোষণা করেন। আর ঐ ১ ফেব্রুয়ারির থেকেই অসম পরিণত হয় এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে। জাতীয় সংগঠনগুলোর বিরোধিতাকে অবজ্ঞা করে ইন্দিরা গান্ধি নির্বাচনী প্রচারও করেন। অসমের ভূমিপুত্রের (খিলঞ্জিয়া) একাংশ এই নির্বাচনকে অবৈধ আখ্যা দেন। আন্দোলনকারীরা নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানান। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ এই আহ্বানকে সমর্থন জানান। পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও, রাস্তা-ঘাট বন্ধ, সেতু জ্বালিয়ে দেয়া ইত্যাদি আরম্ভ হয়। পুলিশের গুলিতে বেশ কিছু ছাত্রনেতার মৃত্যুও হয়। রাজ্যের পরিস্থিতি হয়ে পড়ে অগ্নিগর্ভ। ওদিকে বাঙালি অধ্যুষিত বিভিন্ন       অঞ্চলে আক্রমণ নামাবার গোপন পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়। অসমিয়ার অস্তিত্ব রাখতে অসমকে বিদেশী মুক্ত করতেই হবেতারজন্যে বিদেশী তাড়াতে হবে। ‘আহ আহ ওলাই আহ! খেদ ঐ খেদ , বিদেশীক খেদ!’ স্লোগানে মুখরিত হয় আকাশ। কিন্তু কোথাকার বিদেশী তাড়াবে?  কিছু নেতারা বিভিন্ন জেলার চরঅঞ্চল, বনাঞ্চল, গ্রেজিং এলাকা, পতিত ভূমি, সরকারি খাস জমিতে বসবাস করা বাঙালি হিন্দু –মুসলমানকে বিদেশি বলে শনাক্ত করে  সেই এলাকাগুলোতে পরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ নামাতে শুরু করেনমঙ্গলদৈ চাউলখোয়া চরঅঞ্চল, নগাঁও (এখনকার মরিগাঁও) জেলার নেলি অঞ্চল, মৈরাবাড়ি, কামপুর, চামগুড়ি, কামরূপ জেলার গোরেশ্বর, চমরিয়া, নলবাড়ির মোকালমোয়া, দরং জেলার খৈরাবাড়ি-কলাই গাঁও ইত্যাদি জায়গাতে আন্দোলনকারীরা নৃশংস আক্রমণ নামায়।  সেরকম এখনকার ধেমাজি জেলার  (তখনকার লখিমপুর জেলা)  বিষ্ণুপুর, শান্তিপুর  ইত্যাদির বাসিন্দা হিন্দু বাঙালিদের উপরে ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ থেকে ধারাবাহিকভাবে ভয়াবহ  আক্রমণ  নেমে আসে। অসমিয়া এবং জনজাতীয় হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়ে অত্যন্ত নির্মম এবং জঘন্য আক্রমণ নামায় শিলাপাথারের কাছে ‘আর্নে’ বলে এক বিশাল চরঅঞ্চলে। সেই নিরীহ বাঙালিরা বিদেশী বহিষ্কার আন্দোলনে  সৃষ্ট সংঘাতময় পরিবেশের কেমন বলি হয়েছিলেন, সেই সংঘাতের আগেকার এবং পরবর্তী প্রব্রজন  (Migration) বা স্থানান্তরণ (Displacement)  পরিস্থিতি, সংঘাত পরবর্তী ন্যায় ব্যবস্থার এই সব মানুষের জীবনে কী রকম প্রভাব ফেলেছে, পরবর্তী কালে শান্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে এই সব নির্যাতিত মানুষের ভূমিকা কী ছিল... অগ্নিগর্ভ ১৯৮৩ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা আসামেই বাঙ্গালিরা কী রকম নির্যাতিত হয়েছিলেন---ক্ষেত্র-ভিত্তিক অধ্যয়ন করে এই লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
                                                                       

(এক)

সবুজ আর্নে চরের রক্তাক্ত অধ্যায়
           
         
  ছেঁড়া পা ছুঁয়ে মিছিলা নমশূদ্র নীরবে কাঁদছিলেন
       ‘সেদিন সকালে উঠে বাড়িতে এটা ওটা করছিলাম। ছেলেমেয়েরা উঠোনে ছিল। ওদের বাবা একবার ঘরে যান, আরেকবার আসেন। গ্রামের বুঝদার মানুষেরা দিন দুই আগেই ধেমাজির দিকে অনেক বড় গণ্ডগোলের কথা শুনেছিলেন।  সেদিনও আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে অনেক হৈ হট্টগোল কানে আসছিল। কোথায় কী হচ্ছে---কিছুই ধরতে পারছিলাম না। কিন্তু হঠাৎই সকালে সকালে আমাদের গ্রামেও চিৎকার চেঁচামেচি, হুলস্থূল, কান্নাকাটি, মার ধর আরম্ভ হয়ে গেলো। হাজার হাজার লোকে ঘিরে ফেলল আমাদের গ্রাম। ওদের হাতে দা, বর্শা, বল্লম, বন্ধুক, তির-ধনুক, লাঠি আর জ্বালানো মশাল...। গ্রামের লোকেরা পালাতে শুরু করলে যাকে যেখানে পেলো কোপাতে শুরু করল। আক্রমণকারীদের কেউ বা লাঠি দিয়ে মারল, কেই তির ধনুকে, কেউ বা বন্দুক দিয়ে গুলি করল। আমি বাড়ির উঠোন থেকে ছেলেমেয়ে দুটোর হাতে ধরে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলাম। আমার স্বামী আর বড় মেয়ে রীণাও দৌড় দিল। কিন্তু সেরকম দৌড়োচ্ছি যখন তখনি অস্ত্র হাতে লোকগুলো আমাদের ঘিরে ফেলল। ওদের কেউ একজন আমাকে লম্বা একটা ডেগার দিয়ে ঘা বসালো। ঘাটা আমার পায়ে লেগে পা একটা দুই টুকরো হয়ে গেলো। হাঁটুর নিচের টুকরোটি ছিটকে দূরে পড়ে গেলো আর আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।” কথাগুলো বলে মিছিলা নমশূদ্র নামের পঁয়ষট্টি বছরের মহিলা থামলেন কিছুক্ষণ। শাড়ির আঁচলে দুই গাল বেয়ে নামা চোখের জল মুছলেন। খানিকক্ষণ তিনি মাথা নত করে রইলেন। একটি পিড়িতে বসে কথা বলছিলেন তিনি। এইবারে তিনি দুই হাতে শাড়ি কুঁচকে বাঁ পা দেখালেন ---‘এই দেখুন...’
