বাস্তার নিয়ে আলোচনা – একটি প্রতিবেদন

Posted by স্বাভিমান Labels: , , ,



ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি, কোরাস ও উধারবন্দ সিনে ক্লাবের একটি  উদ্যোগে

   
              ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি একটি মুক্ত মঞ্চ, গণতন্ত্র-সামাজিক ন্যায় - বৈচিত্র্য ও বহু মতের সুস্থ বিকাশের পক্ষে এবং নয়া উদারবাদী অর্থনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটি খোলা মঞ্চ। সবার কথা শুনতে চাওয়া ও নিজের কথা বলতে চাওয়ার ফোরামের এই স্পিরিট থেকেই বাস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্ক’-এর দুই বক্তাকে ছত্তিশগড়ের চলমান ঘটনা ও ইতিহাস নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরার সুযোগ করে দিতে আজ অর্থাৎ ১৩ আগস্ট, ২০১৭ শিলচরে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল ফোরাম। তাদের আলোচনা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনেছে ও শ্রোতাদের তরফ থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে এসেছে। আলোচনার একটি সংক্ষিপ্ত বয়ান ও এর তাৎপর্য এখানে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এই প্রতিবেদন। তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার সুবিধার্থে আলোচনায় উঠে না আসা কিছু বক্তব্য এখানে সংযোজন করা হয়েছে।
           
   বাস্তার অঞ্চলে গোণ্ড উপজাতিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং গবেষকদের মতে  সিন্ধু সভ্যতার সাথে গোণ্ডদের যোগসূত্র রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের কারণ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে, জেনেটিক্স সায়েন্সের ভিত্তিতে গবেষণাকে হাতিয়ার করে কেউ কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগকেই কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সে যাই হউক, গোণ্ডরা ভারতের আদি বাসিন্দা এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আদিবাসীদের পরিচিতি ও নিজস্ব শাসন প্রণালীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা ও জল-জমিন-জঙ্গলের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রশ্ন উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনায় উঠে এসেছে। এই স্বতন্ত্রতার বোধ থেকেই জন্ম নিয়েছিল কোল-ভিল-সাঁওতাল-ওরাং- ভূমিজ-গোণ্ডদের ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ। গুণ্ডা ধুর ছিলেন গোণ্ডদের সেরকমই একজন বিদ্রোহী নায়ক। পরিচিতির এই স্বাতন্ত্র্যের স্পৃহাকে দমিয়ে দিতে ও আসাম সহ বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠা চা-বাগানে এদেরকে সস্তা মজুর হিসেবে নিয়োগ করতে এদেরকে আড়কাঠির মাধ্যমে নিয়ে আসার সময়ে অত্যাচারের করুণ কাহিনী দাস বাণিজ্যে আফ্রিকান নিগ্রোদের উপর অত্যাচারকেও হার মানায়। শুরুতে চা-শিল্পে নিয়োজিত চীনা শ্রমিক ও পরে স্থানীয় জনজাতীয় শ্রমিকদের বিদ্রোহী মনোভাবের জন্যই মালিকদের অনুগত এই নব্য দাস শ্রমিকদের ব্রিটিশ চা-শিল্পে নিয়ে আসে। তবে কোল-ভিল-সাঁওতাল-ওরাং- ভূমিজ ইত্যাদির তুলনায় আসামের চা-শিল্পে  গোণ্ডদের সংখ্যা সম্ভবত নগণ্য। বাস্তার অঞ্চলের গোণ্ড সহ মধ্য ভারতের আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বৃদ্ধি পায় স্বাধীনতা-উত্তর পর্যায়ে যখন শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজন পড়ে খনিজ সম্পদের। বায়লাডিলা খনির নামের সাথে আমাদের এই অঞ্চলের বাসিন্দারা পরিচিত। বাস্তার অঞ্চলের জমির নিচের খনিজ সম্পদ লুটের জন্য প্রয়োজন সেই জমির দখল নেওয়া ও তার জন্য প্রয়োজন জঙ্গল ধ্বংস ও জমির উপর বসবাসকারী মানুষদের উচ্ছেদ। বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি ও তাদের ভারতীয় পুঁজিপতি সাগরেদদের স্বার্থেই এটা ছিল প্রয়োজনীয়। স্বাভাবিকভাবেই জল-জমিন-জঙ্গলের অধিকার বজায় রাখতে আদিবাসীরা প্রতিরোধ করবে এবং সেই প্রতিরোধ যত তীব্র হবে তাকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তত তীব্র হবে। স্বাধীন ভারতে নির্লজ্জ নৃশংস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক করুণ কাহিনী রয়েছে সেখানে। এটাই হচ্ছে বাসটার অঞ্চলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে উন্নয়নের ধারণাকে বানচাল করে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় আয়োজন। উদারবাদী অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন প্রদেশে সেজঅঞ্চল গড়ে উঠছে যেখানে হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদ হয়েছেন এবং পুঁজির অবাধ লুণ্ঠনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মত কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিরোধের সীমিত বিজয়ও অবশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। বর্তমানে গোণ্ডদের স্বার্থে প্রচলিত যে জমি বিক্রির আইন রয়েছে সেটাকেও ছত্তিসগড় সরকার তুলে নিতে চাইছে। এই চিত্র থেকে নাগরিক সমাজের করণীয় কর্তব্য নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু গোল বাধে যখন এই বাস্তবতাকে প্রসারিত করে এমন কিছু সিদ্ধান্তে যাওয়া হয় যা অতিকথন বলেই মনে হয়।
     
       প্রথমে বিবেচনা করা যাক আদিবাসীদের প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রশ্নটি। কোন কোন মহল বলতে চান যে বাস্তার অঞ্চলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। আমরা জানি যে যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতির ধারাবাহিকতার পরিণতি। জনগণের যুদ্ধ এমন একটি চেতনার প্রকাশ যেখানে সেই নির্দিষ্ট জনগণ নিজের সংকীর্ণ গোষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সব নিপীড়িতের হয়ে লড়াই করার চেতনায় উপনীত হয়েছেন এবং সে যায়গায় লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অভ্যুত্থানের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সেই চেতনায় উপনীত হওয়া একটি সরলরেখায় ঘটে না, এক আঁকাবাঁকা পথে ঘটে। বাস্তার অঞ্চলে সেই চেতনায় উপনীত হওয়ার কোনো নজির নেই। বরঞ্চ আদিবাসী চেতনা যে প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় বিকশিত হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আসামের বড়ো আন্দোলন বা আসাম আন্দোলনের খিলঞ্জিয়া চেতনা। এই দুটি আন্দোলনই প্রথমে গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে শুরু হয় এবং অবড়ো অনসমীয়াদের জাতি-নির্মূলিকরণের নৃশংসতায় পর্যবসিত হয়। কারণ আদিবাসী খিলঞ্জিয়া চেতনার অভ্যন্তরেই বহিষ্করণের বা অপর জনগোষ্ঠীকে আলাদা করার অন্তর্বস্তু নিহিত রয়েছে। এই দুটি আন্দোলনের ক্ষেত্রেই আমরা প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদগমন প্রত্যক্ষ করেছি। সুতরাং রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামকে যুদ্ধ হিসেবে দেখা একধরনের রোমান্টিক ভ্রান্তি।
             ভারতবর্ষের কিছু কিছু প্রান্তিক বা জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল এবং বিকৃত উন্নয়নের মডেলের বশবর্তী হয়ে সেই দুর্বল উপস্থিতিকেও ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু তার থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না যে ভারতবর্ষে যেটুকু সাংবিধানিক গণতন্ত্র রয়েছে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব মেহনতি মানুষের নেই। একটা কথা মনে রাখা দরকার যে বুর্জোয়াদের কখনওই কোনো গণতন্ত্রের প্রজেক্ট ছিল না, পুঁজিবাদের আসল লক্ষ্যই মুনাফা ও সঞ্চয়ন (profit and accumulation)যেটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়া যায় সেটা মেহনতি মানুষের লড়াইয়ের সাথে পুঁজির রফা, কারণ ততটুকু গণতন্ত্রই বিকশিত হয় যতটুকু না দিলে পুঁজির শোষণের নিয়মকে চালু রাখা সম্ভব নয় বলে বুর্জোয়াদের কাছে বিবেচিত হয়। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও সেটা ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেক্ষিত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বিকশিত মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও দেশভাগের মাধ্যমে মানুষের সংগ্রামের পরাজয়। এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র পরিচালকরা গণতন্ত্র সামাজিক ন্যায় অসম বিকাশ দূর করা এই গুলিকে স্বাধীন দেশ করার লক্ষ্য হিসেবে রেখেছিলেন, আবার এই লক্ষ্যগুলি থেকে বিচ্যুতি ছিল অন্তর্নিহিত। গণতন্ত্রের প্রশ্নে আমরা একটা সাংবিধানিক অধিকার - নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি - ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা পাই, আবার জনগোষ্ঠীগত স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার না দেওয়া ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন অর্থ ও ক্ষমতায় প্রভাবিত একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা পাই। সামাজিক ন্যায়ের ক্ষেত্রে তপসিলই জাতি-জনজাতির বিশেষাধিকার মেনে নিলেও সংখ্যালঘুর বিশেষাধিকারের সাংবিধানিক রক্ষাকবচের যে প্রশ্ন কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই উত্থাপিত হয়েছিল তাকে দেশভাগের সাম্প্রদায়িক বাতাবরণকে কাজে লাগিয়ে বাতিল করে দেওয়া হয়, শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অধিকার দেওয়া হয়। উৎপাদনী নীতিতে আমদানি প্রতিস্থাপনের (import substitution) নীতি নেওয়া হলেও ভারী শিল্পের উপর গুরুত্ব দিয়ে সেটাকে আমদানীকৃত বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়। পরিকল্পনাভিত্তিক সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে অসম বিকাশকে দূর করার উদ্দেশ্যও তাতে বাধা প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি নির্ভর এক বিকাশের পথ অনুসরণ করা হয় যে নীতিতে জাতি-বর্ণ ও পরিচিতির বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে মজুরিকে নিচে নামিয়ে রাখা ও আম-জনতার আয়কে নিচে নামিয়ে রাখা হয়। তাতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সংকুচিত থাকায় দেশীয় শিল্পায়নের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এরকম একটা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারত মেহনতি মানুষের সংগ্রামের মাত্রার সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্ধন পরিবর্তন হতে থাকে। কিন্তু পরনির্ভর বিকাশের এই মডেলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ও মেহনতি মানুষের আন্দোলনের পরাজয়ের ফলেই আশির দশক থেকে ও সরকারিভাবে ৯১ সালে নিও-লিবারেল ইকোনমিক পলিসির কাছে ভারতবর্ষ আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বে প্রযুক্তির আবিষ্কারের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নয়নের কেন্দ্র বদলেছে বিহার থেকে মুম্বাই হয়ে ম্যাঙ্গালোরে। অতীতে প্রযুক্তির আবিষ্কার যে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করত, এখন সাইবারনেটিক্স ও এরপর রবোটিক্সের নতুন প্রযুক্তি কর্মসংকোচন ঘটাচ্ছে বিশ্বব্যাপী, চলছে গণহারে ছাটাই। রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি চালু হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে অস্বীকার করে সবকিছুকে এমনকি বিত্তীয় ক্ষেত্রকেও ব্যক্তি-মালিকানায় দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। আম-জনতার আয় কমছে, ফলে চাহিদা কমতে থাকায় রপ্তানি সামগ্রী ও ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আম-জনতার দুর্দশা বাড়ছে ও স্বাধীন বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।  ৮০ শতাংশ মানুষকে বঞ্চিত করে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলতে পারে না, কারণ সেখানে সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে বাধ্য। সুতরাং যেটুকু গণতন্ত্র বিদ্যমান, বর্তমানে তাকেও বাতিল করে দেওয়ার আয়োজন চলছে জোরকদমে। ফেডারেল কাঠামোর বিপরীতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন চলছে জোরকদমে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের দিকে যাত্রার পথ হচ্ছে সুগম। তাই মেহনতি মানুষের একটা প্রধান কর্তব্য ও দায়িত্ব হয়ে পড়েছে চালু গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।
       
      শিল্পায়নকে পুঁজিবাদ বলে ধরে নেওয়া এক ভ্রান্তি। প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন ও পুঁজির মালিকদের জমি ছিনিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মূল লড়াই হিসেবে ভাবা আরেকটি ভ্রান্তি। পুঁজিবাদ হচ্ছে বাজারের নিয়ম, মূল্যের নিয়ম ও মজুরি দাসত্ব চালু থাকা। সেই পরিস্থিতি চালু হয়েছে ভারতবর্ষের উৎপাদনের সব ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী অধীনতা ও বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির শোষণের অভ্যন্তরেই, শিল্পায়ন যতই দুর্বল হোক না কেন। বাস্তারের মত বলপূর্বক লুটে বা পুঁজির আদিম সঞ্চয়নবা বর্তমানে যার রূপকে বলা হয় বিস্থাপনের মাধ্যমে সঞ্চয়নপুঁজিবাদের জন্মলগ্ন থেকেই তার অনুষঙ্গ ছিল। নিও-লিবারেল পর্যায়ে সেটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। লাতিন-আমেরিকা, আফ্রিকা, আরব ভূখণ্ড তো বটেই, তেলের জন্য আমরা দেখতে পাচ্ছি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও হাজারে হাজারে উদ্বাস্তুদের পশ্চিমী দেশের দিকে প্রব্রজন। লাখ লাখ মানুষ হচ্ছে বিস্থাপিত, পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে, মানবতার বধ্যভূমিতে পরিণত হচ্ছে একের পর এক অঞ্চল, দেশ। খোদ আমেরিকায় শেল-অয়েল উত্তোলনে ফ্র্যাকিং-এর জন্য মানুষের প্রতিরোধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেখানেও একের পর এক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকতে দেখছি, হু হু করে বাড়তে দেখছি বেকারত্ব। চীন সেখানে গাড়ির ফ্রন্ট গ্লাস নির্মাণের কারখানা খোলায় আমেরিকার শাসকরা স্বস্তি পাচ্ছে, বিশ্ব আধিপত্যের লড়াইয়ে চীনের অগ্রগতি অব্যাহত, সে এক ভিন্ন কাহিনী। অন্যদিকে আইটি কোম্পানিগুলো যখন ভারতবর্ষে বড়মাপের কর্মী ছাটাই করছে, তখন ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে ইনফোসিসের মত আইটি কোম্পানি ১০০০০ আমেরিকানদের চাকরী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সেরকম পরিস্থিতিতে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে লড়াই, কর্পোরেট পুঁজির মূল পুঁজিবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই, বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে লড়াই ও মজুরি বৃদ্ধির লড়াইয়ে ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য নাগরিক সুবিধা ও অধিকারের দাবিতে মেহনতি মানুষ সংগঠিত না হলে বাস্তারের মত পুঁজির বিস্থাপনের মাধ্যমে সঞ্চয়ন’-কে প্রতিহত করা যাবে না।

                বাস্তারের সংগ্রামে আদিবাসীদের বিজয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে ভারতবর্ষে গণতন্ত্র রক্ষা ও সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মেহনতি মানুষের বিজয় অর্জন করা, আর সেই বিজয় অর্জন একমাত্র সম্ভব শাসক শ্রেণির একাংশ সহ সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে। এই সত্য অনুধাবন না করতে পারলে বাস্তারের মানুষকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কুটিল চক্রের কানাগলিতে মানুষের প্রতিরোধ হারিয়ে যাবে।





                 



         

সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসদের সেমিনারে বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া

Posted by স্বাভিমান


।। অরূপ বৈশ্য।।

                   
সুকৃতিরজ্ঞন বিশ্বাস
      
ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি ও কোরাসের যৌথ উদ্যোগে গত ১১ জুন, ২০১৭ শিলচর মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সংস্থার হলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইতিহাস, ভাষিক অধিকার ও উনিশের ঐতিহ্য শীর্ষক এক সেমিনার হয়ে যায়। এই সেমিনারে সংগঠক ও শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থেকে মনে কিছু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার এই প্রতিক্রিয়া জনসমক্ষে ব্যক্ত না করাই শ্রেয় বিবেচনা করি। কিন্তু পরবর্তীতে এই সেমিনারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জনসমক্ষে এসেছে। এই প্রেক্ষিতে আমার নিম্নলিখিত সংক্ষিপ্ত ও পয়েন্ট-টার্গেটেড প্রতিক্রিয়া অন্তত সমাজকর্মীদের সামনে তুলে ধরা উচিত বলে বিবেচনা করি।
                      (১) নির্দিষ্ট বক্তা অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য বিষয়ের উপর বিস্তৃত আলোকপাত করতে গিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উত্থাপন করেন। এই তিনটি হল সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিপদ, ধর্ম ও ধর্মতন্ত্রের পার্থক্য ও ইতিহাসের সংজ্ঞা। প্রথম পয়েন্টে তাঁর বক্তব্য ছিল সরাসরি, মেদহীন ও স্পষ্ট। কিন্তু বাকী দুটি পয়েন্টে তাঁর বক্তব্য মনে হয়েছে অস্পষ্ট ও ভাসাভাসা। প্রতিটি ধর্মেই দুটি ধারা বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। একটি ধারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রাম থেকে প্রাণ সঞ্চার করে এবং এই ধারার গণ আবেদন শক্তিশালী হয় আম জনতার সংগ্রামের অন্তর্বস্তুতে, অন্য ধারাটি (transcendental) টিকে থাকে ও শক্তিশালী হয় শাসক শ্রেণি-বর্ণের আধিপত্যের সাথে তাল মিলিয়ে শাসকশ্রেণির আধিপত্য কত গভীর এর উপরই নির্ভর করে ধর্মের কোন ধারাটির আবেদন মানুষের কাছে কত বেশি। ইতিহাসের সংজ্ঞার প্রশ্নে তিনি ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা বিচার করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।এটা যদি ইতিহাস পাঠের মানদণ্ড হয় তাহলে ইতিহাস পাঠই দুরূহ হয়ে উঠে,কারণ তাতে ইতিহাস পাঠ ও তার গুণমান নির্ণয়ের আগেই পাঠককে হোঁচট খেতে হয় লেখকের  দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় জেনে নেওয়ার তাগিদ থেকে।

   
অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য
সার্ত্রে মন্তব্য করেছিলেন
“ History is not order. It is disorder: a rational disorder. At the very moment when it maintains order, i.e. structure, history is already on the way to undoing it.”   পি থম্পসন লিখেছেন “History is not a factory for the manufacture of Grand Theory, like some Concorde of the global air, nor is it an assembly-line for the production of midget theories in series. Nor yet is it some gigantic experimental station in which theory of foreign manufacture can be ‘applied’, ‘tested’, and ‘confirmed’. That is not its business at all. Its business is to recover, to ‘explain’, and to ‘understand’ its object: real history. The theories which the historians adduce are directed to this objective, within the terms of historical logic,…”   
(২) দ্বিতীয় বক্তা সুকৃতিরজ্ঞন বিশ্বাস তপোধীর ভট্টাচার্য বর্ণিত মানবমুখীন ধর্মীয় মতের অনুরূপ মতুয়া ধর্মের কথা উল্লেখ করেছেন, যে ধর্মের জন্ম হয় পূর্ববঙ্গের দলিত নমঃশূদ্রদের আত্মমর্যাদার আন্দোলন, হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের ব্যাপক শিক্ষা আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের গর্ভে। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চকোটির নম:শূদ্ররা এই ধর্মকে শাসকের ছত্রছায়ায় ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন,বামফ্রন্ট তৃণমূল হয়ে এই ধারাটি এখন হিন্দুত্ববাদে উজ্জীবিত হওয়ার চেষ্টা করছে সংঘ পরিবারের হাত ধরে, তথাগত রায় এই উচ্চকোটিরই প্রতিনিধি। তথাগত রায় নিজে ইতিহাসবিদ না হয়েও ক্যামব্রিজ ট্রিনিটি কলেজর ফেলো জয়া চ্যাটার্জিকে যতই তথাকথিত ইতিহাসবিদ হিসেবে উপহাস করুন না কেন, বিদ্বৎ সমাজ জয়া চ্যাটার্জি রচিত ১৯৩২-১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাজনের ইতিহাসকে অবশ্য পাঠ্য হিসেবেই ভূষিত করবে, অন্যদিকে তথাগত রায়ের যা ছিল আমাদের দেশবই বৌদ্ধিক মহলে ইতিহাস রচনার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ বলে বিবেচিত না হওয়ারই সম্ভাবনা। যাইহউক,   গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের প্রগতিশীল ধারাকে উজ্জীবিত করার মূল আধার হবে পশ্চিমবাংলার পিছিয়ে পড়া মেহনতি অংশ ও নাগরিকত্বহীনতায় জর্জরিত দণ্ডকারণ্য ও আসামের দরিদ্র মেহনতি নমঃশূদ্ররা। এই আন্দোলনের প্রতিনিধি সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাসেরা। তাই তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন আন্দোলনের ইতিহাসের উপর। তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন বাংলার সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইতিহাসের উপর। ১৯০৫-১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাজন ও বাংলা বিভাজন রদ উভয় ক্ষেত্রেই বাঙালি বর্ণহিন্দু ও বাঙালি দলিত-মুসলমানের দুটি অক্ষের সংঘাতের কাহিনি তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন।        
 
এই সংঘাত যে অন্তর্বস্তুতে জমিদার শ্রেণি ও প্রজা কৃষক-মজুর শ্রেণির সংঘাত তা তিনি তথ্য সহকারে আলোচনা করেছেন। জাতপাত ও ধর্মীয় ঘৃণা বাংলার ও বাঙালির রাজনীতিতে যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি থেকেও তিনি তুলে ধরেন। অখণ্ড বাংলা গড়ে তুলতে শরৎ বসুর মত বর্ণহিন্দু কংগ্রেসি গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রয়াস কংগ্রেসি বর্ণহিন্দুরাই কীভাবে বানচাল করে দিয়েছিলো তাও উল্লেখ করেন তিনি। কংগ্রেসিদের কুটিল চক্রান্তই বাংলা বিভাজনকে নিশ্চিত করে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের লক্ষ্যে সংঘ পরিবার অখণ্ড বাংলা গঠনের প্রয়াস বানচাল করে দেওয়ার ক্রেডিট দিতে চায় হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে। কিন্তু দেশ তথা বাংলা বিভাজনের মাধ্যমে দেশ-জাতির কোমর ভেঙে দেওয়ার ক্রেডিট-ডিসক্রেডিট সবকিছুই প্রাপ্য তৎকালীন কংগ্রেসি বর্ণহিন্দু নেতৃত্বের, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হিন্দু মহাসভা বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মত নেতৃত্বের ও বিপরীত দিক থেকে দুর্বল দলিত সংগঠন বা বাবাসাহেব আম্বেদকর ও যোগেন মণ্ডলদের মত নেতৃত্বের এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মত রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ছিল না। গোটা আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোকপাত করে সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস বাংলা বিভাজনের এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।কিন্তু এই ইতিহাস বয়ান অসম্পূর্ণ ও একপেশে থেকে যায় যদি আর্থ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে মুখ্য চালিকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা ও বর্ণহিন্দু-দলিত-মুসলিম সম্পর্কে সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব সবিশেষ গুরুত্ব না পায়। বাংলা বিভাজনে যেমন ব্রিটিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে লাভবান বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণির স্বার্থ জড়িত ছিল, ঠিক তেমনি ব্রিটিশ তাবেদার ব্যবসায়ী বিড়লাদের স্বার্থ জড়িত ছিল দেশ বিভাজনের ক্ষেত্রে। সংঘাতের ক্যানভাসে তিনটি মেরুর যেমন সাম্রাজ্যবাদ,আধিপত্যাধীন বর্ণহিন্দু সমাজ ও প্রান্তিক দলিত-মুসলিম সমাজের আন্তঃক্রিয়া আজ অব্দি চলছে, সেখানে সাম্রাজ্যবাদ রয়েছে মুখ্য ভূমিকায়। ব্রিটিশ আমলে Drain’ and ‘de-industrialisation’ অর্থাৎ ভারতবর্ষের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার ও দেশীয় শিল্প যেমন বস্ত্র শিল্প ধ্বংস এই ছিল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়ম। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির অধীনে এই নিয়ম খানিকটা নিয়ন্ত্রিত হয় স্বাধীন ভারতে পরিকল্পনা অর্থনীতি ও আমদানি-সামগ্রী উৎপাদনের নীতির মাধ্যমে। এখন বিশ্বায়নের হাত ধরে বিদেশি বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজির রূপে সাম্রাজ্যবাদ আবার আধিপত্যাধীন অবস্থায়। এই পুঁজির নিয়মের পরিণামই হলো আম-জনতার ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়া, অসাম্য বৃদ্ধি ও বিশাল বেকার শ্রমিকের মজুত ভাণ্ডার তৈরি করা। রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নীতি এই প্রক্রিয়াকে মদত দেয়। যে সরকার ও রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়মকে সহায়তা করে সেই সরকার ও রাষ্ট্রে বর্ণবাদী আধিপত্য বিদ্যমান। সুতরাং এই আধিপত্যকে ভাঙতে হলে আমাদের চর্চা করতে হয় সাব-অর্লটান শ্রেণির আন্দোলন ও রাজনীতির ইতিহাসের। বিগত কয়েক দশক থেকে ইতিহাসের সাব-অর্লটান স্টাডিজের রণজিৎ গুহদের মত বহু ইতিহাসবিদ কৃষক সংগ্রাম ও সাব-অর্লটান চেতনার ইতিহাস চর্চা করে চলেছেন।
       
কাস্ট-ক্লাস-ট্রাইব-জেন্ডার-রিলিজিয়ন ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্কের ইতিহাস সাব-অর্লটান ইতিহাস চর্চাকে সমৃদ্ধ করছে। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেঞ্জিল সালধানা যেমনি ব্যাখ্যা করেছেন, সাব-অর্লটান চেতনার ইতিহাস অটোনমাস হতে পারে না, একটা সামগ্রিক কাঠামোয় হোলিস্টিক চর্চা জরুরি। সমাজবিজ্ঞান ও দলিত-নিপীড়িত সাব-অর্লটান চেতনার আদান-প্রদানের সংশ্লেষ জরুরি। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যেমনি প্রশ্ন তুলেছেন Can the subaltern speak?” বা মেজ্জিও লিখেছেন can the subaltern be heard?” সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির নিয়মকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে  শ্রমিকশ্রেণিই বিপরীতক্রিয়ার মূল শক্তি (Countervailing force)                      

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন