আজকের দুনিয়ার সমাজতন্ত্র

Posted by সুশান্ত কর Labels: , ,




ভাস্কর নন্দী
[এই দলিলটি তৈরি হয়েছিল ১৯৮৮ সনে তখন তিয়েন আন মেন স্কোয়ারের ঘটন ঘটেই নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙেই নি। সিপি আই [এম এল]-এর অস্থায়ী কেন্দ্রীয় সমিতির সভাতে দলিলটি আলোচিত এবং গৃহীত হয়েছিল। এই দলিলটির খসড়া আলোচিত এবং গৃহীত হয়েছিল। সেটি প্রস্তুত করেছিলেন বর্তমান লেখক। ২৪ বছর পরে এই দলিল পঢ়ার সময় মনে হয় যেন এ তো গতকালকের ঘটনা। দলিলটিতে সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, সর্বহারার একনায়কত্ব, স্থায়ী সৈন্যবাহিনী এবং রাষ্ট্রের বিলুপ্তি সম্পর্কে যেসব ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে সেই সব অত্যন্ত মৌলিক ধারণা। ২৪ বছররে ইতিহাস এই ধারণাগুলোকে আরো শক্তিশালী করেছে। ---লেখক ]


ক্টোবর বিপ্লবের পর বহু দশকজুড়ে সমগ্র বিশ্বের কম্যুনিস্টরা সমাজতন্ত্রের আদর্শ হিসেবে প্রথমে রাশিয়া আর তার পর চীনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এই আদলগুলো এতোই প্রশ্নাতীত ছিল যে বহু কম্যুনিস্ট তাদের নিজের নিজের দেশের ভবিষ্যৎ সমাজকে মোটামুটি রাশিয়া এবং চীনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ভাবছিলেন। এই ভাবাটি বেশ কিছু ঘটনাতে ধাক্কা খায়। সেগুলো হচ্ছে (১) কম্যুনিস্ট ভ্রাতৃত্বের থেকে যুগোস্লাভিয়ার বহিষ্কার; (২) ১৯৫৬তে হাঙ্গেরিতে অভ্যুত্থান এবং পুব জার্মানি এবং পোল্যান্ডেও অনুরূপ অভ্যুত্থান; এবং (৩) ইউরো-কম্যুনিজমের উদ্ভব এবং বিকাশ। কিন্তু সেগুলোতে সমাজবাদ সম্পর্কে মতৈক্য ভাঙ্গে নি। ঐক্য ভেঙ্গেছিল ১৯৬০এর মহা-বিতর্ক এবং চিনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর, যখন কম্যুনিস্টরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক অংশ ভাবলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক নতুন পুঁজিবাদী শ্রেণি ক্ষমতা দখল করেছে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী দেশে রূপান্তরিত করেছে। অন্য অংশ আগের মতই সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবেই দেখতে থাকলেন। প্রথম অংশ প্রথম অংশ বিশ্বাস করলেন যে চিনা কম্যুনিস্টরা লিউ সাও চির মতো ‘পুঁজিবাদী পথের পথিক’দের বহিষ্কার করে  দৃঢ়ভাবে সমাজতন্ত্রের পথে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বুর্জুয়া ভাবধারা এবং তার প্রয়োগের বিরুদ্ধে বিপ্লবী গণ-আন্দোলনকে গভীর করেছেন। দ্বিতীয় অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সঠিক বলে গণ্য করলেও চিনকেও সমাজতান্ত্রিক দেশ বলে গণ্য করেছিলেন, যদিও তাঁরা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমালোচনা করেছিলেন এবং চিনকে হঠকারী বলেছিলেন।
মাও জে দঙের মৃত্যুর  কিছু পরেই ক্ষমতা –সম্পর্কের এক আকস্মিক এবং নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে । সেনাবাহিনীর বেইজিং গ্যারিসন চিনা কম্যুনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর অধিকাংশকে গ্রেপ্তার করেন। তাদের মধ্যে সেই চারজনও ছিলেন যারা ছিলেন মাও জে দঙের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং চিনে সমাজবাদ প্রতিষ্ঠায় মাওয়ের পথের সমর্থক।  চিনা কম্যুনিস্ট পার্টি এই ঘটনাকে ‘চারচক্রী চূর্ণ করার’ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে। আমরা একে একটি দিকনির্দেশক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম। কারণ এর পরে সমাজতন্ত্র গঠনের প্রশ্নে চিনা কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের মত মিলতে আরম্ভ করে। এই মতের মিল হবার পরে পুরোনো সংশোধনবাদী পার্টিগুলো সহ অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে মহাবিতর্কের আগে সমাজতন্ত্রের গঠন সম্পর্কে যে ধরণের মতৈক্য ছিল সেটি আবার ঘুরে আসবে। কিন্তু ঘটনা সেভাবে এগোল না। কারণ, প্রথমে চিনে এবং তার পরে গর্বাচেভের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন এতো সব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক , সামাজিক এবং মতাদর্শগত অনুশীলন আরম্ভ করল যেগুলো স্তালিনের সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বারা অনুসৃত নীতিগুলোর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এতে এমন ধারণা উপস্থিত হল যে যেকোনো ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশে যে নীতি অনুসরণ করে সেটাই সমাজতান্ত্রিক নীতি। অথচ তাতে কৃষি এবং শিল্পকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন করে দেয়া হয় এবং নির্ভরশীল বা আধা ঔপনিবেশিক দেশ হিসাবে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্তিকরণ হয় এবং এসবের ফল স্বরূপ বৃহৎ আকারের বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি এবং নৈতিক অবক্ষয় ঘটতেই থাকে।
এই ধারণাতে সবাই সমাজবাদী; বিশেষ করে মার্কিন, ইউরোপীয় এবং জাপানি পুঁজিপতিরাও। তাদের প্রচার যন্ত্র গর্বাচেভ, দেং জিয়াও পিঙের প্রতিটি শব্দের প্রতিধ্বনি করছে। চিন আর রাশিয়াতে মানব অধিকারের অভাব দেখে তারা আগে যে চিৎকার চেঁচামেচি করত, সেসবও বাতাসে মিলিয়ে গেছে। অথচ, মাও জে দঙের আমলে যারা ‘পুঁজিবাদী পথে’র বিরোধিতা করেছিলেন এবং ‘সর্বহারা একনায়কত্বাধীন বিপ্লব চালিয়ে নিয়ে যাবার’ প্রবক্তা ছিলেন, এমন লাখ লাখ পার্টি সদস্যকে কারাগার বা শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়েছে। রাশিয়াতে গর্বাচেভ যে পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছেন সেখানে মুষ্টিমেয় পার্টি আমলার হাতে এতো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে যে স্তালিনের তথাকথিত ‘ব্যক্তিপূজা’র দিনেও অকল্পনীয় ছিলগর্বাচেভের ব্যবস্থা অনুসারে সর্বনিম্নের থেকে সর্বোচ্চ সমস্ত সরকারি পদাধিকারী পার্টির দ্বারা মনোনীত হবে। আসলে, পশ্চিমী দুনিয়া আজ বাজারের স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের বড় বড় অনুদান তারা পেয়েছে এবং চিন রাশিয়ার বিরাট বাজারকে বিশ্ব পুঁজিবাদী বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পেরেছে।  তাই তাদের আর কীই বা স্বাধীনতা চাই?
এখন র‍্যাগন এবং থ্যাচারের মতো চূড়ান্ত রক্ষণশীলেরাও রাশিয়া চিনের সমাজতন্ত্রের নতুন রূপের প্রশংসাতে পঞ্চমুখ। এই দেশগুলোর মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তার স্থান সমাজতান্ত্রিক সহযোদ্ধার সম্পর্ক নিয়েছে (যদিও জাতীয় স্বার্থের জন্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে)এই অবস্থাতে কিছু সত্যিকার কম্যুনিস্টরাও সমাজবাদের মতাদর্শগত, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়বস্তু নিয়ে সমস্যাতে পড়ে গেছেন। ‘সমাজতান্ত্রিক শিবিরে’র নেতাদের কাছে মার্ক্স এতোটাই পুরোনো যুগের লোক ছিলেন যে  তিনি মটর গাড়িতে ওঠেন নি বা এরোপ্লেন চোখেই দেখেন নি। লেনিনের এতো তাড়াতাড়ি মৃত্যু হয়েছিল যে তাঁকে হিসেবেই নেয়া কঠিন।  মাও জে দঙ যখন শেষ বয়সে সবচাইতে বেশি সবার থেকে বেশি অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন সেই সময়কার মাও যে দঙকে তারা এক সামন্ততান্ত্রিক প্রভুর মতো অহংকারী এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তিরূপে চিহ্নিত করেন। বস্তুত, চিন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন নেতারা সমাজতন্ত্র গঠন সম্পর্কে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন এবং মাও জে দঙের সমস্ত তত্ত্বকে নাকচ করেছেন---যদিও তাঁরা এখনো মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের নামে শপথ নেন।  যদি অভিজ্ঞতা এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে এই তত্ত্বগুলো নাকচ হবার যোগ্য বলে গণ্য হয়, তবে আমাদের বলবার কিছু নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতা এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ কী দেখায়? এই অভিজ্ঞতা সমস্যাসংকুল, কারণ ‘পেরেস্ত্রইকা’, ‘গ্লাসনস্ত’ বা ‘চার আধুনিকীকরণ’এর মাধ্যমে যা করা হয়েছে সেটি রাশিয়ার নতুন আর্থিক নীতি (NEP)-র পরবর্তীকালের আদর্শের জায়গা নিয়েছে। মাও জে দঙের সমর্থকেরা বামপন্থী অবস্থান থেকে এসবের সমালোচনা করেছিলেন এবং এই নীতিগুলো যে সমাজতান্ত্রিক সম্পর্কের বিস্তার ঘটাতে সহায়ক হয় নি সে দাবি করেই বলতে পারি।
তাই অস্পষ্টতা দূর করা এবং সঠিক সমাজতান্ত্রিক দিকটির সন্ধান করবার জন্যেই আমাদের সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক অবস্থানগুলো পর্যালোচনা করতে হবে এবং বর্তমান সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চিনে যে মতৈক্যের অবস্থান দাঁড়িয়েছে সেই অবস্থানের একটি বৈজ্ঞানিক সমালোচনা দাঁড় করাতে হবে।
সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদ-পরবর্তী কোনো নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা নয়। এ হচ্ছে পুঁজিবাদ এবং সাম্যবাদের মাঝের দীর্ঘ উত্তরণকালীন পর্যায়, যখন পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কগুলোর ক্ষয় হয় এবং সাম্যবাদী উৎপাদন সম্পর্কগুলো বিকশিত হয়। এই পুরোনোর ক্ষয় এবং নতুনের বিকাশ নির্ভর করে সমাজবাদের সমগ্রকাল জুড়ে শ্রেণি সংগ্রাম চালাবার উপর, যখন সর্বহারা একনায়কত্বের রাষ্ট্র একটি ‘শুকিয়ে মরার’ পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যায়। অর্থাৎ এ সহযোগী (associated) শ্রমিকের আত্ম-শাসনের একটি যন্ত্রে পরিণত হয়, তার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক অন্তর্বস্তু তাতে থাকে না। এই শ্রেণি সংগ্রাম অত্যন্ত জটিল এবং সে এক অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। লেনিন যখন বলেছিলেন, “ সর্বহারার একনায়কত্বের যুগে শ্রেণি আছে আর থাকবে” (সর্বহারার একনায়কত্বের যুগে রাজনীতি এবং অর্থনীতি) , তখন তিনি এই কথাই বুঝিয়েছিলেন। তিনি আরো দেখেছিলেন যে সর্বহারার একনায়কত্বের যুগে ‘প্রতিটি শ্রেণির পরিবর্তন ঘটেছে’ এবং চলমান শ্রেণি সংগ্রাম ‘স্বতন্ত্র রূপ নিয়েছে।’  সমাজবাদী রূপান্তর বোঝার জন্যেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং একে নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার দরকার। কারণ এই প্রশ্নে তত্ত্বগতভাবে মার্ক্স, এঙ্গেলস , লেনিন এবং মাও জে দঙের সঙ্গে স্তালিন , গর্বাচেভ এবং দেং জিয়াও পিঙের পার্থক্য নজরে পড়ে। অবশ্য গর্বাচেভ এবং দেং জিয়াও পিঙের সঙ্গে স্তালিনের লক্ষ্যের পার্থক্য ছিল।
১৯৩৬ সনে সোভিয়েতগুলোর সপ্তম কংগ্রেসে দাখিল করা রিপোর্টে স্তালিন পরিষ্কার বললেন, ‘শিল্প ক্ষেত্রে পুঁজিপতি শ্রেণির অস্তিত্ব নেই। কৃষিক্ষেত্রে পুঁজিপতি শ্রেণির অস্তিত্ব নেই এবং ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যবসায়ী আর মুনাফালোভী শ্রেণির অস্তিত্ব নেই। এভাবে সমস্ত শোষক শ্রেণি বিলুপ্ত হয়েছে।” শোষক শ্রেণি যদি বিলুপ্তই হল তবে শ্রেণি সংগ্রামেরও অবসান হলো। সিপিএসইউ এখনো এই থিসিস মেনে চলছে এবং চিনের মাও-পরবর্তী নেতৃত্ব একে আরো শক্ত সমর্থন জানিয়েছে।
এই বক্তব্যের সমর্থনে স্তালিনের সময় থেকে আজঅব্দি এই মূল যুক্তি দেওয়া হয় যে, বাজেয়াপ্তকরণের মধ্য দিয়ে উৎপাদনের উপকরণগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করলেই শোষকের অবসান হয়। এই অতি-সরল যুক্তির আরো সরল একটি অনুসিদ্ধান্ত এই যে এখন ‘প্রত্যেকে তাদের কাজ অনুসারে’ মাইনে পায়!! তারথেকে ‘প্রত্যেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পাবেন’ , সেই অবস্থা পাবার জন্যে প্রয়োজন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ (যা কিনা উন্নত প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে মিলবে)  এবং পণ্যাদির অঢেল সরবরাহ।
এই সমগ্র ধারণার ভিত্তি এই যে শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার আইনি রূপের উপর নির্ভর করে। কিন্তু লেনিন এই বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ছিলেন যে শ্রেণির অস্তিত্ব শুধুমাত্র মালিকানার আইনি রূপের উপর নির্ভর করবে করে না : “শ্রেণিগুলো হচ্ছে জনগণের বৃহৎ গোষ্ঠী। এরা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত সামাজিক উৎপাদনের উপকরণের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের (যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন দিয়ে স্থিরীকৃত এবং সূত্রবদ্ধ ) দিক থেকে আলাদা। ফলে সামাজিক উৎপন্নের কতটা অংশ এরা ভোগ করে আর কীকরে তারা অর্জন করে সেই দিক থেকেও আলাদা। শ্রেণি হচ্ছে জনগণের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী, যেগুলো নির্দিষ্ট এক একটি সামাজিক অর্থনীতিতে আলাদা আলাদা অবস্থান গ্রহণ করবার ফলে এক গোষ্ঠী অন্যগোষ্ঠীর শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে।”( এক মহান সূচনা,সংগৃহীত রচনাবলী ২৯ খণ্ড) ফরাসী মার্ক্সবাদী চার্লস বেথেলহেইম, (যাঁর কাছে আমরা বিভিন্ন দেশের সমাজবাদের ঐতিহাসিক বস্তুবাদী অধ্যয়নের জন্যে ঋণী) এভাবে লেনিনের সংজ্ঞার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, “ এটি লক্ষ্য করবার বিষয় যে লেনিন সামাজিক শ্রেণিগুলোর দ্বারা অধিকৃত অবস্থানকে ‘আইন দিয়ে স্থিরীকৃত এবং সূত্রবদ্ধ’ হবার অন্যতম সম্ভাবনা হিসাবে দেখেন। শ্রেণির প্রকৃত সংজ্ঞাতে এই ‘আইনি সম্পর্কের অস্তিত্বকে পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয় নি” (Class Struggle in the USSR, ১ম খণ্ড, পৃঃ:৫০) আসলে, রাষ্ট্রীয় শ্রেণির আধিপত্যাধীন নজরানা আহরণকারী বিভিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থাতে (Tributory mode of production ) আমরা আইনি সম্পর্কের অস্তিত্ব দেখিনি। আবার বহুক্ষেত্রে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা সামাজিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্বের সর্তের এক একটা অংশ। সামাজিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্বের অন্যান্য সর্তগুলো আরো মৌলিক। সেগুলো হচ্ছে সেইসমস্ত উৎপাদন সম্পর্ক, যেগুলোর উদ্ভব সামাজিক শ্রমবিভাজনের থেকে ,যেমন মানসিক শ্রম এবং দৈহিক শ্রমের মধ্যেকার সম্পর্ক, স্ত্রী-পুরুষের মধ্যেকার শ্রমবিভাজন, দক্ষ শ্রমিক এবং অদক্ষ শ্রমিকের মধ্যেকার তথা কৃষক এবং শ্রমিকের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্য। সর্বহারার একনায়কত্ব এক খোঁচাতে মালিকানার আইনি রূপের অবসান ঘটাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এবং সুগভীর গণআন্দোলন না চালিয়ে অর্থাৎ মাও জে দঙের ভাষাতে ‘সর্বহারার একনায়কত্বাধীন অব্যাহতভাবে শ্রেণি-সংগ্রাম চালিয়ে যাবার’ কাজ না করে সামাজিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্বের এই মৌলিক সর্তগুলোর বিলোপ ঘটানো যায় না। ব্যক্তিগত মালিকানার আইনি রূপগুলোর বিলুপ্তি নিঃসন্দেহে শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে যাবার অণুকুল সর্ত সৃষ্টি করে।
কিন্তু এই বিলুপ্তিকে একটি অমোঘ পরিবর্তনরূপে ধরে নেয়াটা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদীশ্রেণিগুলোর একটি ধাপ্পাবাজি, অথবা ইতিহাসের সঠিক উপলব্ধি নাথাকা বিপ্লবীদের একটি ভ্রান্তি। পুঁজিবাদের সমগ্র ইতিহাস দেখায় যে , আগে আমরা যেসব মৌলিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছি সেগুলোর অর্থনৈতিক রূপ নিজেকে অর্থ, পণ্য, বাজার এবং মূল্যের সূত্র আকারে প্রকাশ করে। উৎপাদন এবং উপরিকাঠামোর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শ্রেণিগুলোর অস্তিত্বের সর্তগুলোকে বিলুপ্ত করবার আগেঅব্দি এই অর্থনৈতিক রূপগুলোর অস্তিত্ব থাকবে। তথাকথিত যুদ্ধ-কম্যুনিজমের যুগে, দেশের অর্থনীতিকে ভেঙে যাবার থেকে এবং দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে সঠিকভাবে হুকুম –অর্থনীতির (command economy) চূড়ান্ত রূপ আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছু মানুষ একেই অর্থ, পণ্য, এবং মূল্যের সূত্রের বিলোপ সাধন, এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্রেণি সংগ্রাম নাচালিয়ে সরাসরি সাম্যবাদী ব্যবস্থাতে উত্তরণ বলে ধরে নিয়েছিলেন।  বাস্তব পরিস্থিতির চাপে তাঁরা শেষঅব্দি কোনটা কী বুঝতে পেরেছিলেন এবং ভুল শোধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছিল। লেনিনের মতে, কোলচাক, দেনিকিন এবং পিলসুদস্কিরা মিলিতভাবে যে ক্ষতি করেছিলেন সে ছিল সবচাইতে বড় ক্ষতি।
শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব বহু নির্দিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে। যেমন মূল্যের সূত্রের কথা বলা হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতির ‘সাফল্যে’র পরে এই সূত্র অন্তর্হিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল। ১৯৫১ সন পর্যন্ত স্তালিন এই ধারণা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু বস্তুগত অবস্থাগুলোকে অস্বীকার করবার ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল তার মুখোমুখি হয়ে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে মূল্যের সূত্র এখনো ক্রিয়াশীল (যদিও সেটি অনেক সীমিত ক্ষেত্রে) , এবং সেটি উৎপাদনের উপকরণ এবং ক্ষেত্রের , বিশেষ করে ভোগ্যবস্তু উৎপাদন ক্ষেত্রের মধ্যে কাজ করে। আসলে পণ্য সম্পর্ক এবং মূল্যের সূত্র এমনটা সীমিত ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে না। কারণ এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মজুরি-শ্রমর প্রশ্ন, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সম্পর্কের প্রশ্ন, এবং সংস্থা আর রাজনৈতিক তথা অর্থনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের প্রশ্ন। অবশ্য ‘শ্রেণির অস্তিত্ব আর নেই’ এটি ধরে নিয়ে আর উৎপাদিকা তত্ত্ব এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সর্বব্যাপী ক্ষমতাতে বিশ্বাস করে শ্রেণি অস্তিত্বের এই রূপগুলোকে আর তাদের পুনরুৎপাদনের সর্তগুলোকে বোঝা বড় কঠিন।    
সোভিয়েত ইউনিয়নে এমন বহু ঐতিহাসিক  পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল যেগুলো এই শ্রেণি-রূপগুলোকে ক্ষয় করবার বদলে  শক্তিশালী করেছিল। নেপ (NEP, নতুন অর্থনৈতিক নীতি)এর সময় থেকে এণ্টারপ্রাইজগুলোর যে আর্থিক স্বাধিকারের নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল তার কথাও বলতে পারি। সঠিক অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশের জন্যে এই স্বাধিকার খুবই দরকারি ছিল। কিন্তু এখন এন্টারপ্রাইজের হাতে সমস্ত ক্ষমতা (কর্মচারী নিয়োগ এবং ছাটাই, উৎপাদনের উপকরণগুলোর বণ্টন, সংরক্ষিত তহবিল ইত্যাদি) কেন্দ্রীভূত হয়ে প্রকৃতপক্ষে ম্যানেজারদের হাতেই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটিয়ে তখন উৎপাদন সম্পর্কের, পরিবর্তনের বেলা এটিই এক শৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এই ম্যানেজারেরা দায়বদ্ধ ছিল শুধু উপরওয়ালা ম্যানেজারদের কাছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, পরিকল্পক আদি পার্টির ভেতর বাইরের লোকেরা মিলে এই ম্যানেজমেন্ট গঠন করেছিল। যৌথ উৎপাদকের হাত থেকে সমস্ত উদ্যোগ এবং ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিলকিন্তু শ্রেণির অস্তিত্ব এবং পুনরুৎপাদন বাস্তবতা এতো কঠোর যে সেটি কখনো কখনো অন্ধ এবং হিংস্ররূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সিপি এস ইউ এই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে। এই রাষ্ট্র প্রথমেই সমগ্র কৃষক সমাজকে (বলপূর্বক যৌথকরণ অভিযানের সময়) বিচ্ছিন্ন করে শ্রমিক –কৃষক মৈত্রীকে ধ্বংস করেছিল এবং পরের কালে বাইরের থেকে চাপিয়ে দেয়া শ্রম-শৃঙ্খলা এবং অন্যান্য বুর্জোয়া পদ্ধতির মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণিকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।
বলপূর্বক কৃষির সমবায়করণের সময় প্রশ্নটি ছিল কৃষির থেকে শিল্পতে অধিক সম্পদ স্থানান্তরিত করবার। একদিক দিয়ে এটা ভুল করে ধরে নেয়া হয়েছিল যে---উৎপাদন সম্পর্ক বদলের জন্যে কৃষকদের, বিশেষ করে গরীব কৃষকের আন্দোলনের ফল হিসেবে আসা যান্ত্রিকীকরণ নয়, বরং উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া যান্ত্রিকীকরণ কৃষিতে বহু বেশি উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করবে। তারউপর ভারি শিল্পের উপর একতরফা বেশি জোর দেয়া হয়েছিল কৃষি আর শিল্প তথা ভারি এবং ছোট শিল্পের মধ্যেকার সমন্বয় সাধনের বিষয়টি অবহেলিত হয়েছিল। এই সমন্বিত বিকাশের প্রশ্নটি শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, বরং এটি গ্রাম এবং শহরের মধ্যে, শ্রমিক এবং কৃষকের মধ্যে পার্থক্যের প্রশ্ন। এই পার্থক্যগুলো অবিরাম শ্রেণি সম্পর্ক সৃষ্টি করে যায়। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং ভারি শিল্পের উপর একতরফা জোর---এই দুটোরই উৎস হচ্ছে উৎপাদিকা শক্তির তত্ত্ব। শেষে গিয়ে বলপূর্বক সমবায়করণের ফলে এতো বিশাল দমন যন্ত্রের দরকার হল যে সোভিয়েত জীবনের সমস্ত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি (পার্টির ভেতরের গণতন্ত্র সহ)  দুমরে ফেলা হল। সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্র পার্টি সদস্য এবং জনগণের উপর যে অবর্ণনীয় হিংসা চাপিয়ে দিয়েছিল, ‘দমন পীড়ন ‘ জাতীয় শব্দ দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করে শেষ করতে পারব না।
এক চূড়ান্ত কেন্দ্রীভূত , হিংস্র এবং কোনো আইন নামানা রাষ্ট্র যন্ত্রের দরকারটি স্তালিনের সামনে কিছু তাত্ত্বিক সমস্যা হাজির করেছিল। একদিক দিয়ে দাবি করা হয়েছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রেণি সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে। তাই যদি হবে শ্রেণি সংগ্রামের থেকে যার উদ্ভব, সমাজের উপরে বসে থাকা সেই বহিরঙ্গ (excrescence ) অর্থাৎ রাষ্ট্রের কেন প্রয়োজন হল? স্তালিন ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছিলেন যে এ ছিল বাহ্যিক শ্রেণি সংগ্রামের ফল, কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাম্রাজ্যবাদী ঘেরাও, বিদেশী গুপ্তচর, এবং অন্তর্ঘাত সৃষ্টিকারীদের মোকাবেলা করবার দরকার পড়ছিল। এই বক্তব্য এতোটাই দ্বন্দ্বতত্ত্ব বিরোধী যে এ নিয়ে বেশি বলবার দরকার নেই। মূল কথা হল এই যে , দমন চলছিল দেশের ভেতরে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর অথচ বলা হচ্ছিল যে বাহ্যিক শত্রুর মোকাবেলা করা হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি শ্রেণিহীন সমাজে রূপান্তরিত হয়েইছিল তবে শ্রেণিহীন সমাজের কোটি কোটি মানুষকে গণ মিলিশিয়াতে সংগঠিত করে জনগণের সেই শক্তির দ্বারা বাহ্যিক শত্রুর মোকাবিলা করা হলো না কেন? স্তালিন এই প্রশ্নটি তুললেন না। মার্ক্স, এঙ্গেলস এবং লেনিন সর্বহারার একনায়ত্বাধীন রাষ্ট্রকে আর প্রচলিত রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন নি। বরং দেখেছিলেন এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে যা শুরু থেকেই ক্ষয় হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে এবং ‘কম্যুন’-এর রূপ নেবে। সে ক্ষেত্রে স্তালিন এক বিপরীত প্রক্রিয়াকে সমর্থন করলেন। আসলে রাষ্ট্র শুকিয়ে যাবার প্রক্রিয়া আরেকটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সেটি হল শ্রমিক এবং কৃষকদের দ্বারা সমাজকে আত্মসাৎ করবার এক গণ আন্দোলন। এর জন্য প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমন্বয় সাধন। কিন্তু সোভিয়েত অনুশীলন ছিল এর বিপরীত। 
উৎপাদিকা শক্তির তত্ত্ব, শ্রেণির অস্তিত্ব অস্বীকার আর রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমানতে বিশ্বাস রেখে করা এই অনুশীলনের ফল হিসেবে একটি রাষ্ট্রীয় শ্রেণির জন্ম হল, যে নতুন বুর্জুয়া রূপে নিজের উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদন করতে শুরু করল। কিন্তু এই বুর্জুয়াদের আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াতে কিছু সময় লাগল। তার কারণ, যে কোনো বুর্জুয়ার প্রতিই মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের শত্রুতামূলক মনোভাব, এই নতুন শ্রেণির শ্রেণিগত উৎস (যাদের বেশিরভাগই এসেছিলেন শ্রমিক শ্রেণির থেকে) এবং স্তালিনের কর্তৃত্বমূলক ক্ষমতা। তাঁর অর্থনীতিবাদ, রাষ্ট্রবাদ  এবং কর্তৃত্ববাদ সত্ত্বেও স্তালিনের মৌলিক আনুগত্য ছিল শ্রমিক শ্রেণির প্রতি। কিন্তু পেরিসে দেশান্তরিত রুশ বুর্জুয়াদের বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী অংশটি ১৯২০এর দশকে সিপিএসইউ-র প্রশংসা করেছিল। তাঁরা বুঝেছিলেন যে এই নীতিগুলো তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের সঙ্গে মেলে। বুর্জুয়া অনুশীলন শ্রেণি সম্পর্কগুলোকে সুদৃঢ় করেছিল। এই অবস্থাতে স্তালিনের মৃত্যু এই শ্রেণির দ্বারা বুর্জুয়া একনায়কত্বকে শক্তিশালী করার উপযুক্ত সর্ত তৈরি করল। ক্রুশ্চেভ থেকে গর্বাচেভ পর্যন্ত যাত্রা পথ হচ্ছে এই বুর্জুয়া একনায়কত্বকে শক্তিশালী করার কিছু পদক্ষেপের ক্রম। এই শ্রেণির সদস্যরা ক্রমে বেশি বেশি করে উৎপাদনের ফল আত্মসাৎ করতে থাকল যার ভিত্তি হল বেসরকারিকরণ এবং বাজারের ভিত্তিতে অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ। অন্যদিক দিয়ে দমনমূলক রাষ্ট্রকেও বাঁচিয়ে রাখা হল।
লেনিনের মৃত্যুর পর থেকে, বা বলা ভালো তিনি যখন রোগশয্যাতে সেই সময় থেকে, সিপিএস ইউ যতই উৎপাদিকা শক্তির তত্ত্বের দিকে আকর্ষিত হতে শুরু করল ততই অনা-রুশি জাতিসত্তার  উপর দমন পীড়ন বাড়তে শুরু করল। শ্রেণি সংগ্রামের দরকারই যদি না থাকে তবে জনগণের আত্মপরিচিতি এবং যেকোনো বৈচিত্র্যকেই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের জন্যে বাধা হিসেবে দেখা হয়। তারউপর আত্মকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। এই জাতীয় দ্বন্দ্বগুলো এখন বিস্ফোরণের আকার নিতে শুরু করেছে।
চিনে কম্যুনিস্ট পার্টির অনুশীলনের মধ্যে প্রথম থেকেই এক দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বে একদিকে ছিল সোভিয়েত নমুনা। ভ্রাতৃপ্রতিম সাহায্যের মাধ্যমে চিনারা এই নমুনাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। আর ছিল এক দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র। অন্যদিকে মাও জে দঙ সোভিয়েতের এই নমুনাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দুই লাইনের সংগ্রাম অনেক আঁকাবাঁকা পথে এগোতে শুরু করেছিল যদিও অবশেষে চারচক্রীকে চূর্ণ করা এবং মাও জে দঙের সমর্থকদের পার্টির থেকে বহিষ্কার করবার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বুর্জুয়া নিজের ক্ষমতা সংহত করতে শুরু করেছিল বলেই মনে হয়। এই প্রসঙ্গে মহান সর্বহারা বিপ্লবের বিষয়ে দুই একটা কথা বলা ভাল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল দিশা সঠিক ছিল। কিন্তু সম্ভবত: কিছু কিছু পদক্ষেপ বাস্তব অবস্থার থেকে সীমা অতিক্রম করে গেছিল। উদাহরণ স্বরূপে, রাষ্ট্রীয় বুর্জুয়ার  দ্বারা সামাজিক উৎপন্ন আত্মসাৎ করা রোধ করতে গেলে শ্রমিক কৃষকদের স্ব-ব্যবস্থাপনার এক সযত্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।   
এর মধ্যে পড়ে নানাধরনের সমবায়করণ, যৌথকরণ এবং দেশব্যাপী ক্ষেত্রউৎপাদন পরিচালনার সংগঠন। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার সময়কাল জুড়ে কারিগরি এবং ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞদের দরকার হয়। অবশ্য এঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং এদের কাজকে  শ্রমিক কৃষকের গণআন্দোলনের অধীন করে ফেলতে হয়। এই অন্তর্ভুক্তি বা অধীন করবার প্রক্রিয়ার গতির উপর নির্ভর করে রূপান্তর সাধন এবং বিপ্লবীকরণের বস্তুগত ভিত্তি। চিনা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে সম্ভবত: এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সম্ভবত এটাই কাজ ছিল। কিন্তু এই বুর্জুয়ার সবচাইতে বড় হাতিয়ার যে সুবিশাল স্থায়ী  সৈন্যবাহিনী, যারা কিনা মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবে অংশগ্রহণ করলেও করেছিল উপর থেকে এবং বিপ্লবী লক্ষ্য নিয়ে অংশ নিলেও সে রাষ্ট্রবাদকে শক্তিশালী করেছিল। আসল কারণ যাই হোক, (এ নিয়ে গভীর অধ্যয়ন এবং বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে) সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ব্যর্থতার পর রাষ্ট্রীয় বুর্জুয়া ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং বিরাট বিপরীত যাত্রা আরম্ভ করেছে।
দ্বিতীয়ত, চিনে রাষ্ট্রীয় বুর্জুয়া ক্ষমতা সংহত করবার পরে এরা বিশ্বজুড়ে পূর্ণ পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওদের পেছনে আছে রুশিরা। উদাহরণ স্বরূপ তথাকথিত ‘দায়িত্বশীল প্রথার’ মাধ্যমে তারা কৃষিতে সমবায় এবং যৌথপামগুলোকে ভেঙে দিয়েছে। চিনে ব্যক্তিগতকরণের এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সাত-আটবছর আগেই। এখন গর্বাচেভ তাদের পথ অনুসরণ করছেন। ‘পেরেস্ত্রইকা’ ‘চার আধুনিকীকরণ’এর থেকে বহু পেছনে পড়ে আছে। আর চিনারা ‘তাঁদের মনকে সমস্ত অন্ধবিশ্বাসের থেকে মুক্ত করেছেন।’, অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণির রাজনীতি বর্জন করেছে। ‘গ্লাসনস্ত’ আবির্ভূত হবার আগেই এটা ঘটেছে।
বিশ্বজুড়ে বুর্জুয়ারা চিন রাশিয়ার ‘নতুন গণতান্ত্রিক বাতাস’কে অভিনন্দন জানিয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়ার পরিবর্তনকে। আমরা গণতন্ত্রের অভিমুখে যে কোনো পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এটা খেয়াল রাখা দরকার যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনে বুর্জুয়াশ্রেণিকে যেটি দেওয়া হয়েছে সেটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অধিক আত্মপ্রকাশের অধিকার।  এই অধিকার আর কাউকে দেয়া হয় নি। ব্যক্তিগত মালিকানা এবং সম্পত্তির উদ্ভবের পরে বুর্জুয়াদের যেসব আইনি ধরণের আইনি এবং প্রশাসনিক কাঠামো দরকার---সেসবের সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে।
‘গ্লাসনস্ত’ আর ‘পেরেস্ত্রইকা’ নিয়ে কিছু মোহ সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ এগুলোর সঙ্গে শান্তির কথা বলা হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে দুই অতি বৃহৎ শক্তির মাঝে উত্তেজনা প্রশমনের জন্যে কিছু পদেক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই দুই সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমন একই সময়ে ঘটবার ফলে কিছু মানুষের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে এই ‘সংস্কার’ প্রক্রিয়ার থেকেই শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু উত্তেজনা প্রশমনের ধরণ দেখলে বোঝা যায় যে এই ধরণের কোনো যোগসূত্র নেই।
কিছু অকেজো পুরোনো অস্ত্র নষ্ট করে ফেললে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমে না। সমগ্র বিশ্বকে বেশ কয়েকবার ধ্বংস করে ফেলবার মতো অস্ত্র শস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র দুই বৃহৎ শক্তির হাতে মজুত আছে। তারউপরে তারা নতুন নতুন অস্ত্র তৈরি করেছে। কিন্তু আগের জমানার থেকে একটি পরিবর্তন হয়েছে। এখনে এরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিযোগিতা একটি সীমার ভেতরে ধরে রেখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপে চিরাচরিত ধরনের সশস্ত্র বাহিনী কমাবার প্রস্তাব দিয়েছে। একে শান্তির প্রস্তাব বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই হ্রাসের পরেও সোভিয়েতের শক্তি পশ্চিমের শক্তির দ্বিগুণ থাকবে।কিন্তু প্রশমনের সবার থেকে বড় সাক্ষ্য এই যে দুই অতি বড় শক্তি নিজেদের মধ্যে দুনিয়া ভাগ করে নেবার জন্যে একটি মোটামুটি স্থিতিশীল সূত্রে এসে পৌঁছেছে। গেল দেড় শতকের তীব্র সংঘাতের ফলাফলের উপরে উপর ভিত্তি করে তারা এই সূত্রে উপনীত হয়েছে। এই দলিলে আমরা সেই ভাগাভাগির খুঁটিনাটিতে যাচ্ছি না।  কিন্তু এটি বলা দরকার যে এই বিভাজন হবে অস্থির চরিত্রের। তৃতীয় বিশ্বের চলমান  সংঘর্ষ এবং অভ্যুত্থানগুলো, দ্বিতীয় বিশ্বের সঙ্গে সংঘাত এবং দুই অতিবৃহৎ শক্তির মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্ব ---এগুলোর ফলে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে।
তবুও সাময়িক বিভাজন দুই অতি বড় শক্তির জনে দরকারিজাপান এবং ইউরোপ এই দুই শক্তির সামনে বিপদ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুই শক্তিরই বিশ্বআধিপত্যের পথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাপান এবং ইউরোপ বিপদের উৎস। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের যেমন অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস দরকার, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও তার প্রয়োজন যাতে তাদের উন্নতর প্রযুক্তিকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে নিয়োগ করতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভয়ংকর সংকট থেকে বাঁচাতে হলে গর্বাচেভেরও এই সব প্রয়োজন। এই পুনর্বিন্যাস না করতে পারলে তারা পরস্পরের মধ্যে বিশ্ব আধিপত্যের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।  কিন্তু ফল হতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো। অর্থাৎ তার থেকে লাভবান হতে পারে জাপান বা ইউরোপীয় ফেডারেশন গঠন প্রক্রিয়াতে জড়িতরাই। অন্যদিকে এখন প্রশমনের অর্থ ভবিষ্যতে আরো বড় যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হওয়া। সুতরাং ‘পুনর্বিন্যাস’এর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র বদল হয়েছে বলে ভাবার কারণ নেই।
চিন এবং রাশিয়া দুই দেশেই পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের শাসন প্রবর্তিত হয়েছে। ব্যক্তিগতকরণকে যদি চরমে নিয়ে যাওয়া হয় তবে সেই দেশগুলোতে কতকগুলো শক্তিশালী ‘কার্টেল’ গঠন হতে পারে। সেগুলোর একচেটিয়া চরিত্রের জন্যে সম্প্রসারণবাদের উদ্ভব হবে এবং বিশ্বআধিপত্যের আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেবে। কিন্তু চিনা অর্থনীতি এখনো দুর্বল, তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতি---যে অর্থনীতি নির্ভরশীল অবস্থার থেকে বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হয়েছে। ফলে চিনা শাসকেরা এখনি বিশ্ব জয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন না।
একসময় দুনিয়া জুড়েই কম্যুনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনকে সমাজতান্ত্রিক পথের আদল রূপে গ্রহণ করেছিলেন। তার থেকেই আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম।  এখন এই দুই দেশ ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে এবং আমাদের দল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনা ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে। এই অবস্থাতে কম্যুনিস্ট দলগুলোর (বিশেষ করে মার্ক্সবাদী –লেনিনবাদী পার্টির, যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনকে পুঁজিবাদী বলে গণ্য করেন) কর্মসূচীতে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। সোভিয়েত এবং চিনা রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক হিংস্র দমনমূলক এবং শ্রমিক বিরোধী চরিত্র দেখে বহু পার্টি, বিশেষ করে ইউরোপের বহু দল এবং ব্যক্তিরা সর্বহারা একনায়কত্বের ধারণাকেই বর্জন করেছেন। আমরা যদি সর্বহারার একনায়কত্বকে প্রকৃতার্থে তুলে ধরতে চাই এবং যেসব কর্মসূচী বা কর্মনীতির জন্যে পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে সেগুলো পরিত্যাগ করতে চাই তবে আমাদের কর্মসূচীকে এমনভাবে সূত্রায়িত করতে হবে যেন সে সমাজবাদের প্রতি জনগণের আস্থা ঘুরিয়ে আনতে পারে এবং নতুন গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ গড়ার জন্যে তাদের সৃজনশীল ক্ষমতাকে উন্মুক্ত করতে পারে। এক ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যদিয়েই এই গণতান্ত্রিক ভারত সমাজতন্ত্রে উপনীত হবে গিয়ে।
এখানে আমরা নতুন গণতান্ত্রিক ভারত বা সমাজবাদী ভারতের কর্মসূচীর খুঁটিনাটি আলোচনা করছি না। বরং এক সাধারণ লাইন আলোচনা করব, যে সাধারণ লাইন অনুসরণ করে আমরা সমাজবাদে গিয়ে পৌঁছুতে পারব।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কম্যুনিস্ট পার্টি শ্রেণিগুলোর অস্তিত্বের বাস্তব ভিত্তি অর্থাৎ অর্থ, মূল্যের সূত্র ইত্যাদির বস্তুগত অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেবে।  সুতরাং পার্টি এই রূপগুলোকে বর্জন করবার জন্যে কোনো মনগড়া স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ নেবে না। বিপরীতে পার্টি এগুলোকে স্বীকার এবং ব্যবহার করবে । উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে এদের অস্তিত্বের সর্তকে আক্রমণ করবে তথা সমগ্র উপরিকাঠামোর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্যে জনগণকে প্রস্তুত করবে। এর অর্থ এই যে সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বাধিকার থাকবে। কিন্তু একজনের ম্যানেজমেন্ট এবং প্রযুক্তিবিদ ম্যানেজার শ্রেণির একাধিপত্যকে ক্রমাগত শক্তিশালী করা হবে না। পার্টি চেষ্টা করবে শ্রমিক কৃষকেরা যাতে অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ এবং ম্যানেজমেন্টের কাজ শিখে নিতে পারেন, তার জন্যে তাদের সাহায্য এবং উদ্বুদ্ধ করতে পারবে। প্রথমত এরা এইসব সংস্থার স্তরে শিখে নেবেন। তারপর বৃহত্তর পরিধিতে শিখবেন এবং অবশেষে দেশব্যাপী স্তরে তাঁরা এটা শিখবেন। এ হবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, যার পথ হবে আঁকাবাঁকা এবং যার মধ্যে প্রচুর ভুল ভ্রান্তি হবে। কারণ মানসিক শ্রম এবং দৈহিক শ্রমের বিভাজনের ভিত্তিতে, নারী এবং পুরুষের মধ্যে বিভাজনের ভিত্তিতে যে শ্রমবিভাজন সেসব এমনিতেই অত্যন্ত জটিল। যখন এই প্রক্রিয়াটির ভেতরে একটি শেখার প্রক্রিয়া থাকে এবং শিক্ষক অর্থাৎ কম্যুনিস্ট পার্টিকেও শিখতে হয় তখন এই প্রক্রিয়াটি আরো জটিল হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়াতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দরকার পড়বে, তেমনি প্রয়োজন হবে বিশেষজ্ঞের, প্রযুক্তিবিদ এবং ম্যানেজারদের। কিন্তু তাদেরকে থাকতে হবে কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত জনগণের গণআন্দোলনের অধীনেপরিকল্পনাও রাষ্ট্রবাদী এবং প্রশাসনিক ধরণের হবে না, বরং এমন এক অর্থনৈতিক পদ্ধতির প্রচলন করা হবে যাতে ভারি শিল্প, ছোট শিল্প এবং কৃষির সঠিক মাত্রার ভারসাম্যের মধ্যে বিকাশ সম্ভব হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ উৎপাদকের মধ্যে আরো বৃহত্তর সহযোগিতা সম্ভব হবে। সর্বহারার একনায়কত্বের অধীনে উৎপাদন এবং বণ্টনের ক্ষেত্রে এই শ্রেণি সংগ্রাম একই সঙ্গে উৎপাদিকা শক্তিরও বিকাশ ঘটাবে এবং শেষপর্যন্ত এমন আসল সম্পদ সৃষ্টি হবে যে শ্রেণিগুলোর বিলুপ্তির সঙ্গে মিলে যাবে।
জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের প্রথম জেকবিন কর্তব্য হল দালাল বৃহৎ বুর্জুয়া এবং  জমিদারদের রাষ্ট্রক্ষমতার থেকে এবং উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার থেকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করা। জাতীয় বুর্জুয়া সহ অন্যান্য সমস্ত শ্রেণির সঙ্গে ব্যবহার হবে ভিন্ন। স্বেচ্ছামূলক প্রক্রিয়াতে, নানা ধরণের সহযোগিতা, যৌথকরণ এবং সমগ্র জনগণের মালিকানার প্রক্রিয়ার ভেতরে এদের আনা হবে। বিপ্লবের এই স্তরে শোষক শ্রেণির যে অংশ আমাদের মিত্র, তাদের সঙ্গে ঐক্য-সংগ্রামের ক্ষেত্রে গণ-সংগ্রামের বিকাশের মাত্রা বিচার করা হবে। যখন শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই শোষক শ্রেণিকে উৎপাদনের উপকরণের থেকে বঞ্চিত করা হবে তখনো সর্বহারার একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র কেড়ে নেয়া পুঁজির সুদ দিয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের উপকরণের উপরে রাষ্ট্রীয় মালিকানা থাকবে, একে কেউ যেন সমগ্র জনগণের মালিকানা বলে ভুল না করেন। সমগ্র জনতার মালিকানা তখনি প্রতিষ্ঠিত হবে যখন প্রত্যক্ষ উৎপাদকেরা জাতীয় স্তরের সহযোগিতার সর্বোচ্চ স্তরে গিয়ে পৌঁছুবেন।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে , কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ লাইন আরম্ভ হওয়া উচিত ‘বহুস্তরীয় স্বায়ত্ত শাসনে’র মধ্য দিয়ে। এই স্বায়ত্তশাসন হবে এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ যারা দ্বারা রাষ্ট্র শুরু থেকেই কম্যুনের রূপ নিতে শুরু করে। মৌলিকভাবে এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা (প্রকৃত অর্থে, শুধু মুখের কথার জন্যে নয়) যেখানে সংগঠনের প্রধান ভিত্তি হবে গণতন্ত্র। এই বহুস্তরীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিটি ভৌগোলিক স্তরে কেন্দ্রীকতার দরকার পড়বে। শুরুর দিকে, জনগণের অশিক্ষা, দারিদ্র্য এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার জন্যে এক কেন্দ্রীকতাতে বুর্জুয়া এবং পেটিবুর্জুয়া উৎসের অগ্রগামী বাহিনী এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রাধান্য থাকবে। অগ্রগামী বাহিনীর মধ্যে পুরোনো শোষক শ্রেণির থেকে উঠে আসা এই অংশটির অংশগ্রহণ বহু সমস্যা সৃষ্টি করে। এদের ভাবাদর্শের ভেতরে গভীরভাবে প্রোথিত বুর্জুয়া ধ্যান-ধারণা এদেরকে এক রাষ্ট্রীয় শ্রেণিতে পরিণত করে এবং রাষ্ট্রবাদ, অর্থনীতিবাদ এবং উৎপাদিকা শক্তির মতো বুর্জুয়া মতাদর্শের ধারক-বাহক হয়ে উঠে। নিচের থেকে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একে নিয়ন্ত্রণ করাটা জারি রাখতে হবে। এই মধ্য দিয়ে এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যে বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ‘সার্বজনীন ভোটাধিকারে’র প্রশ্নে কোনো আপোস করবে না। এমন কি যে দলগুলো শোষক শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে তাদেরকেও নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে দিতে হবে। এই সার্বজনীন ভোটাধিকারের সুযোগ নিয়ে শত্রুশ্রেণির দলগুলো যদি শক্তিশালী হয়ে পড়ে তবে এটাই বুঝতে হবে যে শ্রমিক-কৃষকদের রাজনৈতিক শিক্ষা এতোটা বিকশিত হয় নি যে তারা শত্রুর প্যাঁচ-পয়জার বুঝতে পারেন। এতে কম্যুনিস্ট পার্টি নেতৃত্বে শ্রেণি সংগ্রাম কীভাবে পরিচালিত হবে সেটি আরো স্পষ্ট হবে। কম্যুনিস্ট পার্টি ক্ষমতাতে থাকার অর্থই হল শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতাতে থাকা –এই ভ্রান্তির বশবর্তী হয়ে যদি পার্টি এককভাবে ক্ষমতা দখল করে তবে তা শ্রেণি সংগ্রামকে ব্যাহত করবে এবং গণচেতনার বিকাশ তথা রূপান্তরের গণলাইনের মধ্য দিয়ে যাবে না।  প্রকৃতপক্ষে কম্যুনিস্ট পার্টির একচেটিয়া ক্ষমতার ক্ষমতার লাইন পরিত্যাগ করলে বড়সড় ভুল ভ্রান্তি করবার পরে পার্টির ভোটে হেরে যাবারও সম্ভাবনা থাকবে। তার অর্থ আঁকাবাঁকা সংগ্রাম। এমনও হতে পারে যে কম্যুনিস্ট পার্টির ভুল-ভ্রান্তিগুলো খুব বড় হলে বুর্জুয়ারা সর্বহারা একনায়কত্বকে উচ্ছেদ করে বুর্জুয়া একনায়কত্ব কায়েম করবে এবং জনগণকে আরেকবার দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পথ গ্রহণ করতে হবে। কম্যুনিস্ট পার্টির এসবকে ভয় করা উচিত নয়, বরং একে এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন হিসাবে নিজে নিজেকে আরো শিক্ষিত করে তোলার জন্যে এর মধ্যে দিয়েই যেতে হবে।
রাষ্ট্রীয় বুর্জুয়ারা যেখানেই ক্ষমতাতে বসেছে, সেখানেই তারা মানব ইতিহাসের সবচাইতে বেশি (হিটলার বাদী রাষ্ট্রবাদ অবশ্য এই তুলনার বাইরে) অত্যাচারী এবং দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র বসিয়েছে। মাও জে দঙ এবং স্তালিনের সমর্থক এবং সহযোগীদের যেভাবে হত্যা এবং দেশান্তরী করা হয়েছে তার থেকেই এই রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা দমনমূলক , সেটি বোঝা যায়। ফলে ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ করতে হবে এবং অবসান ঘটাতে হবে স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং আধা সামরিক বাহিনীরও। জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের হাতে দমনের হাতিয়ার হবে সশস্ত্র শ্রমিক-কৃষক এবং তাদের মিলিশিয়া। এই গণ-মিলিশিয়াগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতীয় স্তরের সমন্বয় থাকবে। কম্যুনিস্ট পার্টি যেন কখনো তার নিজের ক্ষমতার উৎস ভুলে না যায় এবং যে কোনো আক্রমণকারীকে পরাজিত করবার জন্যে জনযুদ্ধের অপরিসীম ক্ষমতার কথা ভুলে না যায়।
এভাবে জনগণের একনায়কত্বের শুরুটা হবে এক স্থায়ী সৈন্যবাহিনী ছাড়াই। এর অঙ্গ হবে এক বিকেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যন্ত্র যে শুরু থেকেই ক্ষয় পাবার মধ্য দিয়ে যাবে। উৎপাদন এবং রাজনীতিতে শ্রমিক কৃষকদের ক্ষমতা যে পরিমাণে বাড়বে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষয়প্রাপ্তি তার সমানুপাতিক হবে। জনগণের ইচ্ছের প্রতিনিধিত্বকারী বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা রাষ্ট্র ক্ষয় পাবার সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি বেশি ক্ষেত্রে প্রসারিত হবে। অবশেষে সহযোগিতা এবং সমন্বয় এমন এক জাতীয় স্তরের গিয়ে পৌঁছুবে যেখানে রাষ্ট্র বিলুপ্ত হবে এবং জন্ম নেবে কম্যুনিস্ট সমাজ।
[ একলব্য প্রকাশনী প্রকাশিত মূল অসমিয়া বই থেকে প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ করেছেন সুশান্ত কর ]

0 comments:

স্বাভিমান:SWABHIMAN Headline Animator

^ Back to Top-উপরে ফিরে আসুন