           মিছিলা নমশূদ্র যখন আমাদের কথাগুলো বলছিলেন কচি কাঁচা ছেলে মেয়ে, যুবক যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা পাশে দাঁড়িয়ে বসে সব কথাই শুনছিলেন। কিছুক্ষণ সবাই নির্বাক হয়ে পড়লেন। নীরবতা ভেঙ্গে আমরাই মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার পরে কী হলো?’
 ‘তারপরে আমি সেখানেই পড়ে রইলাম। পরে গ্রামের অন্য মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে এলেন স্বামী। জ্ঞান যখন ফিরে এলো, আমার অবশিষ্ট পাটুকু কাপড়ে বাঁধা ছিল। অসহ্য ব্যথায় আমি ছটফট করছিলাম। এরই মধ্যে আমি স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম ছেলেমেয়ের কথা। তখনই তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, আমাদের বারো বছরের ছেলে বিজয় আর ছয় বছরের মেয়ে শ্রীমতীকে ঘাতকেরা কেটে মেরে ফেলেছে। আমি যেখানে পড়ে ছিলাম, সেখানেই বুঝি বিজয় আর শ্রীমতীরও মৃতদেহ পড়ে ছিল।  স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম, বড় মেয়ে রীণা কই? তিনি বললেন, রীণার (১৬) হাতে দায়ের ঘা পড়েছে, পিঠে একটা তির বিঁধেছে। ওকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে হয়তো ওরা মৃত বলে ভেবেছিল, ছেড়ে চলে গেছে। আমার পা কাটার যন্ত্রণা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল এই সন্তান হারাবার দুঃখ, এরপরে স্বামী আমাকে  ভৈরবপুর আশ্রয় শিবিরে নিয়ে এলেন...।’ 
        
         
নাম তাঁর পক্ষ নমশূদ্র।
     ‘শিবিরে কদিন থাকলেন?’
            ‘ঠিক মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে---আমার এই পা আর সন্তানকে কেড়ে নিয়ে গেছে অসমিয়াদের যে আক্রমণ সেটি ঘটেছিল ১৯৮৩র ফেব্রুয়ারি মাসে। মানে ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। সেদিনটির পরে আর আমি স্বামী ছাড়া নড়াচড়া করতেই অক্ষম হয়ে গেলাম।  এদিকে আমাদের বাড়িঘরও আক্রমণকারীরা জ্বালিয়ে ফেলেছিল। আশ্রয় শিবির থেকে প্রথমে লখিমপুর হাসপাতালে, পরে ডিব্রুগড় হাসপাতালে থেকে মাস ছয়েক চিকিৎসা করালাম।   এর পরে গ্রামে যদিও বা ঘুরে এলাম বছর না ঘুরতেই হঠাৎই একদিন আমার স্বামী  নরেশ নমশূদ্রের মৃত্যু হলো। বাড়িতে পড়ে রইলাম সেই দাঙ্গাতে পঙ্গু আমি আর আমার কন্যা। আমার পা নেই, আর কন্যা রীণার আহত হাত। উঃ কী যে যন্ত্রণা...!’
            ছেঁড়া পা ছুঁয়ে মিছিলা নমশূদ্র নীরবে কাঁদছিলেন। তাঁর বয়স এখন ষাট পার করেছে। ৩২ বছর আগে বিদেশী বিতাড়নের নামে  অসমিয়া জাতির অস্তিত্ব রক্ষার নাম নিয়ে হাতে কর্মে একাংশ বাঙালির উপরে যে হিংস্র আক্রমণ সংঘটিত হয়েছিল, তারই সাক্ষী হিসাবে আজও ধেমাজি জেলার শিলাপাথার থানার অন্তর্গত আর্নে রামনগর গ্রামে আছেন মিছিলা নমশূদ্র। স্বামীর মৃত্যুর পরে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছিলেন মিছিলা। কিন্তু আন্দোলনকারী দায়ের ঘায়ে আহত কন্যা রীণাকে স্থানীয় এক তরুণ বিয়ে করে, মিছিলার দৈনন্দিন জীবনের চালিকা শক্তি এখন সেই মেয়ে জামাইই।   দুখানি ক্র্যাচ দু’দিকে ধরে কোনোক্রমে চলাফেরা করেন মিছিলা। প্রতিমুহূর্তে তাঁর ছেঁড়া পা তাঁকে মনে করিয়ে দেয় অসমিয়া জাতির সংগঠিত সেই নৃশংসতা আর বর্বরতার কথা। শুধু যে এই মিছিলা নামের মহিলাটির বেলা, তাই নয়। বৃহত্তর আর্নে চর অঞ্চলে মিছিলা নমশূদ্রের সেই ছিন্ন পাখানি এখন অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদের নির্মম ঘৃণনীয় তথা নারকীয় অধ্যায়ের জ্বলন্ত সাক্ষ্য। মিছিলা যখন ক্র্যাচ দু’খানাতে ভর করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়ান, তখনই যেন গ্রামবাসীর (সে সময়ের ভুক্তভোগী) চোখে ভেসে উঠে নৃশংস সেই সব আক্রমণের ছবি।
        
            
পক্ষের শূন্য কপাল
   আর্নে রামনগর গ্রামে মিছিলা যখন আবেগ বিহ্বল হয়ে অসমিয়া ভাষী স্থানীয় জনজাতি মানুষের সেই আক্রমণের কথা বর্ণনা করছিলেন তখন কাছেই বসে ছিলেন আরেক মহিলা। মিছিলার কথা শেষ হবে হচ্ছে করতেই সেই মহিলা বলে উঠলেন, ‘ সেই আক্রমণের দিনটিতে আমার বিয়ের মাত্র সাতদিন হয়েছিল। আগের রবিবারে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। পরের রবিবারে আমরা আক্রান্ত হলাম। আমাকে আর্নে রামনগরে বিয়ে দিয়েছিলেন। দুদিন আগেই গেছি স্বামীর ঘরে। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে একদিন কাটাতে না কাটাতেই সেই আক্রমণ নেমে এলো...’
              মহিলাটি কথা থামালেন। খানিক সবাই নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপরে বড় কষ্টে আটকানো গলাতে মহিলাটি বলে গেলেন, ‘ সেদিন আমার সামনেই স্বামীকে হত্যা করল ওরা। আমাকেও আক্রমণকারীরা মারতে আসছিল। স্বামী আমাকে দৌড়ে পালাতে বলে নিজে ওদের বাধা দিতে দৌড়ে গেলেন। দুই পা দৌড়ে গেছি কি পেছনে ফিরে দেখি, আমার স্বামীকে কোপাচ্ছে ওরা। উনি গড়িয়ে পড়ে গেছেন, সেই শরীরে লাঠি দিয়ে ঘা দিচ্ছে।  তারপরে কিছু লোকে আমাদের বাড়িতে আগুন দিল।  আমি দৌড়ালাম। ইতিমধ্যে গ্রামের মানুষজনও দৌড়োচ্ছে প্রাণ বাঁচাতে। আমি দৌড়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচালাম। কিন্তু আমার সিঁথির সিঁদুর হারালাম। বিয়ের মাত্র সাতদিন পরেই।' আমাদের সামনেই মহিলাটি হুহু করে কেঁদে ফেললেন। আমরা দেখে গেলাম শুধু---তাঁর দুই গাল বেয়ে নামছে চোখের জল। দেখে গেলাম, তাঁর শূন্য কপাল। গেল তিনটা দশক তিনি পার করেছেন এই দুঃখের বোঝা বয়ে বয়ে।  বিয়ের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোল। নাম তাঁর পক্ষ নমশূদ্র। আর্নে রামনগরের উপেন্দ্র নমশূদ্রের বাইশ বছরের ছেলে মাণিক নমশূদ্রের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল পক্ষের। মিছিলার ছিন্ন পা, পক্ষের শূন্য কপাল---অসমিয়া উগ্রজাতীয়তাবাদী , অসমের অস্তিত্ব রক্ষার নামে সংগঠিত ঘাতক বাহিনী এই সমাজকে দেয়া ‘নির্মম উপহার’ ।
(ক্রমশ:)
             
~~~~~~~০০০০~~~~~~~~~~~
লেখাটি আর যেখানে পড়া যাবেঃ
১) http://sushantakar40.blogspot.in/2015/05/blog-post.html
২)http://ishanerpunjomegh.blogspot.in/2015/05/blog-post_28.html

দুটি সংক্ষিপ্ত লেখা ঃ (১) সাবেরিদাকে আমি যেভাবে দেখেছি (২) মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও রাষ্ট্র

Posted by স্বাভিমান

সাবেরিদাকে আমি যেভাবে দেখেছি – অরূপ বৈশ্য
মূল্যায়ন নয়, চিত্রায়ণ
প্রয়াত আবুল হুসেন মজুমদার যাকে আমি অন্য অনেকের মত সাবেরিদা বলে সম্বোধন করতাম তাঁর সাথে প্রথম কখন পরিচয় ঘটে তার সন-তারিখ স্মরণে নেই। কী পরিস্থিতিতে পরিচয় ঘটেছিল তাও ঠিকঠাক মনে নেই। সম্ভবত চন্দনদার (চন্দন সেনগুপ্ত) সাথে রাজনৈতিক কোন বিষয়ে নিয়ে আলোচনার জন্য ওনার সাথে দেখা করেছিলাম। কোন কিছুর বিস্তৃত খুঁটিনাটি আমার স্মৃতিতে থাকে না। দীর্ঘদিনের পরিচয়ে যে বিশেষ সাধারণ বৈশিষ্ট্য মনে দাগ কাটে তা’ই স্মৃতির কোন এক স্তরে বাসা বেঁধে বসে থাকে। সাবেরিদা সেরকমই এক ব্যক্তিত্ব যার বিশিষ্টতা প্রশ্নাতীত। তাঁকে কেন্দ্র করে বিতর্কও কম ছিল না। সেটাই স্বাভাবিক। যার নিজস্ব মত আছে এবং যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের মতকে যুক্তির কাঠামোয় তুলে ধরার সৎ সাহস যার আছে তাকে নিয়ে বিতর্ক তো হবেই। সাবেরিদাকে অনেকে অনেকভাবে দেখেছেন। যেমন গল্পকার মলয় কান্তি দে যেভাবে দেখেছেন তা তাঁর ‘বদ্ধজলার মর্মকথা’ গল্পের চরিত্রের মধ্যে ফুটে উঠেছে। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ কোন স্মৃতিচারণ নয়, তাঁর অবদান নিয় কোন মূল্যায়নও নয়, আমার দেখা সাবেরিদাকে তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র।
ভাষার প্রশ্নে
নব্বইয়ের দশকের কোন এক সময়ে সাবেরিদার বাড়িতে ভাষার প্রশ্ন নিয়ে কথা হচ্ছিল। সাবেরিদাই মূলত কথা বলছিলেন, আমি তাঁর কথার বিরতিতে আমার মত ব্যক্ত করছিলাম। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ঘর থেকে সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের অডিবিএল বইখানা নিয়ে আসি। সম্ভবত বছর দু’য়েক পর সাবেরিদা আমাকে ফোন করে বললেন, “অরূপ, আমার অডিবিএল বইটা বোধহয় তোমার কাছে, আমার লাগছিল”। ভাষার উপর সেদিনের তাঁর কথা নিয়ে নিজের মধ্যে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করি। তাতে তাঁর সম্পর্কে আমার ধারণা হয় যে সাবেরিদা ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই বেশী গুরুত্ত্ব দেন, ভাষা যে উপলব্ধি - কনসেপ্ট ও চেতনার প্রকাশ সেব্যাপারটি তাঁর কাছে গৌণ। এর কিছুদিন পর গণতান্ত্রিক লেখক সংস্থার উদ্যোগে ভাষার অধিকারের প্রশ্ন নিয়ে শিলচর মহিলা কলেজে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নির্দিষ্ট বক্তা হিসেবে সাবেরিদা লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। সে পাণ্ডুলিপি এখন কারুর কাছে গচ্ছিত আছে কিনা আমার জানা নেই। সাবেরিদা তাঁর বক্তব্যে নিম্ন অসমের বাঙালি মুসলমানদের ভাষার অধিকার খর্ব হওয়ার ইতিহাস এবং তাদের অনগ্রসরতার আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন। অর্থাৎ মতাদর্শগতভাবে তাঁর অবস্থান যেখানেই থাকুক না কেন, তাঁর চিন্তার চালিকাশক্তি ছিল মানব-কল্যাণ ও সমাজের সবচাইতে নিপীড়িত সবহারাদের বিষয়।
ইসলাম ধর্মের প্রশ্নে
ইসলাম ধর্মের চর্চা, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা ও ইসলামে বিশ্বাসী মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে বিশ্বজোড়া বিভিন্নতা রয়েছে। আবার ইসলামে বিশ্বাসী একই সংগঠনের মধ্যেও স্থান-কালের বিচারে বিভিন্নতা রয়েছে। যে ওয়াহাবি মতবাদ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ‘বাঁশের কেল্লার’ লড়াইয়ে কৃষক বিদ্রোহী তিতুমীরের মত নিপীড়িত মানুষের পক্ষের নায়কের জন্ম দেয়, আজ সেই ওয়াহাবি মতবাদকে অন্যত্র সাম্রাজ্যবাদীরা ব্যবহার করছে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে। কোন নির্দিষ্ট মতাদর্শে বিশ্বাসীরা কোন শ্রেণির স্বার্থে কাজ করছে, নিপীড়িক না নিপীড়িতের হয়ে, সেই ভূমিকা মতদর্শের উপরও প্রভাব বিস্তার করে। সেই ভূমিকার চূলচেরা বাস্তব ব্যখ্যা ছাড়া কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। অথচ প্রকৃত বৌদ্ধিক চর্চার বাইরে সাধারণ প্রবণতাই হচ্ছে চটজলদি একমাত্রিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। এই সাধারণ সত্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাবেরিদা জামাতে ইসলামী দলের সদস্য ছিলেন। মাঝখানে স্বল্পসময়ের জন্য এই সংস্রব ত্যাগ করেছিলেন। স্থানীয় পত্রিকায় সেরকম একটি সংবাদ সম্ভবত প্রকাশিত হয়েছিল। জামাতে ইসলামী দলের রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে এখানে আলোচনা করার সুযোগ নেই। জামাতে ইসলামী দল ভারত বিভাজনের বিরোধী ছিল। কিন্তু তাদের এই ভূমিকা ম্লান হয়ে যায় যখন জানা যায় যে তাদের এই বিরোধিতার পেছনে এই দলের তাত্ত্বিক নেতাদের ভিন্ন এক মতাদর্শগত ধারণা ছিল। এই তাত্ত্বিক প্রবক্তারা ভেবে ছিলেন যে ইসলামের সাম্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে অবিভক্ত ভারতের অ-মুসলমানরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। সাবেরিদা তাঁর বিদ্রোহী সত্তা ও কুসংস্কারমুক্ত মানসিকতার তাগিদেই সম্ভবত সাম্রজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কারণ তাঁর বৌদ্ধিক নেতৃত্বে পরিচালিত অরাজনৈতিক সংগঠনের উদ্যোগে সাম্রজ্যবাদ বিরোধী বহু আলোচনাচক্র অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমান লেখকেরও তাঁর আমন্ত্রণে এধরনের সেমিনারে বক্তা হিসেবে যোগ দিয়ে তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ ঘটেছে। কিন্তু কুসংস্কারমুক্ত আধুনিক ইসলাম গড়ার প্রয়াসও যে ইসলামকে আমজনতা বিরোধী অবস্থানের দিকে ঠেলে দেয় যদি আরও কিছু অনিবার্য শর্ত পূরণ না হয়, সেব্যাপারে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন তা বোঝার কোন সুযোগ ছিল না, কারণ ইসলামকে বিকৃত করার উগ্র-হিন্দুত্ববাদীদের প্রয়াসের অত্যন্ত সঙ্গত বিরোধিতা ছাড়া ধর্ম নিয়ে ব্যক্তিগত স্তরেও তিনি বিশেষ আলোচনা কোনদিন করেননি। সুতরাং জামাতে ইসলামের ভারত বিভাজন বিরোধী ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের যে ক্ষেত্র তাতেই ছিল তাঁর আবাস, ইসলামের বিশুদ্ধীকরণের দিকে ছিল তাঁর নজর, কিন্তু ইসলামীকরণের মতাদর্শের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল না। সেটা না হওয়ার পেছনে মুখ্য কারণ এই যে তাঁর চিন্তন-মননের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিপীড়িত শ্রেণির মানুষ ও তাঁর নিপীড়িক বিরোধী অবস্থান। সেজন্যই তিনি অনায়াসেই আমাদের মত কম্যুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসীদের সাথে মেহনতি মানুষের সংগ্রামী কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করতে পারতেন। এই আগ্রহই তাঁকে এঅঞ্চলে সুফীবাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ রচনা লিখতে অনুপ্রাণিত করে। হাতে লেখা প্রায় শত পৃষ্ঠার এক পাণ্ডুলিপি তিনি আমাকে পড়তে দিয়েছিলাম, সেই পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি এখনও আমার ঘরে পড়ে রয়েছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে।
বুদ্ধিজীবী প্রশ্নে
আমরা প্রতিনিয়ত তথাকথিত কেজো বুদ্ধিজীবীর সম্মুখীন হই যারা সবসময়ই নিজের মতকে প্রতিষ্ঠানের ও প্রভাবশালীদের অনুমোদন পাওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত করেন, সেদিক থেকে তিনি ব্যতিক্রম। কিন্তু সব মানুষেরই যেমন কিছু দুর্বলতা থাকে, তাঁরও নিশ্চয়ই থেকে থাকবে। বিবৃতি দিয়ে স্বল্প সময়ের জন্য জামাতের সঙ্গ ত্যাগ এবং আবার এর সাথে যুক্ত হওয়ার ঘটনা কোন দুর্বলতার লক্ষণ কিনা সেব্যাপারে তাঁর সাথে কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও সেটা আর হয়ে উঠেনি। মতাদর্শগত ও ধর্মীয় পরিচিতি তাঁর বৌদ্ধিক অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অন্তরায় সেটা তিনি উপলব্ধি করতেন ও এব্যাপারে তাঁর মর্মবেদনাও তিনি একান্তে ব্যক্ত করতেন। ইতিহাসবিদ সুজিৎ চৌধুরীর বহু মতের সাথে তিনি একমত ছিলেন না, সেটা তিনি কোথাও লিখিতভাবে ব্যক্ত করেছেন কিনা আমার জানা নেই। বরাক উপত্যকার প্রেক্ষিতে সুজিৎ চৌধুরী নিশ্চয়ই নিজেই ছিলেন এক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং খোলাখুলি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করা বরাক উপত্যাকার বৌদ্ধিক চর্চার পরিবেশে খুব একটা খাপ খায় না। বাংলার জাতি-বর্ণ পরিচিতির প্রশ্নে ইতিহাসবিদ ডি.আর.ভাণ্ডারকারের ব্যাখ্যার সূত্র ধরে সুজিৎ চৌধুরী কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। কিন্ত ভাণ্ডারকারের ব্যাখ্যাই ভ্রান্ত ও অপ্রতুল তথ্যনির্ভর বলে অন্যান্য ইতিহাসবিদদের দাবির প্রেক্ষিতে সুজিৎ চৌধুরীর কোন লেখা প্রকাশ পায়নি। এনিয়ে এঅঞ্চলের কোন ইতিহাসবিদের ভিন্ন কোন লেখা যখন নেই, তখন এনিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে লেখার জন্য একদিন কথায় কথায় আমি তাঁকে বলেছিলাম। উত্তরে বললেন যে তিনি লিখলে কেউ সেটা গ্রহণ করবে না। আমার মনে হয়েছে যে তিনি বলতে চেয়েছেন যে সেটা তাঁর ক্ষেত্রে অনধিকার চর্চা। বরাক উপত্যকার বৌদ্ধিক পরিবেশে এই যে অনধিকারের আবহ তা তাঁকেও প্রভাবিত করেছে। অন্য অনেকের মত এটাও তাঁর একটি দুর্বলতা। বৌদ্ধিক বিতর্ক মানেই যে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না সেই আবহ বরাকে তৈরি হয়নি। বরাক উপত্যকার সমাজ জীবনে সেই কর্তাভজা পরিবেশ সর্বত্র এখনও গেঁড়ে বসে আছে। সাবেরিদা এর থেকে বেরিয়েও বেরোতে পারেননি।   
আমাদের বন্ধুত্ব
আমাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল। আমরা তথাকথিত বামপন্থী উন্নাসিকতা ও কূপমণ্ডূকতাকে ঝেড়ে ফেলে ধর্মীয় কারণেও নিপীড়িতের ব্যথিত হৃদয়ের সাথী হতে পিছপা হতাম না। সালমান রুশদির ‘স্যাটানিক ভার্সেস’-এর কোন এক মন্তব্য ইসলামে বিশ্বাসীদের মনে আঘাত করে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকেই জনগোষ্ঠীগত সাইকি’তে আঘাত দেওয়ার প্রতি আমাদের বিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করার উদ্যেশ্যে শিলচরে গণতান্ত্রিক লেখক সংস্থার উদ্যোগে একটি সেমিনার সংগঠিত করা হয়। গণতন্ত্রের ও আঘাতপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর সাথে যুক্তিবিন্যস্ত মত বিনিময় করার পরিবেশ তৈরির স্বার্থে খোলাখুলি এই মত ব্যক্ত করা জরুরি বলে আমরা মনে করি। কারণ একথা স্মরণে রাখা জরুরি যে গোটা বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলমান সম্প্রদায় এক নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। নিপীড়িতরা স্বাভাবিক কারণেই স্পর্শকাতর। আজকে যারা ইসলামী সন্ত্রাসের বর্বরতার নিদর্শন দিয়ে আমাদের এই অবস্থানের বিরোধিতা করতে চান তাঁরা যেন একথা বিবেচনায় রাখেন যে এই সন্ত্রাসবাদ দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নীতির সন্তান। সাম্রাজ্যবাদী রিজিম চ্যাঞ্জের রণনীতিতে সামিল করে নেওয়া হচ্ছে বহু রাষ্ট্রশক্তিকে, গড়ে তোলা হচ্ছে প্রাইভেট আর্মি। বর্তমানে সিরিয়ার আসাদ শাসনের অবসানের রণনীতি যে বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে সাম্রাজ্যবাদীদের দিকে সে তথ্য সবারই জানা। প্রভু শক্তির দাপটে মানবতা যখন লাগাতার ভূলুণ্ঠিত হয়, যখন মানবিকতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প শক্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়, তখন প্রতিরোধের সংগ্রামে এধরনের বিকৃতি ঘটে বা ন্যস্তস্বার্থই জনমতকে তাদের পক্ষে টানতে এধরনের বিকৃতি ঘটায়। যাইহউক, সালমান রুশদির বিষয় নিয়ে সাবেরিদাকে সামিল করার জন্য তাঁর সাথে কথা বলে দেখলাম তিনিও আমাদের মত গণতান্ত্রিক বিরোধিতার অবস্থানে আবদ্ধ থাকতে আগ্রহী। বৌদ্ধিক চর্চার জন্য সাবেরিদা জেহাদ থেকে ইসলামের ইজতিহাদকেই (স্বাধীন যুক্তিতর্ক) গুরুত্ত্ব দিতেন বেশী, যদিও তাঁর বিদ্রোহী সত্তা তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইসলামের জেহাদের দিকেই যে আকৃষ্ট করবে সেটাই স্বাভাবিক। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চলমান গণ-সংগ্রামের পরিস্থিতিতে ইজতিহাদ ও জেহাদের মধ্যে আলাপচারিতা চলতে থাকে। ভিন্ন পরিস্থিতিতে জেহাদ যুক্তি মানে না। কিন্তু যারা বামপন্থাকে চলমান সংগ্রামের সাথে যুক্ত করে দেখতে আগ্রহী নন, যারা প্রগতিশীলতাকে এক মনোগত বিষয় হিসেবেই ভাবতে অভ্যস্ত তারা শুধুমাত্র আমাদের বিরোধিতাই করলেন না, সাবেরিদাকে কেন্দ্রে রেখে বহু অপ্রাসঙ্গিক অভিধায় আমাদের কটাক্ষ করতেও কসুর করলেন না। নিপীড়িতের চলমান সংগ্রামের মধ্যে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলে ধার্মিক, নাস্তিক, ধর্মবিরোধী সবাই তাদের নিজ নিজ মতাদর্শ নিয়েও বহু সাধারণ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে সামিল হতে পারে, সাবেরিদার সাথে আমাদের বন্ধুত্ব ছিল এই সূত্রে গাঁথা। সাবেরিদার সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ ক্ষোভও ছিল এই নিয়ে যে সাচার, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের গণতান্ত্রিক সুপারিশগুলো নিয়ে জনমত গঠনে তাঁর কলম ও উদ্যোগকে খুব বেশী শাণিত করতে দেখা যায়নি।
চাটুকারদের পাশে ব্যতিক্রম
আমার দেখা সাবেরিদাকে চিত্রায়িত করতে হলে এক তাত্ত্বিক কাঠামোর আশ্রয় নিতে হয়। স্থিথাবস্থার অভ্যন্তরে ন্যায়-অন্যায়, শুভ-অশুভ, নিপীড়িত-নিপীড়ক, পরজীবী-শ্রমজীবী, প্রতিষ্ঠান-অপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিপরীত শক্তির প্রবহমান সংঘাত প্রতিটি গোষ্ঠী ও ব্যক্তির চিন্তা-চেতনায় একধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। এই দ্বন্দ্ব যত তীব্র হয় ততই এই স্থিথাবস্থার বেড়াজাল থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তির চাহিদা তীব্র হতে থাকে। চিন্তা-চেতনার এক প্রক্রিয়া এই চাহিদাকে প্রশমিত করে রাখে, বিপরীত প্রক্রিয়া তাকে চাগিয়ে দেয়। প্রথম প্রক্রিয়ায় আমরা একমাত্রিক মানুষ, বিপরীত প্রক্রিয়ায় আমরা দ্বিমাত্রিক বা বহুমাত্রিক সংঘাতে অস্থির। সাবেরিদার অবস্থান ছিল এ দু’য়ের মাঝখানে। তিনি স্থিথাবস্থাকে মেনে নিতে পারতেন না, আবার ইসলামী আদর্শের অভ্যন্তরে থেকে তাকে বিদ্রোহী পথে পরিচালনা করার দিকেও অগ্রসর হতে পারতেন না। সেদিক থেকে তিনি বেঁচে ছিলেন বৌদ্ধিক সত্তার ইসলামী ইজতিহাদের মধ্যে, বিদ্রোহী সত্তার অবদমনের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে। তাই বলা যায় যে তিনি জামাতে ইসলামী হয়েও জামাতে ইসলামী নন বা জামাতে ইসলামীর এক নিজস্ব ভিন্ন রূপ। প্রযুক্তি ও আয়ের কাঠামোয় মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের জীবন যাপনের স্বাচ্ছন্দ্যের যে বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে তাতে হুকুমের গোলাম হয়ে, অনৈতিক উপায়ে বা দিনভর একঘেঁয়েমি কাজের মধ্য দিয়ে আয়বৃদ্ধি সেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণির আত্মতৃপ্তি প্রদানের কারক হয়ে উঠছে। কাজের ক্ষেত্রে তাদের নিজের কোন স্বাধীন সত্তার নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও কাজের প্রক্রিয়া থেকে তাদের মানসিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও এই স্বাচ্ছন্দ্য এই শ্রেণিকে আত্মতৃপ্ত করে তুলছে। শোষণ-বঞ্চনা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য এ বড়ই উপযোগী পরিস্থিতি। বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একমাত্রিক মানুষ হয়ে ওঠার এ এক ভয়ঙ্কর পরিণতি। স্থিতাবস্থার অবসানে আমাদের প্রয়োজন দ্বিমাত্রিক ও বহুমাত্রিক মানুষ যার অভ্যন্তরিণ সংঘাতে স্বাধীনতা ও মুক্তির স্পৃহা তীব্রতর হবে, মানুষ হয়ে উঠবে অমানবিক স্থিথাবস্থা ভাঙার আগ্রহে এক একজন বিদ্রোহী। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আমাদের সমাজে সাবেরিদার মত মানুষের খুবই প্রয়োজন যারা অন্তত চাটুকারদের স্বর্গে সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই সাবেরিদার মৃত্যুজনিত শূন্যতা আমাদের পীড়া দেয়। সেই শূন্যতাকে ভরাট করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার শপথ ছাড়া আর কীভাবে সাবেরিদার মত বিদ্বজ্জনকে শ্রদ্ধা জানানো যেতে পারে?
(এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি লেখার সময় কোন নথি-পত্র বা তথ্য-সূত্রের আশ্রয় নেওয়া হয়নি, সম্পূর্ণ অতীত পাঠ ও অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে লেখা, তাই তথ্যগত কোন ত্রুটি থেকে থাকলে তার সম্পূর্ণ দায় লেখকের)

মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও রাষ্ট্র – অরূপ বৈশ্য

মানুষের শ্রমের মাধ্যমে গড়ে উঠছে রকমারি প্রযুক্তি ও সামগ্রী এবং গড়ে উঠছে জটিল সব মানব সম্পর্ক। তাকে একে অপরের বোধগম্য করার যে প্রধান মাধ্যম তা হচ্ছে ভাষা। সেভাবে দেখলে ভাষা হচ্ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু ভাষা তো শুধু তাই নয়, ভাষা মনেরও আয়না। অর্থাৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপলব্ধি, চিন্তা-চেতনা, ধারণা, উন্নয়নের মান ও বিকাশের স্তর ব্যক্ত হয় ভাষার গঠনে। সেজন্যই মায়ের কাছ থেকে শেখা প্রথম ভাষাটি গুরুত্ত্বপূর্ণ। ব্যক্তি ও সামাজিক সত্তা হিসেবে বেড়ে উঠার ঊষালগ্নেই যদি মাতৃভাষার প্রথম সোপানটি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য সামাজিক নিয়মে, দেখা দিতে বাধ্য সামাজিক অস্থিরতা। অঞ্চল, দেশ ও বিশ্বজুড়ে চলছে সেই ভাষা-রাজনীতির বহুবিধ খেলা যার পরিণতিতে আজ চারিদিকে অসাম্য ও ধ্বংসের তাণ্ডব।
ভাষার বিকাশ ও উন্নয়ন পরস্পর সংম্পৃক্ত। এ’দুয়ের অগ্রগতির সাথে সাথে গড়ে উঠে জাতীয় চেতনা ও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শাসন প্রণালী যা জন্ম দেয় জাতিরাষ্ট্রের। গনতান্ত্রিক পথে বিকশিত রাষ্ট্র বহুভাষিক ও বহুজাতিক চরিত্রকে মান্যতা দিতে বাধ্য। একে বলপূর্বক নাকচ করার প্রচেষ্টা জন্ম দেয়  জাতি-সংঘর্ষের ও উগ্রজাতিয়তাবাদের। ফলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারের মধ্যেই আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় বজায় রাখার একমাত্র পথ খোলা থাকে। এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার সাব্যস্ত করতে গিয়েই ভাষিক জাতিয়তাবাদকে ভিত্তি করে জন্ম নিয়েছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের বহুভাষিক – বহুজাতিক চরিত্র বজায় রাখার প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে মাতৃভাষায় পঠন-পাঠন, উচ্চশিক্ষা ও সরকারি-প্রশাসনিক কাজকর্ম করার অধিকার সাব্যস্ত করা। ফলে রাষ্ট্রভাষা বলে কোন ভাষাকে জাহির করা মানে অন্য সব ভাষার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা।

     সরকার, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ এককথায় রাষ্ট্রই সবার নাগরিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করে।  সেজন্যই নাগরিক তালিকায় নাম ওঠানোর প্রশ্ন নিয়ে আসামের ভাষিক রাজনীতি আজ এতো সরগরম। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এনআরসি’ তৈরি হলে আসামের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘বিদেশি ইস্যু’র  অন্যতম হাতিয়ারটি চিরতরে ভোঁতা হয়ে যাবে, তাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নিপীড়িত মানুষেরই মঙ্গল। বাংলাদেশ আসামের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ায় বাঙালিদের উপরই ঝুলতে থাকে অনুপ্রবেশকারীর খড়গ।   নেহেরু-লিয়াকত ও ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির শর্ত ভুলে গিয়ে এই খড়গতে শাণ দেওয়া হয় কখনও বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে, কখনও বাঙালি হিন্দুদের বিরুদ্ধে। এই বিভাজনের মানসিকতার ফলেই বরাকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ অসমীয়া আগ্রাসন নিয়ে যতটা স্পর্শকাতর, বাঙালি মেহনতি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও উন্নয়ন নিয়ে ততটাই উন্নাসিক। অথচ এই দু’টি বিষয়ই পরস্পর সম্পৃক্ত, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে মোকাবিলা করা যায় না। এই পরস্পর বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতির আড়ালে হারিয়ে যায় গণতন্ত্রের মুল মন্ত্র – ‘সবার সমান অধিকার, সমান মর্যাদা’। আশার কথা এই যে মেহনতি মানুষের মুখে উন্নয়নের নতুন ভাষা ফুটতে শুরু করেছে, সেটা যখন সবার কর্ণগোচর হওয়ার মত শক্তি সঞ্চয় করবে, তখনই নতুন আশা সঞ্চারিত হবে, বৌদ্ধিক চর্চার ভাষাও বিকশিত হবে। (ড০ রাজীব কর সম্পাদিত 'উনিশের ডাকে' প্রকাশিত) 

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন