Showing posts with label Election. Show all posts
Showing posts with label Election. Show all posts
Posted by স্বাভিমান Labels: , , , , , , ,

অসমের প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতি, সৃষ্টি ও ধ্বংস

আমাদের আইনের শাসনে উপনিবেশিক প্রভাব এখনও বিদ্যমান। শোষণ ও অবদমনের বৈধতা  প্রদানই ছিল উপনিবেশিক শাসনের মুখ্য উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সংসদীয় গণতন্ত্রে ও বিচারব্যবস্থার যাচাই প্রক্রিয়ায় নাগরিক ও জনগনের অধিকারের শাসনে্র লক্ষ্যে আইনের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন হয়।  তবে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, বিশ্বশক্তির ভারসাম্য, অভ্যন্তরিণ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক  টানাপোড়েন ইত্যাদির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিপরীত যাত্রা চলছে বেশ কয়েক দশক ধরে। উপনিবেশিক কালা আইনের অপব্যবহার, নাগরিক অধিকার খর্ব করার জন্য নতুন কালা আইন জারি এবং আইনের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে নাকচ করে শাসনযন্ত্রকে অত্যাচারী ও অমানবিক করে তোলার প্রচেষ্টা আমরা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দু’টি গুরুত্ত্বপূর্ণ পরিসর আগে কখনও এভাবে আক্রান্ত হয়নি, বর্তমানে যা শাসনের চরিত্রের আমূল পরিবর্তনকে সূচিত করে।  

সেই পরিসরের প্রথমটি হচ্ছে, রাষ্ট্রের সাথে জনগণ বা ভোটারের সম্পর্ক যা নাগরিকত্ব আইন দিয়ে সংজ্ঞায়িত। নাগরিক হিসাবে ভোটাররা যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন তারাই সরকার কিংবা আইনসভা পরিচালনা করেন, অর্থাৎ নাগরিক হিসাবে ভোটাররাই সার্বভৌম – দেশের সার্বভৌমত্বের ধারণা তাতেই নিহিত। বেশ কয়েকবার শাসনের সেই ধারণা বাধাপ্রাপ্ত হয় – ১৯৬২ সালে ইন্দো-চিন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে, ১৯৭১ সালে ইন্দো-পাক যুদ্ধের আবহে এবং ১৯৭৫ সালের অভ্যন্তরিণ বিশৃঙ্খলার অজুহাতে কুখ্যাত ইমার্জেন্সির সময়ে। এসব করা হয় পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে জরুরীকালীন অধ্যাদেশ জারি করে। তাতে আইনের পরিবর্তন করা হয়নি, যদিও এধরনের অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতাই গণতন্ত্রের জন্য বিপদজনক।

নিওলিবারেল অর্থনীতির প্রবেশের প্রথম পর্যায়কে উন্নয়ন ও সামাজিক শান্তির নতুন যুগের সূচনা ভাবলেও, দ্বিতীয় পর্যায় থেকে শাসকশ্রেণি আম-জনতার ক্ষোভ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আঁচ করতে আরম্ভ করে। নাগরিকের সামগ্রীক জীবন রাষ্ট্রের নজরদারি ও হুকুমে পরিচালনার লক্ষ্যে আইনের পরিবর্তন হতে শুরু করে। নাগরিকত্ব আইনের পরিবর্তনে রাষ্ট্র ও নাগরিকের গনতান্ত্রিক সম্পর্কের বিপরীত যাত্রার সেই যুগ তখনই শুরু হয়ে যায়।  

অসমের নির্দ্দিষ্ট বাস্তবতায় “বিদেশি ও বহিরাগত” ইস্যু সবসময়ই এক আবেগিক বিষয়। শাসক যে তার স্থায়ী সমাধান কখনোই চাইতে পারে না, অসমের আলোকপ্রাপ্ত সমাজের এই বোধ হারিয়ে ফেলার জন্যই নাগরিক-অধিকারের বিষয়টি অসমে এক ভয়ানক রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্র অন্যায় আচরণ করবে, তাতে আশচর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বিপদ দেখা দেয় তখনই যখন রাষ্ট্রের অন্যায় সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। ইউরোপীয় ‘সিভিল সোসাইটি’ অর্থে সুশীল সমাজের অস্তিত্ব ভারতেই দুর্বল, অসমের মত প্রান্তিক অঞ্চলে তা যে অত্যন্ত দুর্বল হবে তা বলাই বাহুল্য। সেই সুশীল সমাজ ভাবতেই পারেন যে আইএমডিটি আইন বাতিল হলে বিদেশি সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু বাম-গণতান্ত্রিক শিবিরের একাংশও তা’ই ভেবেছিলেন এবং সেটা বাতিলের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। যে প্রদেশে “বিদেশি ও বহিরাগত” সমস্যা এক বাস্তব সমস্যা যার আবেগিক  ব্যবহারে জন্য শাসক ও শাসনযন্ত্র তাকে জিইয়ে রাখার ও শোষণ-প্রক্রিয়ায় অতি-শোষণের লক্ষ্যে বলপ্রয়োগে শ্রমকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে, সেখানে রাষ্ট্রের হাতে এক অমোঘ অস্ত্র তুলে দেওয়ার সামাজিক স্বীকৃতি পেল। নাগরিকত্বের সন্দেহ দেখা দিলে অভিযুক্তের উপরই বর্তাবে অভিযোগ খণ্ডনের দায়। দ্বিতীয়বার এনআরসি’র প্রশ্নে শাসকের সেই ট্র্যাপে পা দিলেন “সুশীল সমাজ” ও বাম-গণতান্ত্রিক অংশ । তাঁরা ভাবলেন এনআরসি হলে অসমে “বিদেশি ও বহিরাগত” সমস্যার ক্লোজার হবে, বাস্তবে এনরাসি ও কা দু’টো আইনই নাগরিকের ঘাড়ের উপর খড়গ হিসাবে ঝুলে রইল। শাসকশ্রেণি উপর এই আস্থা ও ভ্রান্তির সূত্রপাত আসলে নিওলিবারেল অর্থনীতির কাছে আত্মসমর্পণ থেকে জাত, মুখে তারা যা’ই বলুন না কেন, মানসিক পরাজয় তাতে অন্তর্নিহিত। এবার সবচাইতে বিপদজনক ন্যারেটিভ অসমের রাজনীতিতে তৈরি হতে চলেছে।

অসমে “পুশব্যাক” এই জমানার বিষয় নয়। কিন্তু আইনের বাধা এড়িয়ে গোপনে সেটা করা হত। এবার ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিষ্কারের এক আইনকে ব্যবহার করে পুশব্যাকের উপর আইনি জামা পড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, প্রয়োজনে আসাম রুলসের সংশোধনও করে নেওয়া হতে পারে। ১৯ লাখ এনআরসি ছুট, অসংখ্য ডি-ভোটার, ট্রাইব্যুনালের ভুলে লক্ষাধিক “ঘোষিত বিদেশি” ভারতীয় নাগরিকদের উপস্থিতিতে কী ধরনের সামাজিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সেটা নির্বাচনী তুরুপের তাস হিসাবে অতীব কার্যকরী হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

দ্বিতীয় যে পরিসরটির রাষ্ট্র সম্পর্ক বদলে দিচ্ছে সেটা হলো সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্ন। আইনের চোখে সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে সবাই সমান। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ আইন, কৃষি বিল, শ্রম কোড ইত্যাদির মাধ্যমে আম-জনতার সম্পত্তির ও আয়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন ইচ্ছা তখনই আম-জনতার সম্পত্তির উপর বুলডোজার চালাতে পারে, সম্পত্তি কাকে দেওয়ার জন্য? ব্যক্তিমালিক কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে এ হলো রাষ্ট্রের সেবা। এই প্রশ্নে কোন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ হলে, রাষ্ট্র কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তার বহুবিধ নজির ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। এই প্রতিরোধের আবহেও নিওলিবারেল আত্মসমর্পণ একেবারে স্পষ্ট। এবং ফলে শাসক এই প্রশ্নেও একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সক্ষম হচ্ছে।    

অসমের রাজনীতিতে এই দু’টি বিষয়ের সাথে শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্ন ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, কারণ শাসকের এধরনের অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক ভূমিকার পেছনে আসল চালিকাশক্তি হচ্ছে কর্পোরেট পুঁজির জন্য সস্তা শ্রম ও সস্তা সম্পদের যোগান ধরার বাধ্যবাধকতা।

আর শাসকের সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের পেছনে আসল রহস্য হচ্ছে বিরোধী শিবিরের ভূমিকা ও “সুশীল সমাজের” বিভ্রান্তি। বিরোধীরা পুঁজির মালিককে অসন্তুষ্ট করে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিসরে নির্বাচনী রাজনীতি করতে অক্ষম। ফলে রাষ্ট্রের আচরণের ব্যাপারে তাদের বিরোধিতা “ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’র” মত। এমনকি বাম-বিরোধী শিবিরের একাংশেরও এই প্রবণতা ক্রমশঃ প্রকট হচ্ছে। সম্প্রতি সিপিএম দল কেরালা সরকারের ভূমিকার উপর সিলমোহর লাগাতে নতুন এক নীতিগত অবস্থান নিয়ে ব্যক্তি-পুঁজির গুরুত্ত্বকে সমাজবাদী গঠন প্রক্রিয়ার বাস্তবতার অঙ্গ হিসাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তের কী অর্থ? রাষ্ট্রীয় মালিকানার অর্থ যে সমাজবাদ নয়, সেটা সবাই স্বীকার করে, কিন্তু সেটি অবশ্যই একটি  প্রয়োজনীয় শর্ত – আবার ব্যক্তি-মালিকানা হলেই যে তা সমাজবাদী শ্রেণিসংগ্রামের দ্বারা প্রভাবিত হবে না সেরকম কোন স্বতঃসিদ্ধ নিয়মও কেউ ঘোষণা করেনি। কিন্তু নেহেরু-ইন্দিরা জমানায়, সিপিএম রাশিয়া থেকে আবিষ্কার করল যে রাষ্ট্রীয় মালিকানা সমাজবাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এবার বাজপেয়ী – মোদী জমানায় চিন থেকে আবিষ্কার করল ব্যক্তি-মালিকানা সমাজবাদী গঠন-প্রক্রিয়ার অঙ্গ। প্রথমটি ছিল রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের কাছে আত্ম-সমর্পণ, দ্বীতিয়টি নিওলিবারেলিজমের কাছে।  

অ-বাম বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা আরও এককাঠি উপরে। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে “রাষ্ট্র-সর্বেসর্বা” করার যে আইনি আয়োজন চলছে, তাতে প্রাথমিকভাবে টার্গেট মুসলমানরা। কারণ, তারা মূলত কৃষিজীবী, তারা মূলত দক্ষ কায়িক-শ্রমিক, তারা সংখাগুরু ধর্মের কাছে মূল অপর ধর্ম। ফলে বিরোধীরা রাষ্ট্রের ভূমিকার বিরোধিতা করতে গিয়ে সেই আশঙ্কায় ভোগেন যে, সংখ্যাগুরুর ভোট না হাতছাড়া হয়, যদিও সেই আশঙ্কাকে গুরুত্ত্ব দিয়ে তাদের বিশেষ প্রাপ্তি ঘটেনি। কিন্তু শাসকরা তাতে মেজোরিটির সামাজিক স্বীকৃতি লাভে সফল হয়েছে, প্রথম পর্যায়ের বিজয় হাসিল করে নিয়েছে। সেই স্বীকৃতির জোরেই এবার এই নীতি প্রসারিত হচ্ছে অমুসলিম শ্রমিক-কৃষকদের উপর। কিন্তু তার সার্বিক বিরোধিতার নৈতিক অবস্থান খুইয়েছে বিরোধী শিবির।

অতি-ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের অতিমানব রাজনেতা তৈরি হয়। কারণ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের সাথে ব্যক্তিক্ষমতারও কেন্দ্রীভবন ঘটে। অসমে কংগ্রেস শিবির সেখানে চ্যালেঞ্জ জানাতে গৌরব গগৈকে হাজির করেছেন। সেখানে ব্যক্তি-ইমেজ ভাঙাগড়ার রাজনৈতিক নাটক অব্যাহত আছে। কিন্তু শাসক শিবির তার দলের নির্বাচনী নেতৃত্বের ইমেজ-বিল্ডিংকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যেখান থেকে সাধারণ জনগণ ভাবতে শুরু করে যে ব্যক্তি নিজেই আইন।

অথচ সাধারণ জনতাই নির্বাচনে ভাগ্য-নিয়ন্ত্রক। পুঁজির শোষণ, তথাকথিত উন্নয়নের যাঁতাকল, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পর্যুদস্ত সাধারণ ক্ষোভিত মানুষ সমাধান চাইছে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। কিন্তু সর্বশক্তিমানের কাছে, ভাষা-ধর্মের মধ্যবিত্ত অপর সৃষ্টির রাজনীতির কাছে মানুষ তখনই আত্মসমর্পণ করে, যখন বিকল্প কোন সচেতন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের পরিসর অনুপস্থিত থাকে। যে রাজনীতি অমানবিক পুশব্যাককে আইনি বৈধতা দেয়, এবং অমানবিকতাই রাজনৈতিক ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা হিসাবে মানুষ মেনে নিতে বাধ্য হয়, তাকে প্রতিহত করতে পারে রাজ্যব্যাপী বিকল্প ভাবনার সামাজিক জাগরণ ও রাজনৈতিক আর্টিকুলেশন।  

বিরোধী শিবিরের সেদিকে বিশেষ নজর নেই, তারা চাইছেন মানুষের ক্ষোভ, মুখ্যমন্ত্রীর দাবিদার নেতা এবং দুর্নীতির ইস্যুতে নির্বাচন লড়ে নিতে। কারণ তারা জানেন, যে দল জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে সেই দলকেই কর্পোরেট পুঁজি মদত দেবে যদি বিনিময়ে তাদের স্বার্থ দেখা হয়, এই ব্যাপারে বিরোধী শিবির বিজেপি’র নীতি থেকে খুব বেশি দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন না। অসমের এক বড় সংখ্যক ভোটার চা-শ্রমিক, সেই শ্রমিকদের অধিকারের বিষয় উত্থাপনে নরম-হিন্দুত্বের রাজনীতিও ত্যাগ করতে হয় না, তথাপি চা-শ্রমিকদের মজুরির প্রশ্নে নীরবতা রহস্যজনক। ফলে হার-জিতের খেলা চলছে ধ্বংসের আঙিনায়।                 

সমগ্র বিশ্বে এক ধ্বংসের আবহ বিরাজ করছে। ভারত তথা অসম কোন ব্যতিক্রম নয়। তথাপি অসম সেই মানদণ্ডেও এক বিশেষ উল্লেখ দাবি করে। মিথোলজির আধুনিক ধ্বংসের পুনর্ণির্মাণ।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় একই সময় প্রাচীন সভ্যতা গড়ে ওঠার ঊষালগ্ন। ইতিহাসবিদরা এই প্রাচীন সময়কে কো-অ্যাক্সিয়্যাল পিড়িয়ড বা একই-অক্ষের সময়কাল হিসাবে চিহ্নিত করেন। প্রাচীন সভ্যতার একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্ব ও বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে হতবাক হওয়া অনুসন্ধিৎসা। এর থেকেই জন্ম নেয় মিথোলজি’র দেবতাদের। ভারত গ্রিক সহ প্রায় সভ্যতাতেই মিথোলজির কাহিনীর সাযুজ্য রয়েছে। দ্বেষ, হিংসা, ক্রুরতা, ক্ষমতা লড়াইয়ের ভরপুর অসংখ্য দেবতা ও মিথোলজির চরিত্রে। আর এই চরিত্রগুলিই সৃষ্টির প্রতীক।

প্রেম, যুদ্ধ সব মিলিয়ে বারজন গ্রিক অলিম্পিয়ান দেবতার প্রধান জিউস। সৃষ্টির শুরুর সময়ের দেবতা হিসাবে আকাশ অথবা স্বর্গের স্বৈরশাসক ইউরেনাস ও পৃথিবী গায়া’র এক সন্তানের নাম ক্রোনাস। মাতা গায়া’র নির্দেশে ইউরেনাসের মিলনের সময় তাঁর পিতাকে হত্যা করে ক্রোনাস আকাশের দখল নেয়। ক্রোনাস তার বোন রায়াকে বিবাহ করে। কিন্তু মৃত্যুকালে তাঁর পিতা ভবিষদ্বাণী করেনে যে ক্রোনাসের মৃত্যু হবে তাঁর সন্তানের হাতে, সেই ভয়ে রায়া’র কোলে জন্মের সাথে সাথেই একে একে পাঁচ সন্তানকে সে খেয়ে ফেলে। ষষ্ঠ সন্তানকে রায়া গোপনে রক্ষা করে। সেই ষষ্ঠ সন্তান যখন তার পিতার সামনে হাজির হয়, তখন পিতার পেট থেকে বেরিয়ে আসে আগের পাঁচ সন্তান। তাদের এই নবজন্মের জন্য ষষ্ঠ সন্তান জিউস জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসাবে টাইটানদের পরাজিত করে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালের সম্রাট হয়ে বাকী পাঁচ ভাইকে বিভিন্ন ক্ষমতার অধিপতি হিসাবে নিয়োগ করে। এতে তার মাতামহ ও পিতামহ সহযোগিতা করেন। এভাবেই অন্যান্য ক্ষমতার দেবতা হিসাবে আরও ছয় জনকে নিয়োগ করে।

এথেনার জন্মও চিত্তাকর্ষক। জ্ঞানী ও গুণী অলিম্পিয়া-পূর্ব টাইটান দেবী ম্যাটিস জিউসের পরামর্শদাতা, আবার তাদের মধ্যেও ভালবাসার আকর্ষণ রয়েছে। দেবতাদের এক বিবাহ অনুষ্ঠানে জিউস বিভিন্ন রূপে ম্যাটিসের পেছনে ধাওয়া করে, ম্যাটিস পাহাড়ের ছোট গর্তে ঢুকে গেলে সাপ হয়ে ভেতরে গিয়ে ম্যাটিসকে জড়িয়ে ফেলে। জিউস আদর করে দাবি করে যে জিউস ম্যাটিস থেকে বেশি বুদ্ধিমান সেটা প্রমাণিত হলো। প্রত্যুত্তরে ম্যাটিস বলে যে সে যদি ধরা দিতে চাইত না, তাহলে জিউস তাকে ধরতে পারত না। সেটা পরীক্ষা করতে ম্যাটিস ফড়িং সেজে গলিয়ে বেরিয়ে গেলে জিউস গিরগিটি রূপে ম্যাটিসকে গিলে ফেলে। এরপর ম্যাটিসের প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা শুরু হয়। ব্যাথার উপসম না হলে ভেতেরে কী আছে তা দেখতে জিউসের মাথা দু’ভাগে কাটলে বেরিয়ে আসে জিউসের কন্যা অতীব রূপসী ও গুনবতী দেবী এথেনা। এভাবে বিশ্ব ও ব্রহ্মাণ্ডের পরিচয় ঘটার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মিথোলজির দেবতা ও চরিত্র বাড়তে থাকে।

এবার ধ্বংসের পালা। সর্বময় ক্ষমতার অধিকর্তা হিসাবে হাজির রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী রাজনেতা। পরামর্শদাতা দানব পুঁজির প্রেমে পেছনে ছুটতে ছুটতে জল, জমিন, জঙ্গল সব ধ্বংস করে নিচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে মানুষের জীবন জীবিকা। বদলা নিতে উত্তপ্ত হচ্ছে ধরিত্রী। ধ্বংস, যুদ্ধ, তাণ্ডবের দেবতারা জেগে উঠছেন। পৌরানিক মিথোলজির মত সৃষ্টির ক্ষমতা আর দেবতাদের হাতে নেই।  সৃষ্টি, সৌহার্দ্য, শান্তির দূতরা লুকিয়ে আছে মেহনতি জনতার মধ্যে। ধ্বংসের দেবতাদের মধ্যে লড়াইয়ের আবহেই জাগিয়ে তুলতে হবে মেহনতি জনতার সামাজিক শক্তিকে। প্রাচীন মিথোলজিতে ছিল দ্বান্দ্বিকতা – সৃষ্টির জন্য ধ্বংস, প্রেমের জন্য ঘৃণা, ভালবাসার জন্য যুদ্ধ। এবার শুধু ধ্বংসের একমাত্রিকতা, সৃষ্টি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে চাইছে, সেই বিচ্ছিন্নতাই মেহনতির নতুন লড়াই সৃষ্টির নতুন দ্বান্দ্বিকতায়।                    

সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনের তাৎপর্য 'কী করতে হবে?' – সেটাই বিচার্য

Posted by স্বাভিমান Labels: , , , ,


(অরুণোদয়ের জন্য লিখেছেন অরূপা মহাজন)

সামের পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমাদের সংগ্রহে এখনও আসেনি। সাদামাটাভাবে কতগুলো মন্তব্য অতি-সরলীকরণের দোষে দুষ্ট না হয়েই করা যায়। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিদীর্ণ কংগ্রেস তার গড় ভোটভিত্তি বজায় রেখেছে – অঞ্চল ভেদে কোথাও কমেছে – কোথাও বেড়েছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যে কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার প্রবণতা এবারও বজায় রয়েছে – তবে আরও ব্যাপক আকারে ধ্বস যে নামেনি তার মুখ্য কারণ রাভা হাসং-এর নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের কূটচাল দিশাহীন বিরোধীদের বিপর্যস্ত করতে পেরেছে। অনেক লুটপাট ও ভাওতাবাজির পরও পঞ্চায়েত স্তরে  গ্রামীণ মানুষের নগণ্য প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধাগুলিকে বিরোধীদের দিশাহীনতার সুযোগ নিয়ে সামগ্রীকভাবে কংগ্রেস তাদের বদান্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কংগ্রেসের চাতুর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিভাষা এবং তাদের বক্তব্যকে আম-জনতার মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জনগণের মধ্যে এমন এক ধোঁয়াশার জন্ম দেয় যে সঠিক হিসেবে প্রাপ্তির অবনমন সত্ত্বেও কংগ্রেসি শাসনে প্রাপ্তির আশাকে জিইয়ে রাখে ও চারিপার্শ্বে শূন্যতার মাঝে এই আশার বেলুনকে ফোলাতে তাদের বেগ পেতে হয় না। তথাপি কংগ্রেসের ঘাড়ে এআইইউডিএফের তপ্ত নিশ্বাসের ফলে জন্ম নেওয়া ভয়ঙ্কর বিষফোঁড়া নাছোড় গ্যাংগরিঙের রূপ পরিগ্রহ করার ভয় ঢুকেছে কংগ্রেসের অন্দরমহলে যা কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে। সামগ্রিকভাবে বিজেপি ও এজিপি উভয়েরই ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নেমেছে। আসামে বিজেপির মূল দূর্গ বরাক উপত্যকায় বিজেপির উত্থানের গ্রাফ এবার খাড়া নিচের দিকে নেমে গিয়ে এক বড় পতনের জন্য অপেক্ষা করছে। সামগ্রিকভাবে কংগ্রেস ভাল ফল করলেও বরাক উপত্যকায় কংগ্রেস কিন্তু আশানুরূপ ফল করেনি, বরঞ্চ এইউডিএফ বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের অনেকগুলি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। এবারের নির্বাচনে এইউডিএফ বরাক উপত্যকায় বাঙালি হিন্দু পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের তাৎপর্যপূর্ণ ভোট লাভে সক্ষম হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠিত দলের বাইরে ধনবল-বাহুবলের সাথে টেক্কা দিতে শুধুমাত্র সাংগঠনিক শক্তি ও লিফলেট নিয়ে ভোটারদের দোয়ারে পৌঁছে যাওয়া কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে এবারে প্রথমবারের মত গ্রামীণ শ্রমিকের ইউনিয়ন অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন বরাক উপত্যকার তিন জেলায় ভালসংখ্যক আসনে প্রার্থী দেয় এবং যেখানে তাদের প্রার্থী নেই সেখানে এআইইউডিএফ-কে সমর্থন করে। ইউনিয়নের প্রায় সব প্রার্থী ভালসংখ্যক ভোট পেয়ে গ্রামাঞ্চলে এক নতুন শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকেরই বক্তব্য হচ্ছে এই যে বিগত কয়েকবছর যাবত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গ্রামীণ মানুষের আন্দোলন ইউনিয়নের প্রার্থীদের নিজেদের ভোট প্রাপ্তি যেমনি সুনিশ্চিত করেছে ঠিক তেমনি এইউডিএফের শক্তি বৃদ্ধির পেছনেও এক পরোক্ষ কারণ হিসেবে ক্রিয়াশীল থেকেছে। সাদামাটাভাবে নির্বাচনী ফলাফলের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলিকে এভাবেই বলা যায়। তবে বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের আশানুরূপ ভোট না পাওয়া, ব্যাপকহারে বিজেপির ভোট কমে যাওয়া, এইউডিএফের ভোট ও আসন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ শ্রমিক ইউনিয়নের এক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশকে সমাজ-পরিবর্তনকামীদের ভবিষ্যত কর্মসূচী নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হবে। সর্বোপরি নির্বাচনী ইস্তাহারে এক নতুন সামাজিক-রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে ইউনিয়নের সফলতা এক বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে ইউনিয়নের এই ইস্তেহার নিচে হুবহু তুলে দেওয়া হলো।
ইউনিয়নের গ্রামীণ সমর্থন-ভিত্তি যা হয় সরাসরি ইউনিয়নের নির্বাচনী প্রার্থীর পক্ষে এসেছে অথবা কংগ্রেস-বিজেপিকে পরাস্ত করার স্বার্থে এআইইউডিএফ-এর পক্ষে গিয়েছে, তা মূলতঃ গ্রামীণ শ্রমিক – দিনমজুর, গরিব ও ভূমিহীন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা দোকানদার এবং গ্রামীণ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, জনগোষ্ঠীগতভাবে এরা পিছিয়ে পড়া ও তপসিলি সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু মানুষ। দেখা গেছে যে যেসব পঞ্চায়েতে সমর্থন ভিত্তির সাথে সাথে ইউনিয়নের শক্তিশালী সংগঠন রয়েছে সেখানেই ইউনিয়ন সরাসরি ভালসংখ্যক ভোট পেয়েছে এবং অন্যত্র ইউনিয়নের সমর্থন-ভিত্তি ইউডিএফের সাথে চলে গিয়েছে। অর্থাৎ যেসব পঞ্চায়েতে ইউনিয়ন ভালসংখ্যক ভোট পেয়েছে সেসব পঞ্চায়েতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরে এক সমান্তরাল গণ-ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে ভবিষ্যতে গণ্য হতে পারে যা গ্রামীণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-কাঠামোর বর্তমান চরিত্র পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে চলবে। স্থানিক মাত্রায় চাপ সৃষ্টির এই শক্তি যদি রাজ্য ও দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের শরিক এবং একই সাথে চালিকা শক্তি হতে পারে তাহলেই পরিবর্তনের এক বাতাবরণ তৈরি হতে পারে যখন ক্ষমতা-দখল ও ক্ষমতার চরিত্র – পরিবর্তন একইসাথে যুগপতভাবে ঘটে। এই দু’টি পরস্পর সম্পৃক্ত ঘটনা বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার ব্যাপক জনমুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, নির্বাচন বহির্ভূত কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বা এই সবগুলির এক মিশ্র-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটবে কি না সে প্রশ্নের উত্তরের জন্য এক পৃথক বিতর্কের সূত্রপাত করা যেতে পারে। কিন্তু একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে নিপীড়িত শ্রেণি-বর্ণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও তাকে ব্যাপক পরিসরে সঠিক মৌলিক পরিবর্তনের দিশায় পরিচালিত করতে সক্ষম সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছাড়া পরিবর্তনকামী কিছু লোকের এই ক্ষমতা – কাঠামোয় অংশগ্রহণ বর্তমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির চরিত্রের কোন পরিবর্তন সূচিত করতে সক্ষম হবে না, বরঞ্চ এই ব্যবস্থা পরিবর্তনকামী এই লোকদেরকে যারা সমাজের সবচাইতে পিছিয়ে পড়া অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরকে আত্মস্থ করে নিতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়নের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও ভালসংখ্যক ভোট প্রাপ্তি নির্বাচনে কয়েকজন প্রার্থীর জয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া এই শক্তি এক নতুন শ্রেণি রাজনীতির সূচনা করার শুরুয়াত হতে পারে, বিশেষ করে আজকের পরিস্থিতিতে যখন দেশব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন ও সবচাইতে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর আন্দোলন আবারও মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে নির্বাচনে জিতে কিছু সংস্কারমূলক কাজ করা কী মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অধিক সহায়ক হত না? আমাদের মতে এই প্রশ্নের কোন সরাসরি ইতিবাচক বা নেতিবাচক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। সংস্কারমূলক কাজ নির্বাচনে না জিতেও করা সম্ভব এবং তা ব্যাপক আকারেই করা উচিত এবং নির্বাচনী ফলাফল ইঙ্গিত করছে যে এই কাজটি অর্থাৎ গ্রামীণ মানুষের ন্যায্য অধিকারগুলি আদায় করার কাজটি এখন আরও ভালভাবে করা সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে জয় – পরাজয়ের ফারাক খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যদিও ইউনিয়নের অনেক প্রার্থীই জয়লাভ করেছে। তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে সংস্কারমূলক আন্দোলনের অভিমুখকেই শুধু পরিবর্তনকামী আন্দোলনের দিকে রাখলে চলবে না, পরিবর্তনকামী আন্দোলনও একইসাথে জোরেসোরে গড়ে তুলতে হবে এবং এর জন্য চাই সচেতন প্রয়াস। আশু কিছু পদক্ষেপ এই সচেতন প্রয়াসের অঙ্গ হয়ে উঠতে পারে। এগুলি হতে পারে নিম্ন রূপ – (১) রাজ্য ও দেশব্যাপী মেহনতি মানুষের আন্দোলনের মধ্যে সামঞ্জস্য ও সমন্বয় গড়ে তুলতে আন্দোলনের বিষয়ের ক্রমাগত সাধারণীকরণ ও সাংগঠনিক উদ্যোগকে স্থানিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাপক পরিধিতে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ। (২) খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও শ্রমিক অধিকারের আন্দোলনকে আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীগত অধিকারের প্রশ্নকে আরও জোরদার করা। ইউনিয়ন যদিও যুগপতভাবে এই দু’ধরনের আন্দোলনই চালিয়ে যাচ্ছে, তবে আমার মতে মেহনতি মানুষের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে যেসব মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী বা উচ্চ শ্রেণি-বর্ণের লোকেরা ইউনিয়নের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে তাদেরকে পঞ্চায়েত/ব্লক স্তরেই জনগোষ্টীগত অধিকারের আন্দোলনকে জোরদার করার জন্য এক পৃথক মঞ্চে সমাবেশিত করা যাতে স্বউদ্যোগে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে সাংগঠনিকভাবে তারা যুক্ত হতে পারে এবং শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন ইউনিয়নের কাজেও সহযোগিতা ও সহায়তা করতে পারে। ইউনিয়ন সংগঠন পরিচালন করার জন্য গ্রামীণ সাংগঠনিক কাঠামোয় শ্রমিক-গরিব মেহনতি মানুষ ও মহিলাদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। (৩) উপরিউক্ত সবগুলি কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন এক রাজনীতি সচেতন কর্মীবাহিনী যারা যে কোন শ্রেণি-বর্ণ থেকেই আসতে পারে, কিন্তু তাদেরকে হতে হবে শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক আদর্শে দিক্ষিত ও রাজনীতি সচেতনভাবে নির্দ্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দ্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও তার ভিত্তিতে কর্মসূচী রূপায়ণের জন্য গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিনিয়ত ও জীবন্তভাবে গণ-সংগঠনের সাথে ভাবের আদানপ্রদানে আগ্রহী ও সক্ষম। ◌◌◌

দুর্নীতিমুক্ত - শক্তিশালী পঞ্চায়েত ও গ্রামসভা এবং গ্রামীণ মানুষের অধিকার সাব্যস্ত করুন।
আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়নের মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিন।।

আমরা সামাজিক সংগঠন হয়েও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। কেন? কারণ আমরা চাই পঞ্চায়েত হয়ে উঠুক গ্রামীণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলি চায় পঞ্চায়েতকে দালাল তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করতে। আমরা চাই নতুন সামাজিক রাজনীতি যেখানে নির্বাচিত প্রার্থী ভোটারদের মতামত মেনে চলবে, ওরা চায় নির্বাচনের পর মুষ্টিমেয় প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী লোকের কাছে সাধারণ ভোটাররা যেন পদানত থাকে। আমরা চাই পঞ্চায়েতের হাতে অধিক ক্ষমতা – শক্তিশালী গ্রামসভা, ওরা চায় ডিআরডিএ-ব্লক ইত্যাদি মারফত মন্ত্রী-আমলাদের ক্ষমতার মাধ্যমে পঞ্চায়েতকে, ব্যবহার করে হরির লুঠ চালিয়ে যেতে। তাই আইনানুগ গেজেট নোটিফিকেশন হওয়া সত্ত্বেও ২৯টি বিভাগের ক্ষমতা পঞ্চায়েতের হাতে বাস্তবে দেওয়া হয় না – গ্রামসভাকে সুকৌশলে বানচাল করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ইউনিয়ন তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা ও কতিপয় আমলাদের এই জনবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে বিগত বছরগুলিতে লাগাতার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে এবং অনেকক্ষেত্রে সফলতাও লাভ করেছে। এই আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করছি।
বন্ধুগণ, এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন এমন একটা সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন আসাম তথা ভারতবর্ষে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে।   কৃষক-শ্রমিক-মহিলা-নিপীড়িত-বঞ্চিত জনগোষ্ঠী এমনকী মধ্যবিত্ত সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন, ঠিক তেমনি আসামের জাতি-নির্মূলীকরণের ঘৃণ্য রাজনীতির বলি হচ্ছেন লাখ লাখ ধর্মীয়-ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষ। এই অস্থির পরিস্থিতির জন্য দায়ী রঙ-বেরঙের শাসক দলগুলির নীতি ও চক্রান্ত। কারণ, সরকারী জনবিরোধী নীতির ফলেই ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিগত কংগ্রেস-বিজেপির শাসনকালে আমাদের দেশের আরবপতির (একশত শতকোটি টাকার মালিক) সংখ্যা যেখানে জাপান-চীনের মত দেশের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৮০ জনের দৈনিক ব্যয় গড়ে মাত্র ২০ টাকা অর্থাৎ তাদের দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। নিম্ন আসামের মত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের উদবাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া উচ্ছেদ হওয়া মানুষের দুরবস্থার ও হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যার করুণ কাহিনী আমাদেরকে পীড়া দেয়। এরকম দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও সরকার নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে চলেছে। তাই মানুষ আজ দিকে দিকে এই অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। এই সব বিদ্রোহকে এক নতুন দিশা দেখাতে, গ্রামীণ মানুষ-শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জনগোষ্ঠী-ছাত্র-যুব ও মহিলাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক নতুন সামাজিক রাজনীতির জন্ম দিতেই অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।
বন্ধুগণ, অনেকেই আশা করেছিলেন যে অন্ততঃ ভাষিক-ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে এআইইউডিএফ দল এক সামাজিক রাজনীতির জন্ম দেবে। কিন্তু অনেকেই এখন আশাহত হতে শুরু করেছেন। অনেকেই জানেন যে নিম্ন আসামের ধুবড়ি জেলার ভাসান চরের মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষিক-ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও শ্রমিক-কৃষকের এক ব্যতিক্রমী নেতা হিসেবে ‘মৌলানা ভাসানি’ নামে জনপ্রিয় ছিলেন। কৃষক-মেহনতি মানুষ-ভাষিক-ধর্মীয় সংখ্যালঘু দরদি নেতা ও নিপীড়িত মানুষের চোখের মণি মৌলানা ভাসানির বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে আপসহীন সংগ্রামী ঐতিহ্যের ধারা এআইইউডিএফের মধ্যে অনুপস্থিত। ধর্মীয় অনুশীলনে দরিদ্র মানুষের কাছের লোক ও জুলুম-জালিমের বিরুদ্ধে নিরলস জেহাদি মৌলানা ভাসানির গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ-মেহনতি মানুষের পক্ষে নিরলস আপসহীন সংগ্রামের ফলেই কংগ্রেস সরকার তাকে বারবার জেলে পুড়ে ফেলে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের নীতিতে আকৃষ্ট হয়ে স্বরাজ্য পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করে পরবর্তীতে মৌলানা ভাসানি নিপীড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেন এবং আসামে ও তৎকালীন পাকিস্তানে শাসকদের বিরুদ্ধে এক সামাজিক-রাজনীতির জন্ম দেন। বাঙালি জাতির নিজের লড়াই নিজে লড়ার পক্ষে এবং কৃষক আন্দোলনের পক্ষে ওকালতি করায় তাঁকে এমনকী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীরও কোপের মুখে পড়তে হয়। নিম্ন আসামে সংখ্যালঘু মানুষের অধিকারের জন্য মৌলানা ভাসানির আপোসহীন লড়াই’র কোন বৈশিষ্ট্যই আমরা এআইইউডিএফ দলের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। ধনী-ক্ষমতাবান ও কংগ্রেসি মার্কা রাজনীতির লক্ষণ এআইইউডিএফের মধ্যে বেড়েই চলেছে। তথাপি যেসব পঞ্চায়েতে অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থী নেই, সেখানে কংগ্রেস-বিজেপি বিরোধী শক্তিশালী প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।
বন্ধুগণ,অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন জনজাতীয়দের তপসিলিকরণ, মুসলিম ফিসারম্যান – কিরাণ ইত্যাদি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করা ও ভাষিক – ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা প্রতিটি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা অনুপাতে সংরক্ষণ কার্যকরী করা ইত্যাদি দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছে এবং এই নির্বাচনী প্রচারেও এগুলিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে ইউনিয়ন প্রার্থীদের জয়যুক্ত করলে এই অন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে। 
বন্ধুগণ, সরকার বড় বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানী মালিকদের যখন সরকারী অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিচ্ছে, তখন সমস্ত ভর্তুকি উঠিয়ে দিয়ে আম-জনতার ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি নিয়েছে। বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানীদের সেবা করতে গিয়ে কংগ্রেসি সরকার খুচরা ব্যবসায় বিদেশি বিনিয়োগের ছাড় দিচ্ছে যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিপদাপন্ন হচ্ছে, নগদ অর্থে সাবসিডি প্রদানের প্রকল্প চালু করে কংগ্রেস সরকার আসলে একদিকে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের জন্য সাবসিডি’র পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে এবং অন্যদিকে সমাজের দুর্বল অংশ বিশেষ করে মহিলাদের ও শিশুদের বঞ্চিত করে সমাজকে পঙ্গু করে দেওয়ার নীতি নিয়েছে। তাই সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে মানুষ বিদ্রোহ করছে। এতে শাসকরা খানিকটা ভয় পেয়েছে। তাই মানুষকে সন্তুষ্ট করতে এনরেগা, খাদ্য সুরক্ষা বিল, ইন্দিরা আবাস, আইসিডিএস, মিড ডে মিল, বিভিন্ন ধরনের ভাতার মত কিছু জনমুখী প্রকল্প মানুষের সামনে হাজির করেছে সরকার। কিন্তু প্রথমত প্রয়োজনের তুলনায় এগুলি অত্যন্ত নগণ্য, দ্বিতীয়ত এমনভাবে এগুলির নিয়ম বানানো হয়েছে যে প্রকৃত দরিদ্র মানুষকে এর থেকে বঞ্চিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই যে পঞ্চায়েত ও গ্রামসভাকে শক্তিশালী করে যদি গ্রামীণ মানুষের ক্ষমতায়ন করা না হয়, তাহলে দালাল আমলা-রাজনীতিবিদরাই বরাদ্দকৃত অর্থ লুটেপুটে খাবে। সুতরাং এই পরিপ্রেক্ষিতে অসম মজুরি শ্রমিক ইউনিয়ন এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও যে বিষয়গুলিকে সামনে রাখছে সেগুলি হল - (১) প্রকল্প রূপায়ণে দুর্নীতি দূর করা (২) পঞ্চায়েতের হাতে অধিক ক্ষমতা ও ওয়ার্ডভিত্তিক গ্রামসভাকে শক্তিশালী করা (৩) এনরেগায় বছরে ২০০ দিনের কাজ ও ২৪০ টাকা হাজিরা প্রদান (৪) আইসিডিএস, বিভিন্ন ধরনের ভাতা, ইন্দিরা আবাস, বিপিএল তালিকায় হিতাধিকারী নির্বাচনে গ্রামসভাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান  (৫) সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা (৬) গ্রামীণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানীয় জল ও যোগাযোগের সুবন্দোবস্ত করা (৭) জমির পাট্টা ও ভূমিহীনদের ভূমি প্রদান। (৮) সাচার রিপোর্টের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের জন্য এমএসডিপি’র সঠিক রূপায়ণ সুনিশ্চিত করা ও রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন রিপোর্ট কার্যকরী করা।
                    

Significance of Assam – West Bengal Assembly election, 2011.

Posted by স্বাভিমান Labels: , ,

Arup Baisya (written for ARUNOOY)
The assembly election in five Indian states was held in the backdrop of corruption charges, charges for policy appeasement towards the oligopolies and their votaries of imperialist state. The parliamentary left circles were most vociferous against the UPA- II right from the nuclear deal to various new economic policy decisions and to the revelation of Radia tapes. When it is more or less a consensus within the Marxists as well as the Keynesian variants that the forces of globalization and the party in power with neo-liberal policy are responsible for increasing poverty, inequality and social insecurity of the people, the left bastion in West Bengal has been dismantled ending the 34 years left rule, and the neo-liberal proponent, the congress in Assam, has increased their previous tally both in terms of number of seats and vote-share.

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন