Posted by স্বাভিমান

 বাংলা ভাগ, শ্যামাপ্রসাদ ঃ অতীত, ইতিহাস

২০ জুনে পশ্চিমবঙ্গের জন্ম দিবসের উদযাপনকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের এক গণচর্চা শুরু হয়েছে। সেই ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রে চলে এসেছেন বিতর্কিত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বিভিন্ন তথ্য পেশ করে ঐতিহাসিক সত্য দাবি করা হচ্ছে। প্রেক্ষিত হিসাবে রয়েছে বাংলা বিভাজন বনাম অখণ্ড বাংলা গঠনের প্রয়াস। যে তথ্যগুলো পেশ করা হচ্ছে তথ্যভিজ্ঞ মহলের সেগুলো বহু আগে থেকেই জানা। বর্তমান প্রেক্ষিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সামনে রেখে পশ্চিমবাংলার জন্মকূণ্ডলী লেখার গণচর্চার পেছনে আসল উদ্দেশ্য বাঙালির ভেতরের বিভাজনকে চাগিয়ে দেওয়া ও ঘৃণার চাষে সারপানি দেওয়া। একই দৃষ্টিকোণ থেকে একদল নব্য প্রগতিশীলদের ইতিহাস চর্চায় অংশগ্রহণ করতে দেখে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এমনকি ঘৃণার চাষকে জ্ঞানের চাদর পড়াতে কেউ কেউ কেউ খানিক দস্তয়েভস্কির সাহিত্য থেকে মনস্তত্বও তাতে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যাতে ঘৃণার চাষকে গণচর্চা জ্ঞানের চর্চা হিসাবে প্রতিভাত হয়। তাদের জন্মকুণ্ডলী বানানোর জ্যোতিষীর মুন্সিয়ানায় দু’টি ধারাই প্রধান – হিন্দু ও মুসলিম ধারা। লেবার রুমে জন্মের সময়ের রেকর্ডের ভিত্তিতে জ্যোতিষী কুষ্ঠি লিখেন, তারাও নথিপত্রে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তাকেই ইতিহাস হিসাবে তুলে ধরেন। নথিপত্র লেখারও যে নিজস্ব এক ইতিহাস থাকে তা তাদের চেতনার বাইরে থাকে। কারণ বর্তমানের প্রয়োজনীয়তা ও পরিচিতি অনুযায়ীই অতীত আবিষ্কার করার প্রবণতা থাকা স্বাভাবিক, আর সবার নিজস্ব পরিচিতি পরিবর্তনশীল। এমনকি অটোবায়োগ্রাফিকে স্বাভাবিক ইতিহাস বিবেচনা করা হলেও, সেখানে স্মৃতি অতীতকে একেবারে সঠিকভাবে উপস্থাপিত করতে পারে না, কারণ দীর্ঘ জীবন পথে নিজের আত্ম-পরিচিতি পরিবর্তনশীল। আর আমরা যাকে ইতিহাস বলি সেটা তো কালেক্টিভ অ্যাকুমুলেশন। To use Hegel's formulation, "What the subject is, is the series of his actions." Oxford English Dictionary tells us, "history as a relation of incidents." 

বর্তমান অতীতকে জানতে পারে এবং তার একটি থাম্ব-রুল রয়েছে - সেই ধারণাটি এসছে ইউরোপীয় ইতিহাস চর্চা থেকে এবং তাকেই হাতিয়ার করছে হিন্দুত্ববাদীরা। অনুশীলন থেকে ইতিহাস চর্চার ধারণা এসছে এক ভবিষ্যত-নির্মাণের কল্পনা থেকে। সেখানে হিন্দু-বাংলাকে প্রসারিত করার ভবিষ্যত ধারণার অনুশীলন থেকেই অতীত চর্চা হবে, বিপরীত প্রক্রিয়ার অনুশীলনই তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। শাসকের পক্ষে অনুশীলনের বিপরীতে শোষকের পক্ষে। 

প্র্যাক্টিসিং মার্ক্সবাদীদের ইতিহাস চর্চায় কাঠামো ও উপরিকাঠামোয় বিভাজন যে সমস্যার তৈরি করেছিল তার ফাঁকফোঁকর দিয়েই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাস চর্চা ঢুকে পড়েছে, ইতিহাস চর্চাকে ডিটারমিনিস্টিক করে তোলা ছিল মার্ক্সবাদীদের ভুল, যদিও ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার বলেছেন, আমরা অতীত বুঝতে পারি, জানতে পারি না। সেই বোঝার চরকায় খানিক তেল দিলে, একথা বোঝা কঠিন নয় যে, বাংলাতে যেমন হিন্দু ধারা ও মুসলিম ধারা ছিল, আরেকটি ধারা ছিল যা স্বাধীনতা সংগ্রামের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া ধারা। অন্যথায় অবিভক্ত বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামকে বলতে হয় মায়া। সেই তৃতীয় ধারায় কোন নেতারা কতটুকু নিজেকে যুক্ত করেছিলেন সেটা বিচার্য বিষয় না হলেও, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যে ছিলেন না সেটা বলা যায়। 

বাংলা বিভাজন সেই তৃতীয় ধারাকেই নস্যাৎ করেছে ও ভেঙে দিয়েছে। পূববাংলা পাকিস্তানে থাকেনি, অবিভক্ত বাংলাও পাকিস্তানে থাকত না, বরঞ্চ অচিরেই আবিভক্ত বাংলা এক অখণ্ড ফেডারেল গণতান্ত্রিক ভারতের “পিভট-পাওয়ার” হয়ে উঠত, বিড়লা বা ইস্পাহানি কারুরই মনোবাসনা পূর্ণ হতো না, বাংলা বিভাজন হয়েছে এদের মনোবাসনা পূর্ণ করার বলির পাঁঠা।

দেশ-বিভাজনের ইতিহাস লেখা এই নোটের উদ্দেশ্য নয়, ইতিহাস আসলে কী সে নিয়ে পেশ্ন তোলাই এই লেখার লক্ষ্য। বিদ্যাতয়নিক প্রতিষ্ঠান্সমূহ ২০ এবং ৩০ বছর এই দু’টি রুল মেনে ইতিহাস চর্চা করে। ইতিহাস বা অতীত কী সে ধারণায় থাম্ব-রুল, অনুশীলন, কাঠামো-উপরিকাঠামো ইত্যাদি উল্লেখ ইতিমধ্যে করেছি। কিন্তু ইতিহাস লেখা কী করে সম্ভব? অতীত মানে মৃত, বর্তমান ইতিহাসবিদেরা সরাসরি সমীক্ষা বা পরিদর্শন করতে পারবেন না। তথাপিও অতীত থেকে, পরিকল্পিতভাবে নয় বরং দুর্ঘটনাক্রমে, পাহাড়প্রমাণ অবশেষ, ধ্বংসাবশেষ, দলিল দস্তাবেজ থেকে যায়, যাকে ইতিহাসবিদেরা গ্রহণ ও বর্জন করে ইতিহাস চর্চা করেন, যাকে হেরোডিটাস বলেছিলেন “ওয়ার্ক হিস্টরি”। এটা একধরনের এনকোয়ারি, যার আধারে আমরা অতীত জানার দাবি করতে পারি না। আবার সমাজ ও অর্থনীতিকে প্রধাণ্য দিয়ে ইতিহাস  ব্যাখ্যা হতে পারে, বিপরীতে ইতিহাস তথ্যের প্রেক্ষাপট হতে পারে, কিন্তু সেটা অতীত জানার প্রক্রিয়া হতে পারে না। 

লেভি-স্ট্রস, ব্রডেলরা বহু সাব-সিস্টেমের কথা বলেছেন। এই সাব-সিস্টেমের সম্ভাব্য কম্বিনেশন ১৬,৭৭৭,২১৬ ভ্যারিয়েবল হতে পারে যাকে কম্প্যুটারের মাধ্যমে ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে বলে স্টোইয়ানোভিচ বলেছেন। এই কাঠামোগত ধারণায় ইতিহাস হয় ওঠে “either informing more and explaining less or explaining more and informing less. এখানে নামব সমাজ আর ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে না। এই প্রক্রিয়া যদি বোধগম্য হয়, তাহলে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা জীববিজ্ঞান, মনোস্তত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, পদার্থ-বিজ্ঞান সবকিছুর উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে আলাদা করে ইতিহাসকে না রেখে সামগ্রীক চর্চার দিকেই যাওয়া ভাল। 

এই প্রেক্ষিতে অতীত সম্পর্কে ধারণায় পদার্থবিজ্ঞানের দুনিয়ায় সামান্য উঁকি মারা যাক। একটি কণা A থেকে B’তে এসেছে  একটি নির্দ্দিষ্ট পথে – আমাদের সাধারণ বোধের জগত তা’ই বলে। কিন্তু কোয়ান্টাম বাস্তবতায় সেরকম হয় না, বহুবিধ সম্ভাভ্য পথ রয়েছে, এবং ফলে অতীৎ কোন নির্দ্দিষ্ট রেকর্ড নয়। আমাদের পর্যবেক্ষণের ফলে সেই সম্ভাব্য সবগুলির মধ্যে একটি ন্যারেটিভ উঠে আসে। আবার কোয়ান্টাম বিজড়ন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে দূরত্ব যা’ই হোক না কেন, দু’টি কণা এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে একটিতে যদি কোন পরিবর্তন হয়, তাহলে অন্যটিতে একই ধরণের পরিবর্তন হবে – একটি যৌথ ব্যবস্থা। তার মানে ভবিষ্যতের কোন ঘটনা অতীতের কণার চরিত্রে প্রভাব ফেলতে পারে, বর্তমানে অতীত মেজারমেন্ট করতে গেলে মেজারমেন্ট ঠিক করে অতীত কী রূপে ছিল বা কোন পথ ধরে বর্তমানে এসেছে।  আবার ভবিষ্যতও অতীতকে বদলাবে। 

পদার্থবিজ্ঞানের এই যুক্তি ম্যাক্রো-ওয়ার্ল্ড হিসাবে মামবসমাজ প্রয়োগ করলে গণ-ইতিহাস চর্চার চরিত্র বোঝা যায়। এখানে দু’টি কণা, এক শাসক শ্রেণি, দুই, শ্রমিকশ্রেণি। শাসকশ্রেণি শ্রেণি হিসাবে বিদ্যমান, শ্রমিকরা রয়েছে শ্রেণি হয়ে ওঠার এক প্রক্রিয়ায়। ১৯৯২ সালের মন্দির মসজিদ ঘটনাকে যদি অতীতকে মাপার বর্তমান প্রক্রিয়ার শুরু হিসাবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবে গণ-ইতিহাস চর্চায় শাসকশ্রেণির চরিত্র প্রকট হয়েছে। প্র্যাক্টিসিং মার্কসীয় ইতিহাস চর্চায় কোটেশনবাদী দুর্বলতা ব্যুমেরাং হয়ে হিন্দুত্ববাদীদের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে “হিন্দু-বাংলার” প্রবক্তা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি গণ-নায়ক হয়ে ফিরে এসেছেন। 

বিপরীতে কম্যুনিস্ট অনুশীলন হচ্ছে সেই মেজারম্যান্ট যা শ্রমিকশ্রেণির পথ ধরে ইতিহাস চর্চাকে প্রকট করে তুলতে পারে এবং শ্রমিকের ভবিষ্যতে শ্রেণি হয়ে ওঠার ঘটনা ইতিহাসের গণচর্চায় শ্রমজীবীর চরিত্রকে প্রকট করে তুলবে। সেখানে নিশ্চিতভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী নয়, শরৎ বসু, সি আর দাস প্রমুখরা হয়ে উঠবেন প্রধান চরিত্র। কারণ সেখানেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারায় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত একই ব্যবস্থায় বাঁধা।

Posted by স্বাভিমান

 বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ

নবপ্রজন্মের বাজে খরচ এবং আমার বাজে কথা ঃ মিলাইয়া দিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ

অরূপ বৈশ্য

রুজি-রোজগার নাই, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তা নাই – নবপ্রজন্ম লড়িতে চায়। কীভাবে? উদ্দেশ্য-লক্ষ্য নাই, মতাদর্শ ও প্রেরণার উৎস নাই – নবপ্রজন্ম প্রাণ খুঁজিতে চায়। কীভাবে? উত্তরের জন্য দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যাহা খুঁজিয়া ফিরিতেছ, তাহা কী খুঁজিতে পারিবে রবীন্দ্রনাথে? কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড?  

রবীন্দ্রনাথ তাঁহার গল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধের কিছু উদ্ধৃতির মাধ্যমে নবপ্রজন্মকে কী বলিতে চাহিয়াছেন – এইভাবে মূল্যায়নের পদ্ধতিতে রবীন্দ্রনাথ ও নবপ্রজন্ম উভয়ের প্রতি অন্যায় করা হইয়া থাকে। কিন্তু আমি নিরূপায়। সংক্ষিপ্ত এই আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগতকে নবপ্রজন্মের সাথে আমাকে জুড়িতে হইবে। সামগ্রীক বক্তব্যকে পাঠক যখন সংশ্লেষিত রূপে তার অন্তর্নিহিত সত্তাকে আবিষ্কার করিতে সক্ষম, তখনই রবীন্দ্রনাথ ও নবপ্রজন্মের প্রতি করা এই অন্যায়ের পদ্ধতিও তাৎপর্যপূর্ণভাবে অর্থবহ হইয়া উঠিতে সক্ষম।

“রবীন্দ্রনাথ লিখিলেন, 

আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,

চুনি উঠল রাঙা হয়ে।”

বস্তুজগতে যাহা পান্না ও চুনি, বস্তুজগতকে দেখার মানবমনের ভাব দিয়া পান্না ও চুনি সবুজ ও লাল হইয়া উঠিয়াছে। বিষয় ও বিষয়ীর সংশ্লেষই হইতেছে বাস্তবতা, বস্তুজগতের আলাদা করিয়া কোন অস্তিত্ব নাই। সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথ অদ্বৈতবাদী – জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক ও অভিন্ন। আধুনিক কোয়ান্টাম বিজ্ঞান বলিয়াছে, ব্যক্তির পর্যবেক্ষণের আগে পর্যন্ত, বেড়াল একইসাথে জীবিত ও মৃত। দেখার পর, হয় বেড়াল জীবিত অথবা মৃত এবং সেটাই বাস্তব। এইরকম কী হইতে পারে যে একইসাথে একজন দেখিলেন বিড়াল জীবিত, আরেকজন অন্যত্র দেখিলেন বিড়াল মৃত – বহুবিশ্বের বাস্তব? আইনস্টাইন দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর বিজ্ঞানী নেইল বোরের সাথে বিতর্ক করিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়িয়া গেলেন – কোয়ান্টাম বাস্তব সঠিক, কিন্তু বিজ্ঞান এখনও সম্পূর্ণ রহস্য জানে না যাহা দিয়া প্রমাণিত হইবে, বস্তুজগত মানুষের চেতনা নিরপেক্ষভাবে বিরাজ করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মনোজগত ও দার্শনিক বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মনোজগত একই সূত্রে মালা গাঁথিল না। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের জগত মিলিল কী?  

রবীন্দ্রনাথের চেতনা ও কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের চেতনার মধ্যে পার্থক্য থাকিলেও, সামাজিক চেতনায় বাস্তব উদ্ভাসিত। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নবপ্রজন্মের এক ক্ষুদ্র অংশ বিপুল অর্থে বৈভবের জীবনের ভবিষ্যত দেখিতেছে, বিপরীতে বৃহত্তর অংশ দেখিতেছে রুজি-রোজগারহীন হতাশার ছবি। সেজন্যই বাস্তব অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। প্রকৃতিবিজ্ঞান যখন বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গবেষণার মাধ্যমে বা মেজারমেন্টের মাধ্যমে নতুন চেতনার উন্মেষ, সমাজবিজ্ঞান বলে বাস্তব পরিবর্তনের অনুশীলনের মাধ্যমে নতুন সমাজ গঠনের চেতনার উন্মেষ। রবীন্দ্রনাথ কী বলিলেন? 

রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, 

“বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।

অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়

লভিব মুক্তির স্বাদ।”

ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তাকে অতিক্রম করিয়া সমগ্র মানুষের তথা সমাজের কল্যাণের মাধ্যমেই মুক্তি লাভ করার কথা যে বিশ্বকবি বলিয়াছেন, তিনি জৈবিক প্রয়োজনকে চেতনার প্রয়োজন হইতে আলাদা করিয়াছেন, অদ্বৈতবাদ হইতে খানিক দূরত্বে গিয়ে মানবতাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছেন। আবার বিপরীতে বলিলেন,

“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে

দেখতে আমি পাই নি।” 

সমগ্রকে ব্যক্তির অন্তরে স্থান দিয়াছেন। সত্যের সন্ধানে রবীন্দ্রনাথ বহুমুখী ভ্রমণ করিয়াছেন। কিন্তু নবপ্রজন্ম অস্থির। সে সত্যের বহুমুখী অনুসন্ধানে বিভ্রান্ত, সে পথহীন উদভ্রান্ত।   

রবীন্দ্রনাথ “বাজে কথা” শির্ষক এক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন, “অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে যথার্থ চেনা যায়। কারণ, মানুষ ব্যয় করে বাঁধা নিয়ন-অনুসারে, অপব্যয় করে নিজের খেয়ালে। যেমন বাজে খরছ, তেমনি বাজে কথা। বাজে কথাতেই মানুষ আপনাকে ধরা দেয়। উপদেশের কথা যে রাস্তা দিয়া চলে মনুর আমল হইতে তাহা বাঁধা, কাজের কথা যে পথে আপনার গোযান টানিয়া আনে সে পথ কেজো সম্প্রদায়ের পায়ে পায়ে তৃণপুষ্পশূন্য চিহ্নিত হইয়া গেছে। বাজে কথা নিজের মতো করিয়াই বলিতে হয়।” 

উদভ্রান্ত নবপ্রজন্ম বাজে খরচ করিয়া চলিয়াছে, আমিও বাজে কথা বলিতে চাহিয়াছি – রবীন্দ্রনাথ সেখানে আমাদের মিলাইয়া দিয়াছেন। আমাদের শাসন, শাসক ও তাদের অনুগামীরা কেজো সম্প্রদায়, তাঁরা মনুর বাঁধন মানিয়া চলে, তাদের চলার পথ তৃণপুষ্পশূণ্য। আমার বাজে কথা সেই বাঁধন অস্বীকারের, নতুনের আবাহনে বিদ্রোহের।  

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন