বাস্তার নিয়ে আলোচনা – একটি প্রতিবেদন
Posted by Labels: people's activism, ফ্যাসিবাদ, মার্ক্সবাদ, শ্রমিক আন্দোলন
ফোরাম
ফর সোশ্যাল হারমনি, কোরাস ও উধারবন্দ সিনে ক্লাবের একটি উদ্যোগে
ভারতবর্ষের
কিছু কিছু প্রান্তিক বা জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের
উপস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল এবং বিকৃত উন্নয়নের মডেলের বশবর্তী হয়ে সেই দুর্বল
উপস্থিতিকেও ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তার থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না
যে ভারতবর্ষে যেটুকু সাংবিধানিক গণতন্ত্র রয়েছে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব মেহনতি
মানুষের নেই। একটা কথা মনে রাখা দরকার যে বুর্জোয়াদের কখনওই কোনো গণতন্ত্রের
প্রজেক্ট ছিল না, পুঁজিবাদের আসল লক্ষ্যই মুনাফা ও সঞ্চয়ন (profit and accumulation)। যেটুকু গণতান্ত্রিক
অধিকার পাওয়া যায় সেটা মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের সাথে পুঁজির রফা, কারণ ততটুকু
গণতন্ত্রই বিকশিত হয় যতটুকু না দিলে পুঁজির শোষণের নিয়মকে চালু রাখা সম্ভব নয় বলে
বুর্জোয়াদের কাছে বিবেচিত হয়। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও সেটা ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীন
ভারতের রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেক্ষিত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বিকশিত
মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও দেশভাগের মাধ্যমে মানুষের সংগ্রামের পরাজয়। এই প্রেক্ষিতে
রাষ্ট্র পরিচালকরা গণতন্ত্র –সামাজিক ন্যায় – অসম বিকাশ দূর করা এই গুলিকে স্বাধীন দেশ করার লক্ষ্য
হিসেবে রেখেছিলেন, আবার এই লক্ষ্যগুলি থেকে বিচ্যুতি ছিল অন্তর্নিহিত।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে আমরা একটা সাংবিধানিক অধিকার - নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি -
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা পাই, আবার জনগোষ্ঠীগত স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার না
দেওয়া – ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন – অর্থ ও
ক্ষমতায় প্রভাবিত একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা পাই। সামাজিক ন্যায়ের ক্ষেত্রে তপসিলই
জাতি-জনজাতির বিশেষাধিকার মেনে নিলেও সংখ্যালঘুর বিশেষাধিকারের সাংবিধানিক
রক্ষাকবচের যে প্রশ্ন কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই উত্থাপিত হয়েছিল তাকে দেশভাগের
সাম্প্রদায়িক বাতাবরণকে কাজে লাগিয়ে বাতিল করে দেওয়া হয়, শুধুমাত্র
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অধিকার দেওয়া হয়। উৎপাদনী নীতিতে আমদানি
প্রতিস্থাপনের (import substitution) নীতি নেওয়া
হলেও ভারী শিল্পের উপর গুরুত্ব দিয়ে সেটাকে আমদানীকৃত বিদেশি প্রযুক্তির উপর
নির্ভরশীল করে তোলা হয়। পরিকল্পনাভিত্তিক সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে অসম বিকাশকে দূর
করার উদ্দেশ্যও তাতে বাধা প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি নির্ভর এক
বিকাশের পথ অনুসরণ করা হয় যে নীতিতে জাতি-বর্ণ ও পরিচিতির বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে
মজুরিকে নিচে নামিয়ে রাখা ও আম-জনতার আয়কে নিচে নামিয়ে রাখা হয়। তাতে অভ্যন্তরীণ
চাহিদা সংকুচিত থাকায় দেশীয় শিল্পায়নের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এরকম একটা ব্যবস্থার
মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারত মেহনতি মানুষের সংগ্রামের মাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্ধন
পরিবর্তন হতে থাকে। কিন্তু পরনির্ভর বিকাশের এই মডেলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য
নষ্ট হওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ও মেহনতি মানুষের আন্দোলনের পরাজয়ের ফলেই আশির দশক
থেকে ও সরকারিভাবে ৯১ সালে নিও-লিবারেল ইকোনমিক পলিসির কাছে ভারতবর্ষ আত্মসমর্পণ
করে। বিশ্বে প্রযুক্তির আবিষ্কারের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নয়নের কেন্দ্র বদলেছে বিহার
থেকে মুম্বাই হয়ে ম্যাঙ্গালোরে। অতীতে প্রযুক্তির আবিষ্কার যে কর্মসংস্থানের সুযোগ
তৈরি করত, এখন সাইবারনেটিক্স ও এরপর রবোটিক্সের নতুন প্রযুক্তি
কর্মসংকোচন ঘটাচ্ছে বিশ্বব্যাপী, চলছে গণহারে ছাটাই। রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি চালু হয়েছে, রাষ্ট্রীয়
মালিকানাকে অস্বীকার করে সবকিছুকে এমনকি বিত্তীয় ক্ষেত্রকেও ব্যক্তি-মালিকানায়
দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। আম-জনতার আয় কমছে, ফলে চাহিদা
কমতে থাকায় রপ্তানি সামগ্রী ও ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু
ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আম-জনতার দুর্দশা বাড়ছে ও স্বাধীন বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে
যাচ্ছে। ৮০ শতাংশ মানুষকে বঞ্চিত
করে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলতে পারে না, কারণ সেখানে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে বাধ্য। সুতরাং
যেটুকু গণতন্ত্র বিদ্যমান, বর্তমানে তাকেও বাতিল করে দেওয়ার আয়োজন চলছে জোরকদমে।
ফেডারেল কাঠামোর বিপরীতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন চলছে জোরকদমে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের দিকে যাত্রার পথ হচ্ছে সুগম। তাই মেহনতি
মানুষের একটা প্রধান কর্তব্য ও দায়িত্ব হয়ে পড়েছে চালু গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।
বাস্তারের
সংগ্রামে আদিবাসীদের বিজয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে ভারতবর্ষে গণতন্ত্র রক্ষা ও
সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মেহনতি মানুষের বিজয় অর্জন করা, আর সেই বিজয়
অর্জন একমাত্র সম্ভব শাসক শ্রেণির একাংশ সহ সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ
প্রয়াসের মাধ্যমে। এই সত্য অনুধাবন না করতে পারলে
বাস্তারের মানুষকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। ব্যক্তি ও
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কুটিল চক্রের কানাগলিতে মানুষের প্রতিরোধ হারিয়ে যাবে।













